
প্যারিস মানেই বিলাসিতা, মিলান মানেই ঐতিহ্য। তাহলে লন্ডন ফ্যাশন উইককে কোন পরিচয়ে চেনা যায়? প্রশ্নটি এবারের আয়োজন ঘিরে যেন নতুন করে সামনে এসেছে। প্যারিস ও মিলানের দাপটে সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনের ফ্যাশন দৃশ্য কিছুটা ম্লান হয়েছে। ব্রিটিশ কয়েকটি ব্র্যান্ডও প্রদর্শনীর জন্য লন্ডনের বদলে বেছে নিয়েছে প্যারিস, মিলান কিংবা অন্য শহর। তাই লন্ডনের ফ্যাশন–দুনিয়ায় এখন নতুন এক প্রশ্ন, ব্রিটিশ ব্র্যান্ডগুলো কি আবার ফিরবে নিজেদের শহরে?

ফ্যাশন উইক শিডিউলের ধারাবাহিকতায় ক্রেতা ও ফ্যাশনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাগত জানিয়ে নিজেদের সৃজনশীলতা দেখানোর পালা যুক্তরাজ্যের রাজধানীর। কাজটি অবশ্য সহজ নয়। কারণ, লন্ডন ফ্যাশন উইকের পরই শুরু হবে মিলান ও প্যারিসের বড় বড় আয়োজন।
তবে লন্ডনের আকর্ষণ অন্য জায়গায়। জাঁকজমকের চেয়ে এই শহরের শক্তি তার সৃজনশীলতা, নতুন ভাবনা আর খানিকটা নিজস্ব ঢঙে এগিয়ে চলায়।

বিশ্বের বড় বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউসগুলোর অনেক সৃজনশীল পরিচালকের ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলো কেটেছে লন্ডনে। গিভেঞ্চির সারাহ বার্টন, ডিওরের জোনাথন অ্যান্ডারসন কিংবা হার্মেসের পুরুষদের পোশাক বিভাগের প্রধান গ্রেস ওয়েলস বোনার বড় দায়িত্বে যাওয়ার আগে লন্ডনেই নিজেদের নকশার ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছেন। তাই নতুন ডিজাইনারদের উঠে আসার ক্ষেত্র হিসেবে লন্ডনের ভূমিকা কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্রিটিশ ফ্যাশন কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী লরা ওয়েয়ারের ভাষায়, ‘প্যারিস যদি বিলাসিতা আর মিলান যদি ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত হয়, তাহলে লন্ডন সৃজনশীলতা ও নতুনত্বের শহর।’ তাঁর মতে, অন্য শহরের মতো হওয়ার চেষ্টা না করে লন্ডনের উচিত নিজের শক্তিকেই কাজে লাগানো। এবারের আয়োজনে তাই নজর থাকবে কয়েকজন উদীয়মান ডিজাইনারের দিকেও। তবে নতুন ডিজাইনারদের জন্য শুধু সৃজনশীলতাই যথেষ্ট নয়, টিকে থাকার লড়াইটিও গুরুত্বপূর্ণ।

গত এক দশকে পাইকারি বিক্রি ও একাধিক ব্র্যান্ডের পণ্যের দোকানের পরিসর কমে যাওয়ায় নতুন ব্র্যান্ডগুলোর বড় পরিসরে ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগও কমেছে। তাই ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করে নিজস্ব বাজার গড়ে তোলার পথটিই অনেক উদীয়মান ব্র্যান্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ব্রিটিশ ফ্যাশন কাউন্সিলও কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে।
লরা ওয়েয়ার জানিয়েছেন, পাইকারি বাজারের পরিবর্তন ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর ব্যবসা বড় করার সুযোগে বড় প্রভাব ফেলেছে। লন্ডনে ব্যবসায়িক কর ও বাড়িভাড়ার খরচও একটি সমস্যা। এ কারণে ডিজাইনারদের বিকল্প পথে মার্কেটে পৌঁছানোর বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

লন্ডনকে আবারও ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় এবারের আয়োজনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা আলেকজান্ডার ম্যাককুইনের প্রত্যাবর্তন। ২০০০ সাল থেকে প্যারিসে প্রদর্শনী করে আসা ব্র্যান্ডটি এবার ফিরছে লন্ডনে। সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোয় প্যারিসের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে ব্র্যান্ডটির সৃজন খুব বেশি আলোচনায় আসেনি। সেই দিক থেকে লন্ডনে ফিরে আসার সিদ্ধান্তটি তাদের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী রোববার সন্ধ্যায় আলেকজান্ডার ম্যাককুইনের প্রদর্শনী ঘিরে তাই আগ্রহ থাকবে আরও একটি কারণে। অন্য যেসব ব্রিটিশ ব্র্যান্ড লন্ডনের বদলে মিলান বা অন্য শহরে প্রদর্শনী করছে, তাদের কেউ নিজেদের শহরে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।
আগামী সোমবার রাতে লন্ডন ফ্যাশন উইকের সমাপ্তি টানবে বারবেরি। দীর্ঘ দুই বছর কঠিন সময় পার করার পর চলতি বছরের মে মাসে লাভজনক অবস্থানে ফেরার কথা জানিয়েছে ব্রিটিশ এই বিলাসবহুল ব্র্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাজারে বিক্রি বৃদ্ধিই এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ব্রিটিশ পরিচয়কে খানিকটা মজার ও নাটকীয় ভঙ্গিতে তুলে ধরার কৌশল অর্থাৎ ট্রেঞ্চ কোট, অলিভিয়া কোলম্যান আর চায়ের কাপ ব্র্যান্ডটির নতুন ভাবমূর্তির অংশ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে এবারের লন্ডন ফ্যাশন উইক যেন নিজের পরিচয়টিই নতুন করে মনে করিয়ে দিতে চাইছে। প্যারিসের বিলাসিতা কিংবা মিলানের ঐতিহ্যের সঙ্গে পাল্লা না দিয়ে সৃজনশীলতা ও নতুনত্বকে সামনে রেখে নিজের জায়গা তৈরি করাই লন্ডনের শক্তি। আর সেই শক্তির ওপর ভর করেই এবার প্রশ্ন উঠছে, ক্ল্যাসিক ও অভিজাত অথচ নতুনের জয়গান গাওয়া ব্রিটিশ ফ্যাশন কি আবার লন্ডনেই ফিরছে?