
ফ্যাশন জগতে একটি বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ রয়েছে- “অরেঞ্জ ইজ দ্য নিউ ব্ল্যাক” এই বাক্যটির মাধ্যমে বোঝানো হয়, কোন একটি নতুন ট্রেন্ড যা ক্ল্যাসিক বা বহু বছর ধরে জনপ্রিয় এমন ট্রেন্ডকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাশনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও ক্ল্যাসিক রং হিসেবে কালোকে ধরা হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে সেই জায়গাটি দখল করে নিচ্ছে প্রাণবন্ত, উজ্জ্বল ও আত্মবিশ্বাসী একটি রং—কমলা। আন্তর্জাতিক রেড কার্পেট থেকে শুরু করে হলিউড ও বলিউডের তারকাদের সাজ-পোশাকে এখন কমলার সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিশ্ব ফ্যাশনের আলোচনায় কমলাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন গ্লোবাল স্টাইল আইকন কাইলি জেনার। সম্প্রতি লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিনেতা টিমোথি শ্যালামেটের নতুন চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ারে কাইলি এবং শ্যালামেট উভয়কে দেখা যায় কমলা আউটফিটে। কাইলির পরনে ছিল শার্প কাটআউট ডিজাইনের ফ্লোর-টাচ গাউন, যা একই সঙ্গে ছিল সাহসী এবং আকর্ষণীয়। অন্যদিকে শ্যালামেট পরেছিলেন একই টোনের লেদার স্যুট। এই উপস্থিতি ফ্যাশন দুনিয়ায় কমলার প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
কমলা রঙের এই উত্থান শুধু পোশাকে নয়, সাংস্কৃতিক উপস্থাপনাতেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী টেইলর সুইফট তাঁর অ্যালবাম ‘দ্য লাইফ অব অ্যা শোগার্ল’-এ ‘প্রটোফিনো অরেঞ্জ’ নামে একটি বিশেষ শেডকে ভিজ্যুয়াল সিগনেচার হিসেবে ব্যবহার করেন।

ইতালির উপকূলীয় শহর পোর্টোফিনো থেকে অনুপ্রাণিত এই উষ্ণ ও সিট্রাস টোন ২০২৫ সালে ফ্যাশন ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ে নতুন ট্রেন্ড তৈরি করে।
একই ধারায় ২০২৫ সালের গোল্ডেন গ্লোবসেও কমলা রং নতুনভাবে আলোচনায় আসে জেনডায়ার উপস্থিতিতে। তিনি সেখানে হাজির হন রসি কমলা বা রাস্ট-অরেঞ্জ শেডের একটি গাউনে, যা ছিল ক্ল্যাসিক ও আধুনিক গ্ল্যামারের অনন্য সংমিশ্রণ। স্ট্রাকচার্ড করসেট-স্টাইল বডিস এবং নিখুঁতভাবে ফিট করা সিলুয়েট গাউনটিকে দিয়েছে ভাস্কর্যসুলভ সৌন্দর্য। গাউনটির ফ্যাব্রিকে ছিল মসৃণ সাটিনের উজ্জ্বলতা।

অফ-শোল্ডার কাট এবং কোমর থেকে ধীরে নেমে আসা ফ্লুইড ড্রেপ পুরো লুকে এনে দেয় পুরোনো হলিউডের আভিজাত্যের ছোঁয়া। মিনিমাল কিন্তু এলিগ্যান্ট জুয়েলারি এবং ক্ল্যাসিক ওয়েভ হেয়ারস্টাইলের সঙ্গে জেনডায়ার এই লুক কমলাকে শুধু আধুনিক ট্রেন্ড নয়, বরং চিরন্তন গ্ল্যামারের রং হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করে।
বলিউডেও কমলা রং নতুনভাবে ফিরে এসেছে আধুনিক নান্দনিকতায়। অভিনেত্রী অনন্যা পাণ্ডে সম্প্রতি মাসাবা গুপ্তার ডিজাইন করা রাস্ট রঙের ‘উইন্ডরোজ ক্রাশড শাড়ি’ পরে আলোচনায় আসেন। প্রায় ৩৫ হাজার রুপির এই শাড়িতে ভারী অলংকরণের বদলে টেক্সচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফয়েল প্রিন্টেড প্লিটস, ক্রাশড আঁচল এবং অ্যাপ্লিক ডিটেইলিং শাড়িটিকে দিয়েছে আধুনিক ও শিল্পসম্মত লুক। এই শাড়ির সঙ্গে অনন্যা পরেছিলেন গোল্ডেন গোঁটা ব্লাউজ, স্ট্যাকড চুড়ি এবং নীল ও সোনালি অ্যাকসেন্টের স্টেটমেন্ট দুল—যা পুরো লুককে দিয়েছে উষ্ণতা ও বৈচিত্র্য।
এছাড়াও তিনি মনীশ মালহোত্রার তৈরি ট্যানজারিন বেনারসি ব্রোকেড শাড়িতেও নজর কাড়েন। টিয়া পাখির মোটিফ ও জরির বর্ডার শাড়িটিকে ঐতিহ্যবাহী আভিজাত্য এনে দেয়, আর মাল্টিপল ব্যাক টাই-আপ ডিজাইনের ব্লাউজে যুক্ত হয় সমসাময়িক ফ্যাশনের ছোঁয়া।

এই স্টাইলিং প্রমাণ করে, কমলা শুধু পাশ্চাত্য ফ্যাশনে নয়, ঐতিহ্যবাহী পোশাকেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে অভিনেত্রী তৃপ্তি দিমরি কমলা রংকে উপস্থাপন করেছেন উৎসবমুখর আবহে। দ্রিষ্টি ও জাহাবিয়ার ডিজাইন করা উজ্জ্বল কমলা আনারকলিতে দেখা গেছে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি, প্রিন্টেড প্যান্ট এবং হালকা অর্গাঞ্জা ওড়নার সমন্বয়।

স্টেটমেন্ট সোনালি দুল ও চুড়ির সঙ্গে তাঁর সফট ওয়েভ চুল এবং হালকা মেকআপ পুরো লুককে দিয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্য, যেখানে রংই হয়ে উঠেছে মূল আকর্ষণ।

ফ্যাশন বিশ্লেষকদের মতে, কমলার জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এর বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্য। এটি একই সঙ্গে প্রাণবন্ত, উষ্ণ এবং আত্মবিশ্বাসী। মারিগোল্ড, ট্যানজারিন, রাস্ট কিংবা বার্ন্ট অরেঞ্জ—প্রতিটি শেড আলাদা আবেগ ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করতে সক্ষম। পাশাপাশি এই রং উৎসব, গ্রীষ্মকালীন স্টাইল কিংবা রেড কার্পেট গ্ল্যাম—সব ক্ষেত্রেই সহজে মানিয়ে যায়।

বর্তমান ফ্যাশন ট্রেন্ড স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে—কমলা এখন আর শুধুই সাহসী বা সীমিত ব্যবহারের রং নয় বরং এটি হয়ে উঠেছে নতুন ক্ল্যাসিক। তাই অনেক ফ্যাশন বিশ্লেষক বলছেন, “অরেঞ্জ ইজ দ্য নিউ ব্ল্যাক” শুধুমাত্র একটি প্রচলিত ধারণা নয়, বরং সময়ের ফ্যাশন ভাষা। যা সাহস, উজ্জ্বলতা এবং আধুনিক নান্দনিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ছবি: তারকাদের ইনস্টাগ্রাম