
প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে তৈরি হয় প্রায় ৪০ কোটি টেনিস বল। এর মধ্যে পুনর্ব্যবহার করা হয় মাত্র ১ শতাংশের মতো। পেশাদার টেনিসে একটি বলের আয়ুও খুব বেশি নয়। ব্যবহারের পর বাতিল হওয়া সেই টেনিস বলই এবার জায়গা করে নিচ্ছে ফ্যাশনে। তাও আবার জুতায়।

টেনিস খেলার সঙ্গে ফ্যাশনের সম্পর্ক বেশ পুরোনো। ইউএস ওপেন, উইম্বলডনের মতো বড় টুর্নামেন্টে টেনিস কোর্ট থেকে গ্যালারি—সবখানেই নান্দনিক পোশাক ও ডিজাইনের উপস্থিতি চোখে পড়ে। কিন্তু খোদ টেনিস বলকে ফ্যাশনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ বেশ অভিনব। বিশেষ করে টেকসই ফ্যাশনের ভাবনা থেকে করা এই উদ্ভাবন নজর কেড়েছে।
ব্যবহৃত টেনিস বলেই তৈরি হচ্ছে জুতা
রয়্যাল কলেজ অব আর্ট ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ডিজাইনার সোরুশ রিয়াজি ইসফাহানি এই ভাবনা নিয়ে তৈরি করেছেন ‘স্লাইস’ (SLICE) নামের একটি প্রকল্প। ২০২৬ সালের জেমস ডাইসন অ্যাওয়ার্ডের জন্যও মনোনীত হয়েছে প্রকল্পটি।

‘স্লাইস’-এ ব্যবহৃত টেনিস বল গুঁড়া করে বা গলিয়ে নতুন কোনো উপাদানে পরিণত করা হচ্ছে না। বিশেষভাবে তৈরি একটি কাটিং গাইডের সাহায্যে প্রতিটি বল নির্দিষ্ট আকৃতিতে কাটা হচ্ছে। এতে বলের রাবার ও বাইরের ফেল্টের স্তর যতটা সম্ভব অক্ষত থাকছে। পরে কাটা অংশগুলো দিয়েই তৈরি হচ্ছে জুতার বিভিন্ন উপাদান।
এই পদ্ধতির ফলে ব্যবহৃত টেনিস বলকে নতুন করে কাজে লাগাতে অতিরিক্ত শক্তি ও জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন কমছে। একই সঙ্গে বলটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও ধরে রাখা যাচ্ছে।
গুঁড়া নয়, অক্ষত রেখেই পুনর্ব্যবহার
প্রচলিত পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় কোনো উপাদানকে প্রথমে গুঁড়া বা ভেঙে কাঁচামালে পরিণত করা হয়। পরে সেই কাঁচামাল দিয়ে নতুন পণ্য তৈরি করা হয়। এতে তুলনামূলক বেশি শক্তির প্রয়োজন হতে পারে এবং মূল উপাদানের কিছু বৈশিষ্ট্যও হারিয়ে যায়।
‘স্লাইস’ সেই প্রচলিত পদ্ধতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। টেনিস বলের রাবার ও ফেল্টকে যতটা সম্ভব অক্ষত রেখেই জুতার বিভিন্ন অংশে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে একটি ব্যবহৃত টেনিস বল শুধু পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামাল হয়ে থাকছে না; বরং তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়েই নতুন পণ্যের অংশ হয়ে উঠছে।

অবশ্য শুরুতে সোরুশের পরিকল্পনা ছিল ব্যবহৃত টেনিস বল গুঁড়া করে প্রাকৃতিক রাবারের সঙ্গে মিশিয়ে জুতার আউটসোল তৈরি করা। পরে সেই ভাবনা থেকে সরে আসেন তিনি। কারণ, বল গুঁড়া করলে এর স্থিতিস্থাপকতা, স্তরবিন্যাস এবং বাইরের ফেল্টের বিশেষ স্পর্শ হারিয়ে যায়। অন্যদিকে কেটে ব্যবহার করলে এসব বৈশিষ্ট্য অনেকটাই অক্ষত থাকে।
অর্থাৎ, এখানে বর্জ্যকে শুধু নতুন করে ব্যবহার করা হচ্ছে না; বরং পরিত্যক্ত উপাদানটির নিজস্ব পরিচয়কেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জুতার জন্য টেনিস বল কেন?
শুনতে অদ্ভুত হলেও জুতা তৈরির ক্ষেত্রে টেনিস বলের উপাদানের কিছু কার্যকর বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বলের রাবার টেকসই, আর বাইরের ফেল্টে রয়েছে ভালো গ্রিপ। টেনিস কোর্টে বলটিকে কার্যকর রাখে যে বৈশিষ্ট্যগুলো, সেগুলোর কিছু জুতার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।
এই জায়গাতেই ‘স্লাইস’-এর ভাবনাটি আলাদা। পরিত্যক্ত একটি উপাদানকে শুধু বর্জ্য হিসেবে না দেখে, তার ভেতরে থাকা সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন সোরুশ।

পুনর্ব্যবহারের ভিন্ন দর্শন
ফ্যাশনে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানের ব্যবহার অবশ্য নতুন নয়। পুনর্ব্যবহৃত উপাদান দিয়ে তৈরি জুতা ও পোশাক এখন অনেক ব্র্যান্ডের সংগ্রহেই দেখা যায়। সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক, পুরোনো কাপড় কিংবা শিল্পবর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে নতুন পণ্য।
তবে ‘স্লাইস’-এর বিশেষত্ব হলো, এখানে পরিবেশবান্ধব হওয়ার বিষয়টি আলাদা কোনো সংযোজন নয়; পুরো নকশার কেন্দ্রেই রয়েছে পুনর্ব্যবহার। টেনিস বলই এই জুতার মূল উপাদান, আবার পুরো ধারণার ভিত্তিও সেই টেনিস বল।

ফ্যাশনে বর্জ্যের নতুন জীবন
জুতা শিল্পকে পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব করে তোলা সহজ নয়। একটি জুতা তৈরিতে রাবার, চামড়া বা কৃত্রিম উপাদান, ফোম, কাপড়সহ নানা ধরনের উপকরণ ব্যবহৃত হয়। পুরোনো জুতা পুনর্ব্যবহার করে নতুন পণ্য তৈরি করাও তাই বেশ জটিল।
‘স্লাইস’ হয়তো একাই সেই সমস্যার সমাধান নয়। তবে এটি নতুন একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়—নতুন কাঁচামাল সংগ্রহ না করেও পুরোনো একটি পণ্যকে নতুন জীবন দেওয়া সম্ভব।
টেনিস কোর্টে মাত্র কয়েক দফা ব্যবহারের পর যে বলের কার্যকর জীবন শেষ হয়ে যায়, সেই বলই যদি দীর্ঘস্থায়ী একটি জুতার অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে তার দ্বিতীয় জীবন নিঃসন্দেহে আরও অর্থবহ।
টেকসই ফ্যাশনের অর্থ শুধু নতুন কোনো ‘সবুজ’ উপাদান খুঁজে পাওয়া নয়। অনেক সময় এর অর্থ হলো, আমাদের চারপাশের পরিত্যক্ত জিনিসগুলোকেই নতুন চোখে দেখা। সোরুশ রিয়াজি ইসফাহানির ‘স্লাইস’ সেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি উদাহরণ—যেখানে টেনিস কোর্টে বাতিল হয়ে যাওয়া বল শেষ পর্যন্ত জায়গা করে নিচ্ছে ফ্যাশনের জগতে।
সূত্র: ডিজাইন বুম
ছবি: ইন্সটাগ্রাম