
ফিফা বিশ্বকাপ দেখতে বসে অনেকেরই চোখে পড়েছে একটি অদ্ভুত বিষয়। জার্সির নিচে অনেক পুরুষ খেলোয়াড় এমন একটি আঁটসাঁট পোশাক পরে থাকেন, যা দেখতে অনেকটা নারীদের অন্তর্বাসের মতো। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌতূহল, মজা, এমনকি ভুল ধারণাও কম দেখা যাচ্ছে না।


কিন্তু সত্যি হলো, এটা মোটেও ব্রা নয়। এটি আসলে বিশেষ ধরনের একটি প্রযুক্তিনির্ভর ভেস্ট, যা খেলোয়াড়ের শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে। এর সাহায্যে দুই কাঁধের মাঝামাঝি পিঠের ওপর ছোট একটি যন্ত্র বসানো থাকে, যা খেলোয়াড়ের নড়াচড়া, গতি এবং শারীরিক চাপ পর্যবেক্ষণ করে। একসময় কোচেরা খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স বোঝার জন্য চোখের পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা আর অনুমানের ওপর নির্ভর করতেন। এখন সেই জায়গায় যুক্ত হয়েছে বিজ্ঞান।
একটি ম্যাচে একজন খেলোয়াড় ঠিক কত দূর দৌড়ালেন তা মুহূর্তেই জানা যাচ্ছে। শুধু দূরত্বই নয়, তিনি কত দ্রুত দৌড়েছেন, সর্বোচ্চ গতি কত ছিল, কতবার হঠাৎ গতি বাড়িয়েছেন, আবার কত দ্রুত গতি কমিয়েছেন সবই ধরা পড়ছে এই ছোট যন্ত্রে। শুধু তাই নয়, খেলোয়াড়ের শরীরের ওপর কতটা চাপ পড়ছে, সেটিও জানা যায়।


ফুটবলে ক্লান্তি অনেক সময় চোখে ধরা পড়ে না। একজন খেলোয়াড় বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও তার পেশি হয়তো সীমার কাছাকাছি চলে গেছে। তখন অতিরিক্ত চাপ চোটের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই প্রযুক্তি কোচ, প্রশিক্ষক ও শারীরিক সক্ষমতা বিশেষজ্ঞদের আগেভাগেই সতর্ক করে দেয়। ফলে তারা বুঝতে পারেন কাকে বিশ্রাম দিতে হবে, কার অনুশীলনের মাত্রা কমাতে হবে, কিংবা কোন খেলোয়াড়কে মাঠে নামানো নিরাপদ হবে। চোট থেকে ফিরে আসা খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ পুরোপুরি সুস্থ হয়েছেন কি না, তার শরীর আগের মতো চাপ নিতে পারছে কি না এসব মূল্যায়নে এটি বড় ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভেস্ট প্রায় বত্রিশ ধরনের আলাদা তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারে। কখনও কখনও ম্যাচের কৌশলগত সিদ্ধান্তেও এসব তথ্য প্রভাব ফেলে। কোন খেলোয়াড়কে কখন বদলি করা হবে, সেটিও নির্ধারণে এই তথ্য কাজে লাগে।অনেকের মনে কৌতূহল এটি ব্রার মতো দেখতে কেন? এর কারণ পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক।

যন্ত্রটি শরীরের সঙ্গে একদম লেগে থাকতে হয়। যদি নড়াচড়া করে, তাহলে তথ্যের নির্ভুলতা কমে যেতে পারে। তাই ভেস্টটি খুব আঁটসাঁটভাবে তৈরি করা হয়। এই নকশার কারণেই দূর থেকে এটি অনেকটা ব্রার মতো দেখায়। আর যন্ত্রটি পিঠের ওপরের অংশে রাখা হয়, কারণ সেখানে থাকলে অবস্থাননির্ণায়ক সংকেত সবচেয়ে ভালোভাবে ধরা যায়।
আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো এটি শুধু পুরুষ খেলোয়াড়েরা ব্যবহার করেন, আসলে তা নয়। নারী ও পুরুষ উভয় খেলোয়াড়ই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। পার্থক্য শুধু নকশায়। নারী খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে অনেক সময় এই যন্ত্র তাদের ক্রীড়া-উপযোগী অন্তর্বাসের সঙ্গেই যুক্ত থাকে। পুরুষদের জন্য এটি আলাদা ভেস্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।


আজকাল অনেকেই হাঁটা, দৌড়, হৃদস্পন্দন, ঘুম কিংবা দৈনন্দিন সক্রিয়তা মাপতে স্মার্ট ঘড়ি ব্যবহার করেন। প্রযুক্তি আমাদের শরীর সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন করে তুলেছে। আজ যেটি পেশাদার খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি, কাল সেটিই হয়তো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যাবে। হয়তো একদিন এমন সময় আসবে, যখন শুধু হাতে ঘড়ি নয়, শরীরঘনিষ্ঠ আরও উন্নত পরিধানযোগ্য যন্ত্র ব্যবহার করা হবে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের জন্য। তখন পুরুষের এমন ভেস্ট পরা আর কাউকে অবাক করবে না। প্রযুক্তির বিবর্তন আমাদের বারবার শিখিয়েছে আজ যা অদ্ভুত মনে হয়, কাল সেটিই হয়ে ওঠে স্বাভাবিক। ফুটবলারের জার্সির নিচের এই অন্তর্বাসকে বলা যায় স্পোর্টস ফ্যাশন কিংবা বিজ্ঞানের আরেক বিস্ময়।
সূত্র: স্ট্যাট স্পোর্টস, প্লেয়ারমেকার
ছবি: ইন্সটাগ্রাম ও ভিডিওর স্ক্রিনশট