প্রাদার নতুন র‌্যাম্প এবার চাঁদে, নাসার নভোচারীদের পোশাকে ফ্যাশনের ছোঁয়া
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সম্প্রতি নিউইয়র্কে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রাদা উন্মোচন করেছে এমন একটি পোশাক, যা ভবিষ্যতে চাঁদে যাওয়া নভোচারীদের পরিধানের অংশ হবে। মহাকাশ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সিওম স্পেসের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে এই বিশেষ ‘লিকুইড কুলিং অ্যান্ড ভেন্টিলেশন গার্মেন্ট’ (এলসিভিজি), যা মূল স্পেসস্যুটের ভেতরে পরতে হবে। প্রাদা ও অ্যাক্সিওম স্পেসের যৌথভাবে তৈরি স্পেসস্যুট এবং কুলিং গার্মেন্ট ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে, যা নাসার পরবর্তী চাঁদে অবতরণ কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হতে পারে।

আর্টেমিস–২-এর কমলা রঙের সুরক্ষা স্যুট তৈরি করেছিল একটি মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, কিন্তু চাঁদে হাঁটার ভবিষ্যৎ পোশাকের নকশায় এখন যুক্ত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড প্রাদা।

শুধু সুরক্ষা নয়, আরামও গুরুত্বপূর্ণ

মহাকাশের পরিবেশ পৃথিবীর যেকোনো চরম আবহাওয়ার চেয়েও কঠিন। সেখানে কাজ করার সময় নভোচারীদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সেই প্রয়োজন থেকেই তৈরি হয়েছে এই নতুন পোশাক।

দেখতে অনেকটা শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা স্পোর্টসওয়্যারের মতো হলেও এর ভেতরে রয়েছে বিশেষভাবে বোনা বায়ু চলাচল ও শীতলীকরণের বিশেষ ব্যবস্থা। এগুলো নভোচারীদের দীর্ঘ সময় আরামদায়ক থাকতে সাহায্য করবে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখবে।

প্রাদার ভাষায়, উন্নত থ্রিডি মডেলিং প্রযুক্তি, বিশেষ বুননপ্রক্রিয়া এবং উদ্ভাবনী উপকরণের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এই গার্মেন্ট। ফ্যাশন ডিজাইনের দক্ষতাকে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে একেবারে নতুন বাস্তবতায়।

র‍্যাম্প থেকে রকেট

প্রাদার মহাকাশযাত্রা অবশ্য আজকের নয়। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রথম আলোচনায় আসে যখন অ্যাক্সিওম স্পেসের সঙ্গে যৌথভাবে নতুন প্রজন্মের মুন স্পেসস্যুট উন্মোচন করে। সেই স্পেসস্যুটের বাইরের স্তর তৈরি করা হয়েছিল চাঁদের কঠিন পরিবেশের কথা মাথায় রেখে।

চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে তীব্র তাপমাত্রা পরিবর্তন, ধূলিকণা এবং ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাতের ঝুঁকি রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাদা তাদের উন্নত উপকরণ ও নির্মাণ দক্ষতা কাজে লাগিয়েছে।

এবার সেই প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন অধ্যায় হলো স্পেসস্যুটের ভেতরের আরামদায়ক স্তর তৈরি করা, যা ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিজ্ঞাপন

কেন মহাকাশে আগ্রহী ফ্যাশন ব্র্যান্ড?

একসময় মহাকাশ গবেষণা ছিল শুধু বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং সরকারি সংস্থাগুলোর কাজ। কিন্তু বাণিজ্যিক মহাকাশ ভ্রমণ ও স্পেস ট্যুরিজমের সম্ভাবনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আগ্রহী হয়ে উঠছে বিভিন্ন শিল্পখাত।

বিলিয়নিয়ার উদ্যোক্তা জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন এবং ইলন মাস্কের স্পেসএক্স ইতিমধ্যেই মহাকাশ ভ্রমণকে নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য গ্রাহকদের দিকে নজর দিচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশ ভ্রমণ আগামী দশকে ধনী ও প্রভাবশালী মানুষের নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। সেই ভবিষ্যৎ বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতেই প্রাডার মতো ব্র্যান্ডগুলো এখন থেকেই বিনিয়োগ করছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় ৬৩০ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৫ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ফলে প্রযুক্তি, পরিবহন, খুচরা বাণিজ্য, খাদ্য ও লাইফস্টাইল খাতের মতো ফ্যাশন শিল্পও এই সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রের দিকে নজর দিচ্ছে।

ফ্যাশনের নতুন সীমান্ত

ফ্যাশন জগতে সবার আগে নতুন কিছু করার গুরুত্ব অনেক। আর সেই জায়গা থেকেই প্রাদার এই পদক্ষেপকে ব্যতিক্রমী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এটি কেবল মহাকাশকে অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করা নয়; বরং বাস্তব মহাকাশ অভিযানের অংশ হয়ে ওঠা।

দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো মহাকাশঘেঁষা নকশা, ধাতব রং বা ফিউচার সিলুয়েট নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু প্রাদা সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে।

বিজ্ঞাপন

চাঁদের পথে ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ

বর্তমানে বৈশ্বিক বিলাসীপণ্য খাত নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এমন সময়ে মহাকাশ শিল্প অনেক ব্র্যান্ডের কাছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। আর সেই দৌড়ে প্রাদা নিজেকে প্রথম সারির পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
বিলাসবহুল ব্যাগ, জুতা কিংবা পোশাকের জন্য পরিচিত একটি ব্র্যান্ড যখন নভোচারীদের চাঁদে হাঁটার প্রস্তুতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু একটি ব্যবসায়িক সহযোগিতা নয়; এটি ফ্যাশনের বিবর্তনেরও গল্প হয়ে উঠে।

হয়তো আগামী দিনের ফ্যাশন ট্রেন্ড তৈরি হবে না শুধু মিলান, প্যারিস বা নিউইয়র্কে। তার কিছুটা জন্ম হবে পৃথিবীর বাইরে, মহাকাশের বিস্ময়কর অজানা জগতেও।

সূত্র: রয়টার্স

ছবি: প্রাদা

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১৩: ৫০
বিজ্ঞাপন