
চারপাশে গুচি, প্রাদা, ভ্যালেন্তিনোর মতো বড় বড় ব্র্যান্ডের ডিজাইনারদের খবরের মধ্যে, হঠাৎ মাত্র আট বছরের এক শিশুকে নিয়ে আলোচন হলে সেটাকে নিছক কৌতুক বলেই ধরে নেওয়া যায়। কারণ, কে ভাবতে পারে, এত অল্প বয়সে কেউ সত্যিই ডিজাইন করতে পারে! কিন্তু ম্যাক্স আলেকজান্ডার প্রমাণ করে দিয়েছে—সৃষ্টিশীলতার কোনো বয়স হয় না।


আমরা ছোটবেলায় মাটি বা কাগজের পুতুলে জামা পরিয়ে খেলেছি, কেউ বার্বিকে সাজিয়েছি, কেউবা খেয়ালখুশিমতো কেটে নিয়েছি কাপড়ের টুকরা। কিন্তু ম্যাক্সের সেই খেলনার জগৎটাই একদিন বাস্তব হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসের বাসিন্দা এই আট বছর বয়সী শিশু এখন একজন স্বীকৃত ফ্যাশন ডিজাইনার। যার ডিজাইনে ইতিমধ্যেই মুগ্ধ হয়েছেন হলিউডের বড় বড় তারকা, যার হাতে বানানো গাউন উপস্থাপিত হয়েছে রানওয়েতে। ম্যাক্সের ইনস্টাগ্রামে একবার ঢুঁ মারলেই দেখা যাবে, এই বয়সেই তাজ্জব কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছে সে।

ছোট্ট একটা ছেলে, কাপড় কেটে, সেলাই করে বানিয়ে ফেলছে বড় বড় পোশাক। ভাবা যায়! পোশাক নকশার ভিডিও আর ছবিগুলো প্রায়ই ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করে সে। ফলোয়ারের সংখ্যা শুনলেও চোখ কপালে উঠবে আপনার। এই বয়সেই তার ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ারের সংখ্যাটা ছাড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩ মিলিয়নে।

চার বছর বয়সে হঠাৎই এক সন্ধ্যায় ডিনার টেবিলে ম্যাক্স ঘোষণা করে বসে, সে একজন ডিজাইনার এবং তার ম্যানিকিন দরকার। এমন কথায় চমকে গেলেও থেমে থাকেননি তাঁর মা। ঘরেই কার্ডবোর্ড দিয়ে বানিয়ে দেন সেই প্রথম ম্যানেকিন। তারপর মায়ের স্টুডিও থেকে খুঁজে পাওয়া কাপড় আর সরঞ্জাম দিয়ে তৈরি করে নিজের জীবনের প্রথম পোশাক। সেই পোশাক দেখেই পরিবারের সবাই বুঝে যায়—এই ছোট্ট হাতে লুকিয়ে আছে বড় সম্ভাবনা। আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন পর্যন্ত সে তৈরি করেছে ১০০টির বেশি পোশাক, প্রতিটিই ইউনিক।
ফ্যাশনের প্রতি বিশেষ টান থাকলেও সেলাই শেখার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা ছিল না ম্যাক্সের। মায়ের সাহায্য আর স্থানীয় কারিগরের কাছ থেকে ধীরে ধীরে রপ্ত করে নেয় টেকনিক। কিন্তু সবচেয়ে চোখে পড়ে তার আত্মবিশ্বাস ও মৌলিকতা। মাত্র ৫ বছর বয়সেই একাধিক ড্রেস তৈরি করে তাক লাগিয়ে দেয় অনলাইনের দুনিয়ায়। ভাইরাল হয় তার কাজ।


তারপর ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠা করে নিজের ফ্যাশন ব্র্যান্ড ম্যাক্স লেবেল। এই নামেই এখন তার ডিজাইন বিক্রি হচ্ছে দেশ-বিদেশে। শুধু সাধারণ ক্রেতাই নন, হলিউড তারকা শ্যারন স্টোন পর্যন্ত তাঁর ডিজাইনের পোশাক পরেছেন।

ম্যাক্সের বক্তব্য ও আত্মবিশ্বাসও তাক লাগানো। এক সাক্ষাৎকারে সে জানায়, ‘আমি জানতাম যে আমি গুচি ছিলাম!’ মাত্র কয়েক শব্দের এই মন্তব্য বুঝিয়ে দেয় তার আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি আর স্বপ্নের উচ্চতা। এই কথা ম্যাক্স বলেছিল খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই।

নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকের মতো প্রতিযোগিতামূলক মঞ্চে, যেখানে বিশ্বের নামকরা সব ডিজাইনার তাঁদের সেরা কাজ তুলে ধরেন, সেখানে এক খুদে প্রতিভার উপস্থিতি যেন রূপকথার মতোই। এই ছোট বয়সেই সে বুঝে গেছে, ফ্যাশন মানে কেবল বাহারি কাপড় নয়, তা হতে পারে একধরনের বার্তা আর চেতনার প্রকাশ। মাত্র আট বছর বয়সে ২০২৪ সালে সে নিজের ফ্যাশন লাইন নিয়ে হাজির হয় নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকে।
সেদিন রানওয়েতে আলো-ছায়ার খেলা, থিমভিত্তিক পোশাক, আর ক্যাটওয়াকে মডেলদের চোখে ছিল এক অদ্ভুত আত্নবিশ্বাস। এই শো ছিল ‘A Journey Through the Light’ থিমের; যেখানে প্রতিটি লুকের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার গল্প। আর এই অসাধারণ থিম ও প্রেজেন্টেশনের নেপথ্যে ছিল ছোট্ট ম্যাক্স, ভাবা যায়! তার এই শো শুধু দর্শককে মোহিত করেনি সেদিন, ইতিহাসেরও অংশ হয়েছে। এই আয়োজনের মাধ্যমেই বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে ম্যাক্স নাম লেখায় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে।


খুদে ডিজাইনার ম্যাক্সকে অন্যদের চেয়ে আলাদা রাখার কারণ অবশ্যই আছে। তার সত্যিকারের আলাদা হয়ে ওঠার জায়গা হলো কাজের উপাদান। পুরোনো কাপড়, ডেডস্টক ফেব্রিক, এমনকি ফেলে দেওয়া টেক্সটাইল, এসব দিয়েই সে তৈরি করে নতুন নতুন পোশাক। ন্যাচারাল ফাইবার আর রিসাইকেলড ম্যাটেরিয়ালই তার ডিজাইনের কাঁচামাল। ছোট্ট বয়সেই তার ভেতরে যে রকম পরিবেশ সচেতনতা দেখা যায়, তা বড়দেরও চমকে দেয়। ম্যাক্স জানে, ফ্যাশন যদি পরিবেশের ক্ষতি করে, তবে সেটা কখনোই শিল্প হতে পারে না। এই স্পষ্ট উপলব্ধি থেকেই সে তার ডিজাইনের প্রতিটি পদক্ষেপে খুঁজে নেয় টেকসই সমাধান। যেখানে সৌন্দর্য আর সচেতনতা পাশাপাশি থাকে।
মাত্র ৮ বছর বয়সেই যার ডিজাইন নজর কেড়েছে হলিউডের তারকাদের, যার পোশাক জায়গা করে নিয়েছে নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে, তাকে আর শিশু ডিজাইনার বলেই হয়তো যথেষ্ট বলা যায় না।
হলিউড অভিনেত্রী শ্যারন স্টোন নিজেই ম্যাক্সের একটি পোশাক পরে মুগ্ধ হয়ে বলেছেন, ‘আমি এমন কিছু পরেছি, যা এক ছোট্ট হাতে তৈরি, কিন্তু তার ভেতরে যেন এক পরিণত শিল্পবোধ আছে।’
স্টোনের মতো আরও সেলিব্রিটি ও ইনফ্লুয়েন্সার তার পোশাক পরেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসাও করেছেন। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে দেখা করে উৎসাহও দিয়েছেন তাকে।

ম্যাক্স আলেকজান্ডারের সাফল্যের পেছনে যে নির্ভরযোগ্য শক্তি ছায়ার মতো পাশে থেকেছে, তিনি তার মা। কেবল মা নন, তিনি ম্যাক্সের একান্ত সহযাত্রী, কখনো পথপ্রদর্শক, যিনি শিল্পীর বেড়ে ওঠায় রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ম্যাক্সের পেজ চালানো, প্রতিটি শোর নেপথ্য প্রস্তুতি, কাপড় নির্বাচন থেকে শুরু করে সময়মতো কাজের তাগিদ দেওয়া—সবকিছুতেই তার মায়ের নিঃশর্ত ভালোবাসা আর ধৈর্যের ছাপ সুস্পষ্ট।

এর বাইরেও আছে এক গভীর মানবিক গল্প। শৈশবে ম্যাক্স ভুগত নিদ্রাহীনতায়। অস্থিরতায় কাতর সেই ছোট্ট মন একদিন সুই-সুতায় খুঁজে পায় শান্তি। তার মা বলেন, ‘সে যখন সেলাই করে, তার ভেতরের অস্থিরতা যেন চলে যায়।’
ফ্যাশন শুধুই স্টাইল নয়, হয়ে উঠেছে থেরাপি। হয়ে উঠেছে আত্মপ্রকাশের ভাষা। ম্যাক্সের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে স্বপ্নপূরণের গল্প।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম