ওটস বা কিনোয়া নয়, আমাদের চিরচেনা এই রোজকার খাবারই এখন নতুন সুপারফুড
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ডাল-ভাত পাওয়ার টুয়েন্টি ফোর আওয়ার “Daal Bhaat Power 24 Hour।” নেপালে ভ্রমনে গেলে অনেকের টি শার্ট দেখতে পাবেন এই কথাটা লেখা থাকে। এটাকে নিছক মজার স্লোগান মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে পুষ্টিবিজ্ঞান।

নেপালে এখন এই মুভমেন্ট খুবই জনপ্রিয়
নেপালে এখন এই মুভমেন্ট খুবই জনপ্রিয়

ডাল-ভাত শুধু খাবার নয়, এটি শক্তি, সহনশীলতা এবং টিকে থাকার এক দারুণ সুপার ফূড। নেপালের মানুষের দৈনন্দিন জীবন মানেই উঁচু পাহাড়ি পথে ওঠানামা, কঠিন পথচলা আর নিরন্তর শারীরিক পরিশ্রম। সেখানে প্রচুর প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার মাংস, ডিম বা দুগ্ধজাত পণ্য সব সময় সহজলভ্য নয়। তবুও তারা শক্তিশালী, সহনশীল এবং কর্মক্ষম। রহস্যটা কোথায়? উত্তরটি খুব সাধারণ ডাল আর ভাত।

বিজ্ঞাপন

পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ডাল ও ভাত একসাথে খাওয়া মানে “কমপ্লিট প্রোটিন” পাওয়া। ডালে থাকে প্রায় সবগুলো প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, তবে সালফার-সমৃদ্ধ অ্যামিনো অ্যাসিড (মেথিওনিন, সিস্টেইন) থাকে কম পরিমানে। ভাতে সালফার-সমৃদ্ধ অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে ভালো পরিমানে, তবে লাইসিন বা কিছু ব্রাঞ্চড-চেইন অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে কম পরিমানে। যখন এই দুটো একসাথে খাওয়া হয়, তখন শরীর পেয়ে যায় সবগুলো প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড যা মাংসপেশি গঠন, টিস্যু রিপেয়ার এবং শক্তি উৎপাদনে অপরিহার্য।

ডাল ও ভাত একসাথে খাওয়া মানে “কমপ্লিট প্রোটিন” পাওয়া
ডাল ও ভাত একসাথে খাওয়া মানে “কমপ্লিট প্রোটিন” পাওয়া
নেপালের মানুষ দিনে কয়েকবার ভাত খায় তাদের ওজন বাড়েনা কেন
নেপালের মানুষ দিনে কয়েকবার ভাত খায় তাদের ওজন বাড়েনা কেন

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স আসলে কি?

আমরা প্রায়ই শুনি কার্বোহাইড্রেট বেশি খেলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হয়। তাহলে প্রশ্ন আসে নেপালের মানুষ দিনে কয়েকবার ভাত খায় তাদের ওজন বাড়েনা কেন? এখানেই আসে লাইফস্টাইলের বড় পার্থক্য। তারা সারাদিন শারীরিকভাবে সক্রিয়। পাহাড়ি পথে চলাচল নিজেই এক ধরনের হাই-ইনটেনসিটি ওয়ার্কআউট ফলে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমার সুযোগ কম।  ফলে কার্বোহাইড্রেট তাদের শরীরে জমে না, বরং শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হওয়ার সুযোগই কম থাকে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষের গল্পও একই। বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষদের ( প্যাডেল রিকশা চালক, ভ্যান চালক, কুলি) দিকে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়। তারা হয়তো প্রতিদিন পর্যাপ্ত মাংস বা দামি প্রোটিন খান না, কিন্তু ডাল-ভাতের উপর নির্ভর করেই কঠিন শারীরিক শ্রম করেন। এর কারন হিসেবে পুষ্টিবিদরা বলেন, ডাল-ভাত তাদের বেসিক প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে পর্যাপ্ত ক্যালোরি দেয় এবং শরীরকে কাজ করার শক্তি দেয়।

নেপালে এই মুহূর্তে পায়ে হেঁটে বিশ্ব ভ্রমণ করছেন বাংলাদেশের সাইফুল ইসলাম শান্ত
নেপালে এই মুহূর্তে পায়ে হেঁটে বিশ্ব ভ্রমণ করছেন বাংলাদেশের সাইফুল ইসলাম শান্ত
 নেপালে ডাল অনেক ঘন করে খাওয়া হয়। কারণ সেখানে ডালই প্রধান প্রোটিন সোর্স।
নেপালে ডাল অনেক ঘন করে খাওয়া হয়। কারণ সেখানে ডালই প্রধান প্রোটিন সোর্স।


কেন নেপালিরা ঘন ডাল খান?

নেপালে এই মুহূর্তে পায়ে হেঁটে বিশ্ব ভ্রমণ করছেন বাংলাদেশের সাইফুল ইসলাম শান্ত। তাঁর কাছ থেকেই জানলাম এর বিস্তারিত। নেপালে ডাল অনেক ঘন করে খাওয়া হয়। কারণ সেখানে ডালই প্রধান প্রোটিন সোর্স। অন্যদিকে আমাদের দেশে ডাল সাধারণত সাইড ডিশ হিসেবে খাওয়া হয় কিন্তু নেপালে সেটা প্রধান খাবার। প্রোটিনের জন্য আমরা মাছ, মাংস, ডিমের উপর নির্ভর করি তাই আমাদের ডালের ঘনত্ব কম, কিন্তু তাদের ডাল প্রায় “প্রোটিন স্যুপ”।

উচ্চতর পাহাড়ে (৩,০০০ মিটার বা তার বেশি) উঠলে অনেক সময় নন-ভেজ না প্রাণীজ প্রোটিন পাওয়া যায় না। তখন ট্রেকার ও মাউন্টেইনারদের ভরসা একটাই; ডাল-ভাত। এর মূল কারণ এটি সহজলভ্য, সহজে হজম হয়, দীর্ঘসময় শক্তি দেয়
দক্ষিণ এশিয়ায় যারা ধর্মীয় বা আর্থিক কারণে নন-ভেজ ও প্রাণীজ প্রোটিন খান না, তাদের জন্য ডাল এক আশীর্বাদ।

ট্রেকার ও মাউন্টেইনারদের ভরসা একটাই; ডাল-ভাত।
ট্রেকার ও মাউন্টেইনারদের ভরসা একটাই; ডাল-ভাত।

ডাল সাশ্রয়ী সহজে পাওয়া যায় এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। বাংলায় একটা প্রচলিত প্রবাদ বাক্য হচ্ছে ডাল গরীবের প্রোটিন। ডাল-ভাত শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার নয় এটি একটি বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর খাদ্যব্যবস্থা।

ডাল-ভাত হয়তো সাদামাটা, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ২৪ ঘণ্টার শক্তি
ডাল-ভাত হয়তো সাদামাটা, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ২৪ ঘণ্টার শক্তি

ফিটনেস মানেই সবসময় ওটস, কিনোয়ার মতো হাইপড খাবার, দামি প্রোটিন শেক বা এক্সোটিক ডায়েট নয়। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যালান্সড লাইফস্টাইল তিনটির সমন্বয়ে লুকিয়ে আছে আসল রহস্য। ডাল-ভাত হয়তো সাদামাটা, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ২৪ ঘণ্টার শক্তি ঠিক যেমনটা নেপালের সেই বিখ্যাত টি-শার্টে লেখা থাকে।

ছবি: সাইফুল ইসলাম শান্ত

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন