
একটি কালো পোশাক—যেটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজপরিবারের টানাপোড়েন, ভাঙা দাম্পত্য, সংবাদমাধ্যমের তীব্র নজর আর এক নারীর নিজের গল্পের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত।
১৯৯৪ সালের সেই রাতে প্রিন্সেস ডায়ানা যখন লন্ডনের সার্পেন্টাইন গ্যালারিতে কালো মিনি ড্রেস পরে হাজির হয়েছিলেন, তখন হয়তো কেউই জানতেন না, এই পোশাক একদিন ফ্যাশনের ইতিহাসে ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ নামে পরিচিত হবে।

সেদিনের রাত ডায়ানার জন্য ছিল কঠিন। একই সন্ধ্যায় সম্প্রচারিত একটি তথ্যচিত্রে তাঁর তৎকালীন স্বামী প্রিন্স চার্লস, বর্তমানে রাজা তৃতীয় চার্লস, দাম্পত্য জীবনে অবিশ্বস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করেন। আর সেই স্বীকারোক্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জনসমক্ষে ডায়ানার আবির্ভাব- আত্মবিশ্বাসী, গ্ল্যামারাস ও নজরকাড়া সাজে। তাঁর পরনে ছিল গ্রিক ডিজাইনার ক্রিস্টিনা স্ট্যাম্বোলিয়ানের তৈরি সেই কালো মিনিড্রেস, যা মুহূর্তেই হয়ে উঠেছিল সেই রাতের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।

চার্লসের স্বীকারোক্তির পর ডায়ানার প্রথম প্রকাশ্য উপস্থিতিকে অনেকেই তাঁর নীরব জবাব হিসেবে দেখেছিলেন। প্রায় তিন দশক পর সেই ঐতিহাসিক ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ আবারও উঠছে নিলামে।

সার্পেন্টাইন গ্যালারির অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে শেষ মুহূর্তে নিজের পোশাক বদলেছিলেন ডায়ানা। প্রথমে তাঁর পরার কথা ছিল ভ্যালেন্তিনোর একটি অপেক্ষাকৃত কম নজরকাড়া গাউন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি সরিয়ে বেছে নেন কালো পোশাকটি।

এই কালো পোশাকে ছিল অফ-দ্য-শোল্ডার নেকলাইন, এসেমেট্রিক হেমলাইন এবং পেছনে নেমে যাওয়া শিফন ট্রেন। সঙ্গে ছিল রাজপরিবারের একটি নেকলেস, কালো ক্লাচ ও কালো হিল। তাঁর তৎকালীন স্টাইলিস্ট আনা হার্ভের ভাষ্য অনুযায়ী, ডায়ানা সেদিন ‘মিলিয়ন ডলারের মতো’ দেখতে চেয়েছিলেন নিজেকে।

এবার সেই ঐতিহাসিক পোশাকটি আবারও নিলামে উঠছে। আগামী ৯ ডিসেম্বর নিলাম হবে পোশাকটির। নিলাম প্রতিষ্ঠান সোথেবি’সের ধারণা, এর দাম উঠতে পারে সর্বোচ্চ ২ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড, যা প্রায় ৩ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। ১৯৯৭ সালের পর এই প্রথম নিলামে উঠছে ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’টি।
ডায়ানা তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে, ১৯৯৭ সালে নিজের ৭৯টি পোশাক নিলামে তুলেছিলেন। ক্যান্সার ও এইডস-সংক্রান্ত দাতব্য কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহ করাই ছিল সেই নিলামের উদ্দেশ্য। সেখানেই ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’টি প্রায় ৪০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ডে বিক্রি হয়। স্কটল্যান্ডের বাসিন্দা ব্রিজ ও গ্রায়াম ম্যাকেঞ্জি দম্পতি পোশাকটি কিনেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল পোশাকটির বিক্রয়মূল্য দাতব্য কাজে ব্যয় করা।

পোশাকটি নিজেদের পরার জন্য কেনেননি তাঁরা। ব্রিজ ম্যাকেঞ্জি সে সময় বলেছিলেন, ‘আমি এতে ঢুকতেই পারব না।’ তাঁদের কেনার সঙ্গে যুক্ত ছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠান চিলড্রেন ফার্স্টের জন্য অর্থ সংগ্রহের বিষয়টিও। সেই নিলামের মাত্র দুই মাস পরই প্যারিসে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রিন্সেস ডায়ানা। তাঁর মৃত্যুর পর পোশাকটি আরও বেশি করে সেই দম্পতির জীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
প্রায় তিন দশক পর এবার সেই ঐতিহাসিক পোশাকই আবার উঠছে নিলামে। পোশাকটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ম্যাকেঞ্জি। স্বামীর মৃত্যুর পর নেওয়া এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরোনো স্মৃতিও। তাঁর ভাষায়, পোশাকটি কেনার সেই নিলাম ছিল স্বামীর সঙ্গে তাঁদের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন।

নিলামের আগে বিশ্বজুড়ে প্রদর্শিত হবে পোশাকটি। ১৮ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর সোথেবি’সের লন্ডন শোরুমে এটি দেখার সুযোগ থাকবে। এরপর অক্টোবরের শুরুতে হংকং, নভেম্বরের শুরুতে জেনেভা হয়ে পোশাকটি যাবে নিউইয়র্কে। সেখানেই ৯ ডিসেম্বর হবে নিলাম।
পোশাকটির সঙ্গে ১৯৯৭ সালের নিলামের একটি দুর্লভ ক্যাটালগও বিক্রি করা হবে। ডায়ানা ও ক্রিস্টিনা স্ট্যাম্বোলিয়ানের স্বাক্ষর থাকা ওই ক্যাটালগে পোশাকটি নিলামে তোলার ভাবনার সঙ্গে প্রিন্স উইলিয়ামের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। এবারের বিক্রির অর্থের একটি অংশ দেওয়া হবে রয়্যাল এডিনবার্গ হাসপাতালকে, এনএইচএস লোথিয়ান চ্যারিটির মাধ্যমে।
ডায়ানার পোশাক নিলামে বিপুল দাম পাওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালে সোথেবি’সের নিউইয়র্ক নিলামে তাঁর পরা বিখ্যাত কালো ভেড়ার নকশার সোয়েটার বিক্রি হয়েছিল ৯ লাখ ২০ হাজার পাউন্ডে। তবে ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’-এর গল্প আলাদা। কারণ এটি শুধু ডায়ানার পরা একটি পোশাক নয়, একটি ঐতিহাসিক রাতেরও গল্প।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম