
আমাদের দেশে তারুণ্যের এক তুমুল বিপ্লব হয়ে গেল। সেই সাক্ষী থাকল গোটা দেশ। দেশের নতুন প্রজন্মের তরুণেরা আন্দোলন করে ১৬ বছরের স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়েছেন। তবে তাঁদের এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। বরং এই অভিযাত্রা ছিল দুরূহ। অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। হারাতে হয়েছে নিজের বন্ধু, সহপাঠী বা সহযোদ্ধাদের। এই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে স্বৈরাচার সরকারের হাতে নিহত শহীদদের স্মরণে ওই সরকারই যখন শোক দিবস ঘোষণা করে, তখন ক্ষোভে ফেটে পড়েন তাঁরা। শোকের কালো রংকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের রাঙিয়ে তোলেন শক্তি, প্রতিবাদ ও স্বতন্ত্রের প্রতীক লাল রঙে। তবে প্রতিবাদী ছাত্রদের কাছে তা ছিল শহীদ সহযোদ্ধাদের রক্তের রং। মাথায় লাল ফেটি বেঁধে আন্দোলনে গেছেন অনেক তরুণ।

শুধু লাল ফেটি নয়, তরুণেরা লাল-সবুজ পতাকার রঙের টি–শার্ট ও বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি পরেও রাস্তায় নেমেছেন। এই চিত্র কেবল এবারের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনেই শুধু নয়, এর আগের গণজাগরণ মঞ্চ, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, প্রথম কোটা সংস্কার আন্দোলনেও দেখা গেছে।

তাই রং, পোশাক, প্যাটার্ন, মোটিফ, কাপড় বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদের সোচ্চার কিংবা নিরুচ্চার ভাষা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। আর এসবের সমন্বয়ে পোশাক হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের অনিন্দ্যসুন্দর ক্যানভাস।
এটা কেবল বাংলাদেশে নয়, বরং এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে নানা সময়ে নানা দেশের মানুষ। এই যেমন ধরা যাক, ২০২০ সালের ইউএস ওপেনের কথা। সেবার মহিলা এককে বিজয়ী নাওমি ওসাকা প্রতিদিন কোর্টে আসতেন একই ধরনের মাস্ক পরে। প্রতিটিই ছিল কালো। তার ওপর সাদা অক্ষরে লেখা নাম। একেক দিন একেকজনের নাম ছাপা থাকত। এই মাস্ক কেবল সংক্রামক অণুজীব প্রতিরোধের বর্ম নয়; বরং তিনি এটাকে আমেরিকা এবং বৃহদর্থে বিশ্বের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থিত করেছেন।

এমন অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে পোশাকের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে নানা মাত্রার ভাষা; যা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে, প্রাণিত ও একাত্ম করেছে। পোশাক বা অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ করাকে ‘প্রোটেস্ট ফ্যাশন’ বলা যেতে পারে।

পোশাক প্রতিবাদের ভাষা। যুগ যুগ ধরে এটি চলে আসছে। লেখার শুরুতে নাওমি ওসাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময়ে বলতে গেলে কেবল আমেরিকা নয়, গোটা বিশ্বই সরব ছিল ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের ব্যাপকতা, তীব্রতায়। মিনিয়াপোলিসে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েড পুলিশের হাতে নিহত হওয়ার পর বিষয়টির পালে বাতাস লাগে। বিশ্ব একাত্ম হয় এই আন্দোলনে। এই সময়ে উঠে আসে এমন একাধিক খুনের প্রসঙ্গ। পাশাপাশি বর্ণবৈষম্য, নিপীড়নসহ নানা বিষয়ে প্রতিবাদের মাধ্যম হয়ে ওঠে পোশাক।
আবার ২০১৯ সালে আমাদের দেশে ধর্ষণের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। সেখানেও প্রতিবাদ কেবল মুখের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এর প্রতিফলন আমরা দেখেছি পোশাকে।
‘ল্যাঙ্গুয়েজ অব ড্রেস’ বইতে উল্লেখ মেলে আফ্রিকার দাস ও মুক্ত নারীদের প্রসঙ্গ; যারা তাঁদের ফ্যাশন আর স্টাইলকে দাস প্রথা–বিরোধিতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁরা পৃথিবীর যে দেশেই অভিবাসী হয়েছেন, তাঁদের শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পোশাকও নিয়ে গেছেন। নতুন ভূমিতে অভিযোজিত হলেও নিজেদের সেই পোশাককে তাঁরা ছাড়েননি।
পোশাককে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল নারীবাদী বিপ্লবের প্রথম ঢেউয়ের সময়েও। উনিশ শতকে নারীরা ভোটের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য দেশে দেশে আন্দোলন শুরু করল। আমেরিকায় প্রথম এলিজাবেথ স্মিথ মিলার টার্কিশ ট্রাউজার পরে জনসমক্ষে আসার সাহস দেখান। সেই সময় নারীদের সাধারণ পোশাক ছিল ভারী এবং পরতে গেলে অনেক সময় ব্যয় হতো। মিলার মনে করেছিলেন, প্রচলিত পোশাক নারীদের জন্য একটা ফাঁদ। পরবর্তীকালে তাঁর বন্ধু এবং আমেরিকায় নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা এমেলিয়া ব্লুমার মিলারের এই টার্কিশ ট্রাউজার পরাকে সমর্থন করেন এবং অন্য নারীকে এটি পরার জন্য উৎসাহিত করেন। তাই এই ট্রাউজারের নামই হয়ে যায় ‘ব্লুমারস’।

প্রতিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমেরিকার সিভিল রাইটস মুভমেন্ট। তখন থেকে হালের এই ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার। তবে উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও পোশাক হয়েছে প্রতিবাদের ভাষা। বিশেষ করে খাদি কাপড়, মোটা দেশি কাপড় সেই প্রতিবাদের অনুঘটক হয়েছে। কেবল পোশাক নয়, তা পরার ধরন বা স্টাইলও প্রতীয়মান করেছে এই ভাষাকে।
ডেনিমও ওই সামাজিক দাবি আদায়ের আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ডেনিম মানেই কেজো পোশাক। এটাই এই পোশাক উদ্ভাবনের নেপথ্য ইতিহাস। তবে সেই ভাষায় বদল হয়েছে। এখন উন্নীত হয়েছে সামাজিক মর্যাদায়।
একসময় প্রতিবাদের পোশাক ছিল ফরমাল। কিন্তু সেই ধারায় এসেছে বদল। ষাট ও সত্তরের দশকে প্রতি-সংস্কৃতি বিপ্লব বা কাউন্টার কালচার মুভমেন্টের মধ্য দিয়ে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল। সেখানে পোশাক প্রতিষ্ঠা-বিরোধী বা অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট দর্শন প্রকাশের জন্য একটি প্রাণবন্ত ক্যানভাসে পরিণত হয়। তখন মিনি স্কার্ট নারীর স্বাধীনতা ও যৌন মুক্তির (সেক্সুয়াল লিবারেশন) প্রতীক হয়ে ওঠে। তখনই ফ্যাশন ট্রেন্ডে টাই-ডাই ও বেল বটম প্যান্টের উত্থান হতে থাকে। সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করতে এ ধরনের অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ফ্যাশনকে ব্যবহার করেছে সে সময়ের তরুণেরা।

ঠিক সে সময়ে নারীবাদী আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউ চলমান। তাঁদেরই কিছু অংশ প্রতিষ্ঠা-বিরোধী বিপ্লবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে প্রত্যাখ্যান করে নারীদের পণ্য বা অবজেক্টিফাই করে এমন পোশাক, অনুষঙ্গ ও মেকআপ পণ্য। নিজেরা পরতে শুরু করল জিনস, চিনো, টি–শার্ট, জ্যাকেট, লোফার ইত্যাদি।
সত্তরের দশকে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের বিরুদ্ধে পশ্চিমা তরুণেরা রাস্তায় নেমে আসে। তখন তারা আর্মিদের ইউনিফর্মকে নিজেদের মতো করে পরিবর্তন করে পরত। এই পোশাক হয়ে ওঠে যুদ্ধবিরোধী কর্মীদের বিদ্রোহের অংশ।
আসলে ভাষার মতো পোশাকের ভাষায়ও পরিবর্তন, পরিমার্জন ঘটেছে। এর উদাহরণ সেই ২০১১ সালের ওয়াল স্ট্রিটের ঘটনা থেকে হালের ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার বা ধর্ষণের প্রতিবাদ।
তবে প্রতিবাদের পোশাকে ভাষা সব সময় পরোক্ষ থাকে না, বরং প্রত্যক্ষ হয়ে যায় বিভিন্ন স্লোগান ছাপা থাকায়। বর্তমানে এই স্লোগানগুলো ব্যবহার হয়ে পোশাক তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তরুণদের সবচেয়ে প্রিয় ফ্যাশন আইটেম টি-শার্টে। যারা বুর্জোয়া নীতি বা সর্বগ্রাসী রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে, তাদের টি–শার্টে থাকে বিপ্লবী চে গুয়েভারার ছবি ও বিখ্যাত উক্তি।

বিশ্ব বদলেছে, বদলেছে মনোভাবও। তাই পোশাকে প্রতিবাদের ভাষায়ও লেগেছে সেই বদলের হাওয়া। ফ্যাশন ডিজাইনাররাও সরাসরি তাঁদের সংগ্রহের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদে শরিক হয়েছেন এবং হচ্ছেন। তা যেমন সামাজিক, তেমনি বৈশ্বিকও। নারীর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তা যেমন ভাষা পেয়েছে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের কুফলও তাঁদের প্রতিবাদের বিষয় হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রবাল গুরুং, আশীষ গুপ্ত, ভিভিয়েন ওয়েস্টউডের মতো ডিজাইনার; মিসোনি আর শ্যানেলের মতো ব্র্যান্ড।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য হ্যাশট্যাগমিটু আন্দোলন। বিশ্বজুড়ে এটা কেবল আলোচিতই ছিল না, বরং এর পক্ষে সরব হয়েছেন নারীর সঙ্গে পুরুষও। এই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশে ২০১৮ সালের গোন্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের ড্রেসকোডই ছিল কালো। রেড কার্পেটে তারকারা আপাদমস্তক কালো পোশাকে আবৃত হয়ে হেঁটেছেন। কয়েকজনের নাম স্মরণ করা যেতে পারে। পেনিলোপি ক্রুজ, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, জেসিকা বিয়েল, মার্গট রবি, নিকোল কিডম্যান। এঁদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন ক্রিস হেমসওয়ার্থ আর ইওয়ান ম্যাগগ্রেগররাও।

এর পরপরই গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের অনুষ্ঠানে অনেক তারকা পরেন সাদা। এ ক্ষেত্রে এটি হয়ে ওঠে প্রতিবাদের রং। কেউ কেউ আবার হাতে একগুচ্ছ সাদা গোলাপ নিয়ে প্রতিবাদে একাত্ম হন।