
ঢাকা শহরে বাণিজ্যিক ভবনে আগুন লাগে মূলত শর্টসার্কিটের কারণে। এতে কখনো মানুষ মরে। কখনো না মরলেও ভস্মীভূত হয় তাঁদের স্বপ্ন। পথে বসেন উদ্যোক্তারা। চাকরি হারান মানুষ। এই আগুন বেইলি রোডেই হোক বা মিরপুর, মোহাম্মদপুর কিংবা বনানী।

অকস্মাৎ একদিন আগুন লাগে। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। মানুষের চিৎকার–চেঁচামেচি, ফায়ার সার্ভিসের সাইরেন, পুড়ে যাওয়া সব জিনিসপত্রের গন্ধে থমকে যায় সময়। এরপর কয়েক দিন পেরোতে না পেরোতেই আবার শহর স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
গত মাসের মাঝামাঝি বনানীর ১২ নম্বর রোডের একটি বহুতল ভবনে আগুন লাগে। এরপর মাস না পেরোতেই সবাই ভুলে গেছে। আমরা কেবল আগুনের খবরটুকু জেনেছি। অথচ এই আগুন বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের এক নীরব সংকটকে হঠাৎ দৃশ্যমান করে দিয়েছে। এই খবর আমরা হয়তো রাখি না। কারণ, সেখানে শুধু একটি ভবন পোড়েনি, পুড়েছে দেশের শীর্ষ সারির বেশ কয়েকটি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন, বিনিয়োগ, পরিচয় এবং টিকে থাকার নিরাপত্তাবোধ।
হাউস অব আহমেদ, জুরহেম, আইরিসেস, ড্যাপার—বাংলাদেশের বিলাসী ফ্যাশনের পরিচিত নাম। ওই ভবনে আরও ছিল একাধিক ছোট অথচ সমাদৃত ডিজাইনারের উপস্থিতি। এদের জন্য একটি ছোট স্পেসই ছিল পুরো ব্যবসার কেন্দ্র। আগুনের পরে কেউ পপআপ শপ করছে, কেউ নতুন আউটলেট খুঁজছে, কেউ ঈদের আগেই আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এদের বেশির ভাগের সঙ্গেই কথা হয়েছে আমার। দেখেছি হঠাৎ থমকে যাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উৎকণ্ঠা। তা–ও আবার ঠিক কোরবানি ঈদের আগে। কারণ, বনানী থেকে একটি ছোট ব্র্যান্ডকে চলে যেতে হয়েছে ধানমন্ডি।

নতুন করে আবার ফিরে আসা তাদের জন্য কতটা সহজ হবে বা আদৌ হবে কি না, সেটা সময়ই বলবে। তবে যেটাই হোক, প্রত্যেকেরই প্রয়োজন হচ্ছে বা হবে নতুন বিনিয়োগ। যেটাও আরেক বাস্তবতা। অন্যদিকে, এ বছরের শুরু থেকেই ঢাকার ফ্যাশন মানচিত্রে আরও দৃশ্যমান হতে আরম্ভ করে বিদেশি ও আঞ্চলিক ব্র্যান্ডের বিস্তার।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার অভিজাত শপিং জোনগুলোতে একের পর এক জায়গা করে নিয়েছে পাকিস্তানি ও ভারতীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড। একটু চোখ মেললেই দেখা যাবে সানা সাফিনাজ, মারিয়া বি, গুল আহমেদ বা রিতু কুমারের আউটলেট। বিলবোর্ডে তাদের বিজ্ঞাপন। এমনকি বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেলে আরও আরও ডিজাইনারদের নিয়ে মেলার আয়োজন।
এর বাইরে মাল্টিব্র্যান্ড স্টোরের মাধ্যমে অনেক পাকিস্তানি ও ভারতীয় লেবেল ঢুকেছে বাংলাদেশের বাজারে। শুধু পোশাক নয়, তারা নিয়ে আসছে একটি নতুন রিটেইল অভিজ্ঞতা, নতুন অ্যাসপিরেশন, যাপনের নতুন পরিভাষা।

