

শিল্প ও নকশার জন্য নিবেদিত বিশ্বের বৃহত্তম জাদুঘরটির নাম হলো দ্য ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়াম (ভিঅ্যান্ডএ)। লন্ডনের এই জাদুঘর ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত। এ জাদুঘরে রয়েছে প্রাচীনকাল থেকে সংগৃহীত গয়না, পোশাক, আসবাব, ট্যাপেস্ট্রি ও কাচের জিনিসপত্র। তবে এর ফ্যাশন বিভাগটি জগদ্বিখ্যাত। এখানে ১৪ হাজারের বেশি পোশাক–আশাকের (আনুষঙ্গিক) সংগ্রহ রয়েছে। জাদুঘরের কালেকশনটি একটি বড় অংশ কোনো না কোনো বিশেষ উপলক্ষে তৈরি স্টাইলিশ পোশাকে ভরা।
ব্রিটিশ পেইন্টার ট্যালবট হিউজ ঐতিহাসিক পোশাক সংগ্রাহক হিসেবে বেশ পরিচিত। ১৯১৩ তিনি তাঁর বিশাল কালেকশন ডিপার্টমেন্ট স্টোর হ্যারডসের কাছে বিক্রি করে দেন। সেই সংগ্রহ হ্যারডস ওই একই বছর ভিক্টোরিয়া ও আলবার্ট জাদুঘরে দান করে দেয়। সেখানে ছিল ১ হাজার ৪৪২টি পোশাক ও আনুষঙ্গিক। ১৯৭১ সালে ব্রিটিশ ফ্যাশন, পোর্ট্রেট ও ওয়ার ফটোগ্রাফার এবং অস্কারজয়ী কস্টিউম ও স্টেজ ডিজাইনার সেসিল বিটন একটি প্রদর্শনী কিউরেটেড করেন। সেখানে ফ্যাশন আইকন লি র্যাডজিউইল, গ্লোরিয়া গিনেস, অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্ন, রুথ ফোর্ডের পরিধেয় গাউনসহ প্রায় ১ হাজার ২০০টি হাই-ফ্যাশন গার্মেন্টস ও আনুষঙ্গিক প্রদর্শন করা হয়।
এ প্রদর্শনীর পর বিটন বেশির ভাগ প্রদর্শিত আইটেম জাদুঘরে দান করে দেয়। ১৯৯৯ সালে ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট জাদুঘরে ‘ফ্যাশন ইন মোশন’ শিরোনামের একটি লাইভ ক্যাটওয়াক সিরিজ শুরু হয়। সেখানে বিখ্যাত সব ডিজাইন হাউসের ঐতিহাসিক সব কালেকশন প্রদর্শন করা হতো। প্রথম শো ছিল অ্যালেক্সান্ডার ম্যাককুইনের। এর পর থেকে জাদুঘরটি প্রতিবছর এ ধরনের ডিজাইনার শোয়ের আয়োজন করে এবং সেই ডিজাইনারদের ডিজাইন করা আলোচিত পোশাক-আশাক সংগ্রহ করে আসছে।এই জাদুঘরে রয়েছে অনেক দুষ্প্রাপ্য কাপড় ও পোশাক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মসলিন।

ডরিস ল্যাংলি মুর গুরুত্বপূর্ণ প্রথম নারী ফ্যাশন ইতিহাসবিদ। তিনি ১৯৬৩ সালে ইংল্যান্ডের সমারসেট কাউন্টির বাথে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখন দ্য ফ্যাশন মিউজিয়াম নামে পরিচিত। এখানে এক লাখের বেশি নারী, পুরুষ ও শিশুদের ফ্যাশনেবল পোশাকের সংগ্রহ রয়েছে। সেই ষোড়শ শতাব্দী থেকে শুরু করে এই বর্তমান সময়ের অনেক বিখ্যাত পোশাক-আশাক এখানে দেখতে পাওয়া যায়। তবে এ জাদুঘরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ‘ড্রেস অব দ্য ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড।
১৯৬৩ সাল থেকে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ একজন ফ্যাশন সাংবাদিককে এমন একটি পোশাক নির্বাচন করতে বলে, যা সমসাময়িক ফ্যাশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন ধারণাগুলোকে খুব ভালোভাবে উপস্থাপন করে। ২০১০ সালে ঐতিহ্য ভেঙে জাদুঘর ফ্যাশন সাংবাদিকের বদলে বিখ্যাত মিলিনার (যিনি হ্যাট বানান) স্টিফেন জোনসকে পোশাক নির্বাচনের জন্য নিয়োজিত করেন। সেবার তিনি ড্রেস অব দ্য ইয়ার হিসেবে ভিভিয়েন ওয়েস্টউডের গ্রিন রিবড শট-সিল্ক ডিকনস্ট্রাক্টেড গাউনটি বেছে নেন।
আবার ২০১৩ সালে কাজটি দেওয়া হয় স্টাইল বাবল ফ্যাশন ব্লগের ব্লগার সুসান লাউকে। ওই বছর তিনি পোশাকের সঙ্গে জুতা ও টুপিও ড্রেস অব দ্য ইয়ার নির্বাচন করেন। এ জাদুঘরে রানি ভিক্টোরিয়ার বুট যেমন আছে, তেমন ২০১৯ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে কেন্ডল জেনারের পরা জিয়ামবাতিস্তা ভালির গোলাপি টুইল গাউনটিও আছে। বিশ্বমানের সংগ্রহ দেখতে প্রতিবছর ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ ও পর্যটকেরা এখানে ভিড় জমান।

যাঁদের জুতা নিয়ে অবসেশন রয়েছে, তাঁদের সময় কাটানোর জন্য আদর্শ জায়গা হলো এ জাদুঘর। কানাডার টরন্টোতে অবস্থিত দ্য বাটা শু মিউজিয়ামে প্রতিবছর লাখ লাখ জুতাপ্রেমী ভিড় জমান। চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সুইস কানাডিয়ান ব্যবসায়ী সোনজা বাটা নানা রকমের জুতা সংগ্রহ করে আসছেন।

১৯৭৯ সালে মিসেস বাটা, বাটা শু মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি বিশাল তহবিল দেন। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর সংগ্রহটি পেশাগতভাবে দেখভাল করা হোক। ফাউন্ডেশনটি ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো সংগ্রহটি জনসাধারণের দেখার জন্য প্রদর্শন করে। এরপর ১৯৯৫ সালের মে মাস থেকে জাদুঘরের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হয়।
এ জাদুঘর ধীরে ধীরে জুতা নিয়ে গবেষণার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে দুই ধরনের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়—স্থায়ী ও অস্থায়ী। ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী জাদুঘরে ১৩ হাজারের বেশি জুতা রয়েছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জুতার সংগ্রহ।

সারা বিশ্বে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি জাদুঘর রয়েছে, যেখানে শুধু হ্যান্ডব্যাগ প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অবস্থিত দ্য সিমন হ্যান্ডব্যাগ মিউজিয়াম। সিমোন কোম্পানি হচ্ছে এশিয়ার প্রথম অরিজিনাল ডেভেলপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার, যারা বিলাশবহুল হ্যান্ডব্যাগ তৈরি করে। কোম্পানিটি মার্ক জ্যাকবস ও টরি বুর্কের মতো সমসাময়িক লেবেলের জন্য হ্যান্ডব্যাগ তৈরি করে থাকে। জাদুঘরটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

একটি অংশে বিংশ শতাব্দী ও সমসাময়িক সময়ে তৈরি হ্যান্ডব্যাগ শোকেস করা হয়েছে। অন্য একটি অংশে পনেরো শতক থেকে শুরু করে উনিশ শতকের বিখ্যাত কিছু ব্যাগ রাখা হয়েছে। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরের প্রথম সংগ্রহটি সাজিয়েছিলেন সিমোন হ্যান্ডব্যাগ কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা কেনি পার্ক, আর কিউরেটর ছিলেন লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশনের মিউজোলজি ও ফ্যাশনের অধ্যাপক জুডিথ ক্লার্ক। বর্তমানে এই জাদুঘরে তিন শতাধিক ব্যাগের সংগ্রহ রয়েছে।