
ক্যামেলিয়ার সঙ্গ আমি উপভোগ করিনি। কবির মতন। তেমন কোন স্মৃতিও নেই। নেই কোন কমলাও; যে কিনা এসে বলবে ‘ডেকেছিস কেনে?’ তার কানে গোঁজা ক্যামেলিয়া ঝলমলিয়ে উঠে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করবে।

তবে হ্যাঁ ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটা আমাকে দারুণ আকৃষ্ট করে। যখনই পড়ি, প্রাসঙ্গিক মনে হয়। অথচ সেই কবে লিখেছিলেন কবি। আজ থেকে অন্তত ৯২ বছর আগের এক শ্রাবণদিনে। সেটা ছিল ১৩৩৯ সনের ২৭ শ্রাবণ। আবার এই শ্রাবণেই তিনি ‘এই বাটের লেনাদেনা ছিন্ন’ করেছিলেন। সেদিন ছিল বাইশে শ্রাবণ।
প্রিয় পাঠক, আমাদের সব আয়োজন আপনাদের জন্য। আপনাদের কেমন লাগল জানাতে পারেন আমাদের। জানাতে পারেন আপনি নিজে কীভাবে দেখতে চাইতেন কমলা ও তাঁর প্রেমিককে
হঠাৎ করেই বাতাস ভারী হয়ে গেল। অথচ সেটা তো হওয়ার কথা ছিল না। বরং অন্যভাবেই শুরু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সংখ্যাগুলো কেমন সব ওলটপালট করে দিল। আজকের স্মার্ট দুনিয়ায় সংখ্যাই সব। ডেটা দিয়েই যে কিস্তিমাত করা হচ্ছে।
তা সে যা–ই হোক। আমি বরং ক্যামেলিয়ার কথা বলি। এই ক্যামেলিয়ার সঙ্গে তো বটেই, ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটার সঙ্গে বাংলাদেশ তথা ঢাকার যোগ বেশ গভীর।
১৯২৬ সালে ঢাকায় এসেছিলেন কবি। শেষবারের মতো। সেবার তিনি নানা জায়গায় ঘুরেছেন। বলধা গার্ডেনেও। সেখানে রাত্রিবাসও করেছেন। ছিলেন জয় হাউসে। তাঁর ক্যামেলিয়া–দর্শন এখানেই। এই বলধা গার্ডেনে। এরপর কলকাতায় ফিরে গিয়ে লেখেন ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতা। এই ফুলের সৌন্দর্য বোধকরি মৌতাত বুনেছে।

কবিতাটি আমার ভীষণই প্রিয়। প্রতিটি চরিত্র আর এর চারপাশ একেবারেই জীবন্ত। দু–চার দিন কলকাতাবাসের অভিজ্ঞতা থাকলে তো সোনায় সোহাগা। যে কেউ খুব সহজেই রিলেট করতে পারবেন। পুরো বিষয়টা গদ্যে লিখলে অনবদ্য ছোটগল্প হয়ে উঠত বৈকি!
এই ক্যামেলিয়ামুগ্ধতা থেকেই তাকে রানওয়েতে রূপান্তরের একটা আইডিয়া মাথায় আমার ছিল। ঘুরপাক খেত। সেটাই বাস্তবায়িত হয় ২০১১ সালে। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের আয়োজন ছিল উল্লেখ করার মতো। সেই সময়ে সিল্করুট প্রকল্পের অধীন এই আয়োজনের একটি অংশ ছিল ফ্যাশন শো। সেবার কমিটিতে আমাকেও রাখা হয়েছিল। নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের হেড অব আর্টস সৈয়দ মাসুদ হোসেন। আমি প্রস্তাব করেছিলাম ‘ক্যামেলিয়া’কে ফ্যাশন শোয়ের বিষয় করার। এই প্রস্তাব গৃহীত হয়। তখন এই রূপান্তরের ভার পড়ে ফ্যাশন ডিজাইনার কুহু প্লামন্দনের ওপর। তিনি চমৎকারভাবে রূপায়িত করেন। মঞ্চে কবিতাটি পাঠ করা হয়। কোনো মিউজিক নয় বরং সেই কবিতার ছন্দেই হাঁটেন মডেলরা। পুরো আয়োজন দারুণ প্রশংসিত হয়।

সেখানেই শেষ নয়। বরং ‘ক্যামেলিয়া’কে নিয়ে নতুন কিছু একটা করার ভাবনা সব সময়ই আবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু হয়ে ওঠে না। এই না ওঠার মধ্যেই এবার সেই কিছু একটা করে ফেলা গেল। হাল ফ্যাশনের রবীন্দ্র–আয়োজনের অংশ হিসেবে।
বস্তুত বাঙালি জীবন রবীন্দ্রপ্রভাব ব্যতীত সম্ভব নয়। এত কিছু তিনি লিখে আর বলে গেছেন যে আমরা তাঁকে বাদ দিতে পারি না। সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রেমে আছেন তিনি, আছেন পূজায়। ফলে ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো’র কথাটাও তো তাঁকে ধার করেই উচ্চারণ করি। নতুনকে আহ্বানেও তিনি; পুরনো বিদায়েও তিনি। প্রেমে যেমন, বিরহেও তেমন। বাঙালির ‘জীবনপাত্র উচ্ছ্বলিয়া’ টইটম্বুর মাধুরী তিনিই তো দান করে গেছেন। প্রজন্মান্তরে আমরা সেই পাত্র বহন করে চলেছি। প্রজন্মান্তরে নিজেদের ঋণী করে অদ্ভুত পুলক অনুভব করছি।

আবারও ‘ক্যামেলিয়া’তে ফিরি। ঢাকার বলধা গার্ডেনের ক্যামেলিয়ায় তিনি কীভাবে এক সাঁওতাল মেয়ের সৌন্দর্যশোভা বাড়ালেন, তা ভাবতে অবাক লাগে।
এক ক্যামেলিয়াকে নিয়ে যে কবিতা তিনি লিখলেন, সেখানে কলকাতা থাকল, থাকল দার্জিলিং হয়ে সাঁওতাল পরগণা। চরিত্রগুলোকে স্থান বুঝে অনিন্দ্য কুশলতায় ‘ফিট ইন’ করালেন। ‘ক্যামেলিয়া’কে ঘিরে নানা নাটকের নানা অঙ্ক। আর তাতে কুশিলবেরা বেশ পাট করে চললেন। নেপথ্যে থাকলেন কবি। তা–ও বেশ সরবে।
অথচ কি আশ্চর্য, সেই কবে ৯২ বছর আগে কলকাতায় বসে লেখা এই কবিতাটাকে আজকের প্রেক্ষাপটে কোনোভাবে সেকেলে বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। বরং বর্তমানের এআই জমানায় ততটাই দাবি রাখে সমসময়ের, যতটা কবির কাছে সেই সময়ে মনে হয়েছিল।

আজও কোনো ছেলে বা মেয়ের মনে জায়গা করে নেয় কেউ না কেউ। তার জন্য জীবনপাতেও পিছপা হয় না। আজও তো রাখে জীবন বাজি। অপেক্ষা করে বাসস্টপে। হাতে না লিখলেও ই–মেইল যে করে। আর মেসেজ তো আছেই। আজও কমলারা কলেজে যায়। নানা বাহনে। প্রিয় মানুষ কেউ সঙ্গে থাকে। দূর থেকে ঈর্ষাতুর দৃষ্টি কি এসব কমলাদের অনুসরণ করে না? তাদের মধ্যেও তো কেউ কেউ বীরপুরুষ হয়ে ওঠার খায়েশ পোষণ করে। আবার অনেকে এমনও আছে, একতরফা ভালোবেসে যায় সুতনুকাদের মতো।
এই কবিতা পড়তে পড়তে আরও একটা বিষয় দাগ কাটে। রবীন্দ্রনাথের ফ্যাশন সেন্স। প্রতিটি চরিত্রের পোশাকের বর্ণনা নিখুঁত আর চমৎকার। তিনি কত কিছুই যে জানতেন, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য হবে নাইবা কেন। সেই সময়ে তিনি সুইমিং কস্টিউম পরে গঙ্গায় রীতিমতো দাবড়ে বেড়িয়েছেন।

এতটা স্মার্ট কবি, বলা বাহুল্য নয়—খুব কমই আছেন। কারণ, কবিদের ধরেই নেওয়া হয় আলাভোলা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জীবন আর প্রকৃতিকে আত্তীকরণ করা এক মানুষ। শর্ট আর রেশমের বিলিতি জামা পরা কমলার প্রেমিককে যেমন তাঁর চোখে পড়ে তেমনি দৃষ্টি এড়ায় না বুনো ফুল, হরীতকীগাছ, পলাশবনে তসরের গুটি।
সেই প্রাসঙ্গিকতাই আজকের উপজীব্য। সমানভাবে আকৃষ্ট করে। একটুও বাড়াবাড়ি মনে হয় না। তাই তো আমরা পুনঃসৃজনের সাহস করি। চরিত্র রূপায়ণে প্রয়াসী হই। বলা যেতে পারে এটা এক অর্থে গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা। কবির কবিতায় কবিকে স্মরণ।
‘ক্যামেলিয়া’য় চরিত্রের সংখ্যা কম নয়। কমলা ও তার প্রেমিক। কমলার মা ও মামা। মোহনলাল ও তার বোন সুতনুকা। আর অবশ্যই সাঁওতাল মেয়ে। নেপথ্যে কলকাঠি নাড়া কবি।
তবে আমরা এতসব চরিত্র নয় বরং দুটিকে চয়ন করেছি। ঠিক আজকের প্রেক্ষাপটে আবর্তিত আমাদের ভাবনা। এখানে ব্যাকড্রপ অবশ্যই ঢাকা। আজকের ঢাকা। এই ২০২৪ সালের ঢাকা। কোনো মতেই আমরা ফিরতে চাইনি ৯ দশক আগে। এমনকি আজকের কলকাতাকেও আমাদের ভাবনায় ভিড়তে দিইনি। ওরা না হয় ভাবুক ওদের মতো করে। এখানে আমাদের আধার, আমাদের অনুঘটক কিংবা প্রেরণা চির–আধুনিক রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর ‘ক্যামেলিয়াখানি’।

আমরা চিত্রিত করেছি কমলা ও তার প্রেমিককে। তারা একেবারেই আজকের ঢাকার বাসিন্দা। দুই তরুণ। জেন–জি বা মিলেনিয়াল। তারা আধুনিক। স্মার্ট আর ফ্যাশনেবল। তারা ট্রেন্ডি আরবানাইট। তারা ভুবনগ্রামের অধিবাসী। হাতের মুঠোয় দুনিয়া তাদের।
ক্যাজুয়ালি ক্ল্যাসি লুকেই দেখতে চেয়েছি আমরা কমলা ও তাঁর প্রমিককে। পরিমিতি প্রাধান্য পেয়েছে পোশাক, অনুষঙ্গ আর মেকআপে। এখানে কমলা গম্ভীর নয়। এমন কি তাঁর প্রেমিকও। বরং তারা উচ্ছল, উজ্জ্বল। গল্পে, হাসিতে, অন্তরঙ্গ আবেশে। যেন তারা ভেসে যায় এমনি এমনি। আলোর মতন, হাসির মতন; কুমুশগন্ধরাশির মতন; আবার কখনো কখনো হাওয়ার মতন, নেশার মতন। কিংবা ঢেউয়ের মতন ওরা এসে যায়।

এটাই তো আজকের প্রজন্ম। ওদের ভালোলাগা, মন্দলাগা, ওদের উচ্ছ্বাস কিংবা ম্রিয়মানতা ঠিক ওদের মতোই। আজকের জেন জি বা মিলেনিয়ালদের আবেগ নিয়ন্ত্রিত নয়। এরা ভানহীন, অসংকোচ আর অকপট।
কবি সেই সময়ে যা প্রতীয়মান করেছেন, তার মিল আমরা এই সময়ে একেবারেই যে পাই না তা নয়। বরং মিলটা বেশিই। তবে হ্যাঁ তফাৎ তো থাকবেই। এর মূলে। প্রজন্মে ব্যবধান সময়ই গড়ে দেয়।
কবির কল্পনাকে ধারণ করে আমাদের মতো করেই সাজিয়েছি দুটি চরিত্র। সঙ্গে এ–ও ভেবেছি, কী বলতেন কবি আজ তাঁর কমলা ও তার প্রেমিককে আমাদের আঁকা ছবিতে দেখলে? বেজার হতেন, নাকি খুশি? তিনিও কি ভাবতেন না আজকের মতো করে? রেশমের শার্ট আর শর্ট তো তিনি তখনই পরিয়েছেন। কমলার পোশাকের বর্ণনা কবি দেননি। তবে আমাদের পোশাকে মূর্ত কমলাকে কবির অপছন্দের কারণ ঘটত বলে মনে হয় না। এসব ভেবেই এই সাহস আমরা করেছি কবিতর্পণের উপলক্ষ হিসেবে।

ভাবনা ও স্টাইলিং: শেখ সাইফুর রহমান
মডেল: আজিম ও এফা
ওয়ার্ডরোব: আজিম ও এফার ব্যক্তিগত সংগ্রহ
মেকাআপ: পারসোনা
লোকেশন: ক্যানভাস স্টুডিও
সার্বিক তত্ত্ববধান: টিম হাল ফ্যাশন
কৃতজ্ঞতা: ক্যানভাস ও টিম হাল ফ্যাশন
ছবি: পূর্ণ দাস