ঢাকার উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত ক্রেতাদের একটি অংশ এখন শুধু কাপড় কিনতে চায় না; তারা একটি গ্লোবাল আইডেন্টিটি কিনতে চায়। শপিং মলের ঝাঁ চকচকে আবহ, কিউরেটেড কালেকশন, আন্তর্জাতিক মানের উপস্থাপনা— সব মিলিয়ে ফ্যাশন এখন ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষার চরিতার্থের ব্যবসা।
এই পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বজুড়েই স্থানীয় বাজারগুলো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা অবশ্যই যাবে না, ঢাকাকে যথার্থ মেট্রোপলিস হয়ে উঠতে হলে। এ জন্যই সমস্যা বিদেশি ব্র্যান্ড আসায় নয়; বরং প্রতিযোগিতার অসমতায়।
একটি বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজির পেছনে থাকে আন্তর্জাতিক মূলধন, শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন, বিমা সহায়তা, একাধিক ইনভেন্টরি ব্যাকআপ ও এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার সম্প্রসারণ কৌশল।

অন্যদিকে বাংলাদেশের অধিকাংশ স্থানীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড এখনো দাঁড়িয়ে আছে মৌসুমি নগদ অর্থের প্রবাহ, সীমিত আউটলেট, তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং উৎসবকেন্দ্রিক বিক্রির ওপর। বিশেষ করে রোজার ঈদের সময়টাই তাদের জন্য বছরের সবচেয়ে বড় অর্থাগমের মৌসুম। তবে কোরবানির ঈদের আগেও নতুন কালেকশন লঞ্চ করা হয়। চলে প্রচারণাও। রোজার ঈদের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে একটি ব্র্যান্ডের পুরো বছরের ব্যবসার গতিপ্রকৃতি। কোরবানির ঈদ এতটা না হলেও বার্ষিক টার্নওভারে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
উৎসবের আগে আগুন লাগা মানে শুধু কয়েকটি শোরুম হারানো নয়; বস্তুত প্রতিটি ব্র্যান্ডের ইনভেন্টরি হারানো, ক্রেতাদের শপিংয়ে ব্যাঘাত ঘটা, ব্র্যান্ডের দৃশ্যমানতা বা উপস্থিতি নষ্ট হওয়া এবং অবশ্যই অর্থপ্রবাহের সংকট সৃষ্টি হওয়া। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন বা ঘুরে দাঁড়ানোটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যদিও যেসব ব্র্যান্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের জন্য শেষেরটা প্রযোজ্য নয়; তবু চলমানতায় ছেদ পড়া তো বটে। প্রতিটি ব্র্যান্ড বিলাসী পোশাক তৈরি করে থাকে। ফলে তাদের একটা পণ্য নষ্ট হওয়া মানে বিরাট ক্ষতি। উপরন্তু চলমান ব্যবসায় ছেদ পড়াও; যা বলার অপেক্ষা রাখে না অর্থাগম বাধাপ্রাপ্ত হওয়া।

একটি বিদেশি ব্র্যান্ড হয়তো একটি আউটলেট হারিয়েও ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে; কিন্তু একটি স্থানীয় ডিজাইনার লেবেলের জন্য এটা এক বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।
বনানীর ওই ভবনে আগুন লাগার পর সামাজিক মাধ্যমে অনেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
কোনো প্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগ তোলা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার নামান্তর; কিন্তু প্রশ্নটা কেন তৈরি হচ্ছে, সেটা বোঝাও জরুরি। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ এখন বড় বাণিজ্যিক অগ্নিকাণ্ডগুলোকে খুব সহজে কেবল দুর্ঘটনা হিসেবে নিতে পারে না। নগর উন্নয়ন, রিয়েল এস্টেট, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার অস্বচ্ছ সম্পর্ক নিয়ে মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের একধরনের অবিশ্বাস জমে আছে।
আমাদের শহরে প্রায়ই আগুন লাগে। তদন্ত হয়। রিপোর্ট আসে। এরপর সব চাপা পড়ে যায়। ফলে প্রতিটি বড় আগুনের পর মানুষ শুধু ক্ষয়ক্ষতি দেখে না—তারা প্যাটার্নও খোঁজে। এ জন্যই বনানীর আগুনের ক্ষেত্রে প্রতীয়মান হয় অবিশ্বাস।

আগুনের পরে কিছু ব্র্যান্ড যেভাবে পপআপ শপ খুলেছে, সেটিও সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ, পপআপ এখন শুধু মার্কেটিং ট্রেন্ডই নয়, অনেকের জন্য টিকে থাকার কৌশল। একটি স্থায়ী আউটলেট হারিয়ে ফেলার পরে অস্থায়ীভাবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার কারণ ক্রেতা, বিশেষত লয়্যাল ক্রেতাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ব্র্যান্ড ভিজিবিলিটি টিকিয়ে রাখা এবং অবশ্যই ক্যাশ ফ্লো অব্যাহত রাখা। অবশ্যই বাজারে জানান দেওয়া—‘আমরা এখনো আছি।’
এই দৃশ্যের ভেতরে একধরনের আরবান ফ্রেজিলিটি বা শহুরে ভঙ্গুরতা আছে।
ঢাকার চকচকে ফ্যাশন ইকোনমির নেপথ্যে আসলে কত অস্থিরতা কাজ করছে, সেটাও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

একসময় বাংলাদেশের ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো শুধু পোশাক বিক্রি করত না। তারা একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি করেছিল। দেশীয় কাপড়, হাতের কাজ, ঈদ ও অন্যান্য উৎসবকেন্দ্রিক ডিজাইন, মধ্যবিত্তের আবেগ মায় নিজস্ব নান্দনিকতা।
কিন্তু এখন বাজারের ভাষা বদলাচ্ছে। আজকের ফ্যাশন অর্থনীতি ক্রমাগতভাবে সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রিত, মলকেন্দ্রিক, ভুবনপ্রাণিত আর অবশ্যই যাপনধারাভিত্তিক।
এখানে ‘লোকাল’ মানেই আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাশিত নয়; বরং আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতাই এখন বস্তুত সেলিং পয়েন্ট।
ফলে ঢাকার ফ্যাশন বাজার এখন বেশ কয়েকটি স্তরে বিভক্ত:
১. স্থানীয় এথনিক ব্র্যান্ড: এরা এখনো দাঁড়িয়ে আছে দেশীয় পরিচয় ও দীর্ঘদিনের ক্রেতাদের আনুগত্য নিয়ে।
২. তৈরি পোশাকশিল্প খাত থেকে না আসা ইন্দো–ওয়েস্টার্ন ব্র্যান্ড: আশির দশক থেকেই এদের উপস্থিতি থাকলেও খুব একটা সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটেনি।
৩. তৈরি পোশাকশিল্প খাতের বিগ প্লেয়ারদের স্থানীয় ব্র্যান্ড: এদের শুরু নব্বই দশকে। তবে ২০০০ পরবর্তী সময়ে প্রচুর বেড়েছে এবং বাজারে বড় একটা অংশ তারা দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে।
৪. ডিজাইনারদের ব্র্যান্ড: সংখ্যায় কম কিন্তু উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
৫. ক্ষুদ্র উদ্যোগ: এখানে তাঁরাই ডিজাইনার তথা উদ্যোক্তা তথা মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস পারসন। এঁদের নিজস্ব ক্রেতা ও অনুরাগী আছে।
৬. বিদেশি লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড: এরা ফ্যাশনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আবহ আর অ্যাসপিরেশন বিক্রি করে থাকে।
বনানীর আগুন এই স্তরগুলোর অন্তর্লীন পাওয়ারের অসমতা বা ভারসাম্যহীনতাকে হঠাৎ দৃশ্যমান করে দিয়েছে। এতে আরও অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—বাংলাদেশের স্থানীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি বাইরে থেকে যতটা শক্তিশালী দেখায়, বাস্তবে ততটাই ভঙ্গুর।
পরিস্থিতি যেটাই হোক, বাজার কিন্তু কখনই খালি থাকে না। কেউ দুর্বল হলে অন্য কেউ সেই জায়গা নিয়ে নেয়। আর হয়তো এটাই ঢাকার পরিবর্তিত ফ্যাশন অর্থনীতির সবচেয়ে নির্মম সত্য।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম