
একসময় কতুর মানেই ছিল ভারী এমব্রয়ডারি, রাজকীয় ব্রাইডাল লুক আর জমকালো র্যাম্প। কিন্তু ২০২৬ সালের ইন্ডিয়া কতুর উইক দেখিয়ে দিল, সময় বদলেছে। এখন কতুর শুধু পোশাক নয়, এটি একটি অভিজ্ঞতা, একটি গল্প, এমনকি একটি অনুভূতি।
ফ্যাশনের এই মর্যাদাপূর্ণ আয়োজনে ভারতের শীর্ষ ডিজাইনাররা তুলে ধরেছেন এমন সব সংগ্রহ, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা পাশাপাশি হেঁটেছে, আর প্রতিটি পোশাক যেন বলেছে একেকটি আলাদা গল্প।

এবারের কতুর উইকের সবচেয়ে আলোচিত চমক ছিলেন তরুণ তাহিলিয়ানি। তিনি প্রচলিত র্যাম্প শোই বাতিল করে তৈরি করেন এক নিমগ্ন প্রদর্শনী, যেখানে অতিথিরা পোশাক দেখেছেন শিল্পকর্মের মতো।

দিল্লির ঐতিহাসিক বিকানের হাউসকে তিনি রূপ দিয়েছিলেন এক বিশাল শিল্পগ্যালারিতে। সংকীর্ণ আইভরি করিডোর, ভাসমান করসেট, ঝুলন্ত স্ফটিক, হাজারো ফুলের পাপড়ি আর নিখুঁত আলোকসজ্জার মধ্যে অতিথিরা ধীরে ধীরে আবিষ্কার করেছেন প্রতিটি পোশাক।

এই প্রদর্শনীর নাম ছিল ‘নবরত্ন’। যেখানে নয়টি ভিন্ন নকশাভাষায় তুলে ধরা হয়েছে তাঁর ফ্যাশন দর্শন।

তাঁর মতে, একটি কতুর পোশাক তৈরি করতে যেখানে শত শত ঘণ্টা শ্রম লাগে, সেখানে র্যাম্পে সেটি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখে পড়ে। তাই দর্শকদের সময় নিয়ে প্রতিটি সেলাই, সূচিশিল্প, করসেট আর কারুকাজ দেখার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

ডিজাইনার ঈশা জাজোদিয়ার ব্র্যান্ড ‘রোজরুম’ এবারের আসরে তুলে ধরেছে এমন এক সংগ্রহ, যার মূল দর্শন নারীর কোমলতা এবং শক্তি। ডিইনারের ভাষায় যা কখনোই একে অপরের বিপরীত নয়।

এই সংগ্রহে দেখা গেছে ব্র্যান্ডটির সিগনেচার লেসের নতুন রূপ। শ্যান্টিলি, কর্ডেড ও গুইপিউর লেসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাতে তৈরি ত্রিমাত্রিক ফুল, মাটির অলংকরণ, মুক্তা ও ক্রিস্টালের সূক্ষ্ম কাজ।

করসেট ছিল পুরো সংগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তবে এবার তা যুক্ত হয়েছে স্কাল্পচারড মটিফের শাড়ি, করসেট গাউন, লেহেঙ্গা, জাম্পস্যুট, টেইলরড সেপারেটস এবং টুইড জ্যাকেটের সঙ্গে।

রঙের প্যালেটও ছিল অনবদ্য। আইভরি, ব্লাশ পিংক, পাউডার ব্লু ও মিন্ট গ্রিনের কোমলতা ধীরে ধীরে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে টিল, রুবি, স্কারলেট, সোনালি এবং কালোর গভীরতাকে। যেন নরম অনুভূতি থেকে আত্মবিশ্বাসী নারীর শক্তিতে উত্তরণের গল্প।

দীর্ঘ ছয় বছর পর র্যাম্পে ফিরলেন মাসাবা গুপ্তা। তবে এটি শুধু প্রত্যাবর্তন ছিল না, তাঁর ব্র্যান্ড ‘হাউস অব মাসাবা’-র প্রথম ব্রাইডাল কুত্যুর সংগ্রহের আত্মপ্রকাশ। সবসময় সাহসী প্রিন্ট, উজ্জ্বল রং আর ব্যতিক্রমী মোটিফের জন্য পরিচিত মাসাবা এবার ভারতীয় কনের সাজকে দেখেছেন একেবারে নতুন দৃষ্টিতে।

সংগ্রহটির মূল বার্তা ছিল। ঐতিহ্যকে আঁকড়ে রেখেও নিজের স্বকীয়তা প্রকাশ করা সম্ভব।

পোশাকগুলোর অনুপ্রেরণা এসেছে ভারতের পবিত্র ভূমি থেকে শুরু করে অ্যান্টিগুয়ার নীল সমুদ্র আর ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের রঙিন আবহ পর্যন্ত। ফলে ঐতিহ্যবাহী ব্রাইডাল লেহেঙ্গার পাশাপাশি দেখা গেছে রিসোর্ট ব্রাইডাল লুকও।

মাসাবার ভাষায়, এই সংগ্রহ সেই নারীর জন্য, যিনি আত্মবিশ্বাসী, নির্ভীক এবং নিজের শিকড়কে গর্বের সঙ্গে ধারণ করেন।

এবারের আসরে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রযুক্তি ছিল সহায়ক, নায়ক নয়। ডিজিটাল প্রজেকশন, আলোকসজ্জা কিংবা ইনস্টলেশন আর্ট ব্যবহার করা হয়েছে শুধু পোশাকের সৌন্দর্যকে আরও ফুটিয়ে তুলতে। আসল গুরুত্ব পেয়েছে ভারতীয় কারুশিল্প, সূচিকর্ম এবং কারিগরদের দক্ষতা।

প্রতিটি ডিজাইনারই যেন মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিলাসী ফ্যাশনের আসল মূল্য লুকিয়ে থাকে মানুষের হাতে তৈরি সূক্ষ্ম কাজে।

এবারের কতুর সংগ্রহগুলোতে আধুনিক কনেকে দেখা গেছে সম্পূর্ণ নতুনভাবে। তিনি শুধু ঐতিহ্য মেনে চলেন না, নিজের ব্যক্তিত্বও প্রকাশ করেন। একই পোশাক বিয়ে থেকে শুরু করে রিসেপশন কিংবা অন্য বিশেষ অনুষ্ঠানে নতুনভাবে পরার সুযোগও রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ কতুর এখন শুধু এক দিনের পোশাক নয়, বরং দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও উত্তরাধিকারের অংশ।

ইন্ডিয়া কতুর উইক ২০২৬ দেখিয়ে দিল, বিলাসী ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ শুধু ঝলমলে পোশাকে নয়; বরং গল্প, আবেগ, কারুশিল্প এবং ব্যক্তিত্বে।

র্যাম্পের গতি কমিয়ে, দর্শকদের থামতে, দেখতে এবং পোশাক অনুভব করতে শিখিয়েছে এই আসর। আর সেখানেই হয়তো কতুরের সবচেয়ে বড় জয়। যেখানে একটি পোশাক শুধু ফ্যাশন নয়, হয়ে ওঠে শিল্প, স্মৃতি এবং সময়ের সাক্ষী।
ছবি: ইনস্টাগ্রাম