মহারাজা তোমারে সেলাম
শেয়ার করুন
ফলো করুন

শুক্রবার। সপ্তাহান্তের সকাল। তবু ব্যস্ততাহীন, মন্থর রোম। মনখারাপের চাদরে ঢাকা। মুখ ভার নগরবাসীর। বেশির ভাগেরই পথ এসে মিলেছে মধ্য রোমের ঐতিহাসিক বেসিলিকা সান্তা মারিয়া দেগলি অ্যাঞ্জেলি এ দেই মারতিরিতে। কিংবদন্তি শিল্পী মাইকেলেঞ্জেলোর ডিজাইন করা এই উপাসনালয়।

সস্ত্রীক টম ফোর্ড
সস্ত্রীক টম ফোর্ড
ছবি: ইন্সটাগ্রাম
ভোগ সম্পাদক অ্যানা উইন্টর
ভোগ সম্পাদক অ্যানা উইন্টর
ছবি: ইন্সটাগ্রাম

ব্যাসিলিকা আজ লোকারণ্য। ফ্যাশন–বিশ্ব ভেঙে পড়েছে। কে নেই সেই তালিকায়! অ্যানা হ্যাথাওয়ে থেকে অ্যানা উইন্টর, টম ফোর্ড থেকে দোনাতেল্লা ভারসাচি, সুজি মেনকেস থেকে এলিজাবেথ হার্লি, অ্যানা ফেন্দি থেকে ফ্রাঁসোয়া–অঁরি পিনো, অ্যাডাম শুলমান; ফ্যাশন ডিজাইনার, ব্র্যান্ডের শীর্ষ কর্তা, ফ্যাশন সম্পাদক ও সাংবাদিক, মডেল, অভিনয়শিল্পী, ফ্যাশনিস্তা, সাধারণ মানুষ—উপস্থিত সবাই। যাকে বলে তারায় তারায় খচিত। সবাই হেঁটেছেন পাশাপাশি। দাঁড়িয়েছেন কাছাকাছি। স্থাণুবৎ। নতমুখ। নিরুচ্চার।

বিজ্ঞাপন

সবার কালো পোশাক আর কালো রোদচশমায় স্পষ্ট হয়েছে তাঁদের উপস্থিতির উপলক্ষ। আজ তাঁরা চিরবিদায় জানাতে এসেছেন ফ্যাশন সাম্রাজ্যের শেষ মহারাজাকে।

অ্যানা হ্যাথাওয়ে ও তাঁর স্বামী অ্যাডাম শুলমান
অ্যানা হ্যাথাওয়ে ও তাঁর স্বামী অ্যাডাম শুলমান
ছবি: ইন্সটাগ্রাম
ইতালিয়ান ডিজাইনার দোনাতেল্লা ভারসাচি
ইতালিয়ান ডিজাইনার দোনাতেল্লা ভারসাচি
ছবি: ইন্সটাগ্রাম

রোমের পাথরের রাস্তা, পুরোনো গির্জা, রোদে ধোয়া দেয়াল— সবাই বুঝেছে, আজ যিনি বিদায় নিচ্ছেন, তিনি কোলাহল পছন্দ করতেন না। তাঁর ভাষা ছিল নীরব। তাঁর সৃষ্টি ছিল সংযত।

বিজ্ঞাপন

ভ্যালেন্তিনো গারাভানির মৃত্যু কোনো আকস্মিক বিস্ময় ছিল না, তবু তা মেনে নেওয়ার মতো প্রস্তুতিও কারও ছিল না। ৯৩ বছরের জীবনের সিংহভাগই তিনি উৎসর্গ করেছেন সৃজনে, সৌন্দর্যে। হঠাৎ থেমে যাওয়ায় ফ্যাশনের দুনিয়া কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। সংবাদমাধ্যম একে বলেছে, ‘যুগাবসান’। অন্যদিকে তাঁর কাছের মানুষের কাছে তাঁর বিদায়ের অর্থ সৃজনের ভাষা রুদ্ধ হয়ে যাওয়া।

পরিমিতিই তাঁর সৃজনের শেষকথা
পরিমিতিই তাঁর সৃজনের শেষকথা
ছবি: ইন্সটাগ্রাম
নাওমি ক্যামবেল ও জিজেল বুন্ডসেনের সঙ্গে
নাওমি ক্যামবেল ও জিজেল বুন্ডসেনের সঙ্গে
ছবি: ইন্সটাগ্রাম

১৯৩২ সালের ১১ মে ইতালির লোম্বারদির ভোগেরাতে জন্ম নেওয়া ভ্যালেন্তিনো ফ্যাশনকে কখনোই কেবল পোশাকের পরিধি হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে ফ্যাশন ছিল জীবনদর্শন। রং, রেখা ও গঠনের ভেতর দিয়ে তিনি মানুষের মর্যাদা ও সৌন্দর্যের ধারণাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন। বলেছেন রূপান্তরের গল্প। তাঁর নামের সঙ্গে চিরকাল জড়িয়ে থাকবে সেই বিখ্যাত ‘ভ্যালেন্তিনো রেড’— একটি রং, যা চোখে পড়ে না কেবল, আত্মাকেও আলোকিত ও আলোড়িত করে। রেখে যায় অমোছনীয় ছাপ।

ভ্যালেন্তিনো বরাবরই মৃদুভাষী। তাঁর বক্তব্য প্রতীয়মান কাপড়ের কাট, রঙের গভীরতা আর নকশার নিখুঁত পরিমিতিতে। সৌন্দর্যকে জোর করে ফুটিয়ে তোলা যায় না; বরং একে অনুভব করতে হয়— তাঁর পোশাক যেন সেটাই বলেছে বারংবার। নিজের জীবনদর্শনের মতোই বোধ হয় তাঁর বিদায়ও অনুক্ত, নীরব; রোমে নিজের বাসভবনে পরিজন পরিবেষ্টিত থেকে হয়ে গেলেন মহাকালের অতিথি। ঠিক এভাবেই হয়তো: ‘আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়,/ রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়/ আমার পুরানো নাম।/ ফিরিবার পথ নাহি;/ দূর হতে যদি দেখ চাহি/ পারিবে না চিনিতে আমায়।/ হে বন্ধু, বিদায়।’

এভারেই দুদিন রাখা হয়েছিল শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য
এভারেই দুদিন রাখা হয়েছিল শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য
ছবি: ইন্সটাগ্রাম

মৃত্যুর পর দুই দিন ধরে তাঁর দেহ রাখা হয়েছিল পিয়াজা মিগনানেল্লির ভ্যালেন্তিনো ফাউন্ডেশন ভবনে। সাধারণ মানুষ, শিল্পী, অনুরাগীসহ অসংখ্য মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। কোথাও কোনো তাড়াহুড়া ছিল না। ছিল ফুল, ছিল দীর্ঘ নীরবতা, ছিল দাঁড়িয়ে থাকার ধৈর্য, ছিল শ্রদ্ধা সমুজ্জ্বল চোখের কোণে চিক চিক করে ওঠা অশ্রু বিন্দুতে। সেই দৃশ্য মনে করিয়ে দিয়েছে—ভালোবাসা শুধু জীবনের জন্য নয়, স্মৃতির জন্যও।

শেষকৃত্যের দিন রোমের আকাশ ছিল উজ্জ্বল; তবু সেই আলোয় কোথায় যেন ভর করে ছিল বিষন্নতা। ঐতিহাসিক ব্যাসিলিকায় কফিন প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য ভর করে। ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। উপস্থিত ফ্যাশন দুনিয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র তারকা, সম্পাদক, বন্ধু—সবাই কোনো না কোনোভাবে ভ্যালেন্তিনোর কাজের ভেতর দিয়ে নিজেকে চিনেছেন। সবাই তাই দাঁড়িয়ে ছিলেন স্তব্ধবাক হয়ে। গভীর শূন্যতার অনুভব নিয়ে।

কফিন বহন করে আনা হচ্ছে ব্যাসিলিকায়
কফিন বহন করে আনা হচ্ছে ব্যাসিলিকায়
ছবি: এএফপি

বেজেছে মোৎজার্টের লাক্রিমোসা। গির্জার সংগীত থেমে গেলে পরে নেমেছে নিস্তব্ধতা; এটাই ছিল এদিনের সবচেয়ে স্পষ্ট উচ্চারণ। কোনো শব্দ না থেকে দৃশ্যমান ছিল এক শিল্পীর সুগভীর সৃজনপ্রেম। ভ্যালেন্তিনো ফ্যাশনকে কখনো প্রদর্শনীর উপাদানে পরিণত করেননি; বরং তাঁর ছিল এ নিয়ে একধরনের নৈতিক অবস্থান। তাই তো তাঁর সৃষ্টি অন্যদের থেকে আলাদা। নিজেকে কখনো বিপ্লবী দাবি না করেও সদর্থেই  তিনি বিপ্লব ঘটিয়েছেন। ফার্স্ট ফ্যাশন আর চটকের পৃথিবীবে সৌন্দর্যের সঙ্গে কোনো আপস করেননি। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল অহেতুক দৃষ্টি আকর্ষণ করা নয়, বরং সময়কে অতিক্রম করে যাওয়াই ফ্যাশন।

তাই তো তাঁর কাছে ছুটেছেন ফ্যাশনের সত্যিকারের সমঝদারেরা। জুলিয়া রবার্টস, এলিজাবেথ টেলর, জ্যাকি কেনেডি ওনাসিস কিংবা রানি রানিয়া। এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর।

প্ল্যাকর্ডে লেখা: বিদায় ভ্যালেন্তিনো; ফ্যাশনের শেষ সম্রাট।
প্ল্যাকর্ডে লেখা: বিদায় ভ্যালেন্তিনো; ফ্যাশনের শেষ সম্রাট।
ছবি: এএফপি

কাপড় ক্যানভাসের মহারাজা বিদায় নিয়েছেন। তাই তো শেষকৃত্যে অংশ নিতে এসে এক ফ্যাশন অনুরাগী একটা প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরেছেন। তাতে ইতালীয় ভাষায় যা লেখা, সেটা ভাষান্তরে দাঁড়ায়: বিদায় ভ্যালেন্তিনো; ফ্যাশনের শেষ সম্রাট। এটা যেটা আবিশ্বের ফ্যাশন তাবৎ অনুরাগীরই উচ্চারণ। তাঁরাও কুর্নিশ করেছেন; বলেছেন, মহারাজা তোমাকে সেলাম।

তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে রোমের ফ্লামিনিও কবরস্থানে, পারিবারিক সমাধিতে। খুব সাধারণ এক কবরখানা। আড়ম্বরহীন। বাহুল্যবর্জিত। এখানেও পরিমিতির স্বাক্ষর রাখলেন তিনি। মৃত্যুতেও বলে গেলেন— সংযমই সৌন্দর্যের শেষকথা। আরও বলে গেলেন সবার উদ্দেশে, ‘পেয়েছি ছুটি, বিদায় দেহ ভাই--/ সবারে আমি প্রণাম করে যাই॥’

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৩৯
বিজ্ঞাপন