ফ্রিদা কাহলো: এক কালোত্তীর্ণ আর সর্বজনীন ফ্যাশন আইকন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ফ্রিদা কাহলো আসলে কে? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকেরই জানা। একজন ক্ষণজন্মা তবে চরম প্রাসঙ্গিক ও প্রভাবশালী চিত্রশিল্পী; কিন্তু তিনি আসলে কার? এই প্রশ্নের জবাব কী? ২০১৮ সালে লন্ডনের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে ফ্রিদার চিত্রকর্ম এবং ব্যবহৃত পোশাক ও অনুষঙ্গ নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেই প্রদর্শনীর কো-কিউরেটর সির্সে হেনেসত্রোসা বলেন, ‘ফ্রিদা কাহলো এখন মেক্সিকোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিত্রশিল্পী। আর মানুষ তাঁর কাজের সঙ্গে দ্রুতই নিজেদের মেলাতে পারে। এ জন্য ফ্যাশন ডিজাইনার, নারীবাদী আন্দোলনকারী, শিল্পী, সংস্কৃতিবান মানুষসহ সবাই তাঁকে নিজেদের মানুষ ভাবে।’

সবার প্রিয় ফ্রিদার জন্ম ১৯০৭ সালের ৬ জুলাই, মেক্সিকোর কোয়োকান শহরে। আজ তাঁর ১১৭তম জন্মবার্ষিকী। মৃত্যু ১৯৫৪ সালের ১৩ জুলাই। বেঁচে ছিলেন মাত্র ৪৭ বছর। এই সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যা করে গেছেন, তাঁর প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। ফ্রিদা তাঁর চিত্রকর্মে বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা ও কল্পকথাকে এক সুতায় গেঁথেছেন। সঙ্গে যোগ হয়েছে মেক্সিকোর ঐতিহ্য। ফ্রিদা নিজেই ছিলেন নিজের মিউজ। তাঁর যে ২০০টি চিত্রকর্ম পাওয়া যায়, তাঁর ৫৫টিই ছিল আত্মপ্রতিকৃতি। শুধু তা–ই নয়, তিনি ছিলেন অসাধারণ স্টাইলিস্টও।

বিজ্ঞাপন

সুক্ষ্ম বোধসম্পন্ন, শক্ত মনের ফ্রিদা ছোটবেলা থেকে পোলিওতে আক্রান্ত। এ কারণে তাঁর একটি পা আরেকটি থেকে বেশি বড় ছিল। নিজের শারীরিক ত্রুটি ঢাকার জন্য লম্বা ঝালরের জামা বেছে নেন। পায়ের ভারসাম্য রাখতে ডান পায়ে অনেকগুলো মোজা লেয়ার করে পরা শুরু করেন। ১৮ বছর বয়সে ভয়ানক বাস দুর্ঘটনার শিকার হন। সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলেন; কিন্তু তাতেও ফ্রিদা থেমে থাকেননি। তাঁর ব্যথাকে তিনি শক্তিতে পরিণত করে ইচ্ছামতো ছবি এঁকে গিয়েছেন। নিজেকে সাজানোও বন্ধ করেননি। মেরুদণ্ডে মারাত্মক আঘাত পাওয়ার কারণে তাঁকে মেডিকেল কোরসেট পরতে হতো।

আবার পা কেটে ফেলার পর তাঁকে কাঠের কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। কৃত্রিম পায়ে লাল চামড়ার বুট ছিল। সেই কোরসেট ও বুটে তিনি লেস ও ঘণ্টা লাগিয়েছিলেন। রংও করেছিলেন। শারীরিক ত্রুটি ঢাকতে ফ্রিদার লম্বা জামা (স্কার্ট) পরা অব্যাহত থাকে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় হুইপিল নামের টপ ও রঙিন ব্লাউজ। চিত্রকর্ম হোক বা ফ্যাশন—ফ্রিদা এখনো প্রাসঙ্গিক। যুগে যুগে তাঁর চিত্রকর্ম অনুপ্রাণিত করেছে সারিয়ালিস্ট বা পরাবাস্তববাদী চিত্রশিল্পীদের; আর তাঁর স্টাইল—ফ্যাশন ডিজাইনারদের।

ফ্রিদার নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে লেস দেওয়া বর্ণিল স্কার্ট, ব্লাউজ আর মুকুট-বেণিতে ফুল দেওয়া জোড়া ভ্রুর এক নারী। যার চোখে আছে রহস্যময় দীপ্তি। ফ্রিদা নিজের সাজপোশাকে স্বকীয়তা তৈরি করেছিলেন। তাঁর পোশাক ও অনুষঙ্গে চলত রঙের খেলা। তাঁর স্টাইলকে ব্যবচ্ছেদ করলে পাওয়া যাবে ‘ফেমিনিনিটি’, অর্থাৎ নারীত্ব। তবে ফ্রিদা নারীর কোমলতার উর্ধ্বে গিয়ে শক্তিকেই প্রকাশ করেছেন।  ফ্রিদা তেহুয়ানা নামের বিশেষ পোশাক পরতেন। মেক্সিকোর আদিবাসী মাতৃতান্ত্রিক সমাজের নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ছিল এটি। ফ্রিদা তেহুয়ানা পরার মধ্য দিয়ে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে তুলে ধরেন। এই পোশাক হয়ে ওঠে মেক্সিকান বিপ্লবীদের সাংস্কৃতিক প্রতীক। ফ্রিদার এই বিশেষ স্টাইল পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ফ্যাশন ডিজাইনারকে অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

যেমন আলবার্টা ফেরেট্টির কথাই বলা যায়। ইতালিয়ান ফ্যাশন ডিজাইনার ২০১৪ সালে তাঁর বসন্ত বা গ্রীষ্মের কালেকশন সাজিয়েছিলেন ফ্রিদার পোশাক থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে। তাঁর পোশাকে ফুলেল নকশা বেশি দেখা যেত। অনুষঙ্গ হিসেবে পরতেন বড় ড্রপ ইয়াররিং। ফেরেট্টি ফ্লোরাল ড্রেস যেমন বানালেন, তেমন মডেলদের ফ্রিদার মতো কানের দুল পরিয়ে র‍্যাম্পেও হাঁটিয়েছেন।

২০১৬ সালে ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান ফ্যাশন ডিজাইনার নাইম খান ফ্রিদার অনুপ্রেরণায় আনেন অসাধারণ একটি কালেকশন। ফ্রিদাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন ফরাসি আভোঁ গাদ ফ্যাশন ডিজাইনার জ্যঁ পল গতিয়ের। গতিয়ের ফ্রিদার স্টাইল থেকে শুরু করে পরাবাস্তব চিত্রকর্ম—এই সবকিছু থেকে সূক্ষ্ম উপাদানগুলো নিজের ডিজাইনে ধারণ করতেন।  

ফ্রিদার স্টাইল নিয়ে আরও কিছু কথা না বললেই নয়। বিয়ে করেছিলেন মেক্সিকোর বিখ্যাত ম্যুরাল আর্টিস্ট দিয়েগো রিভেরাকে। বিয়ের আগে তিনি ইউরোপিয়ান পোশাক পরতেন বেশি। বিশেষ করে ভিক্টোরিয়ান ঘরানার গাউন। বিয়ের পর ফ্রিদা তেহুয়ানা পরা শুরু করেন।আর তা স্বামীর পছন্দেই; কিন্তু ধীরে ধীরে এই পোশাকই তাঁর স্বকীয়তার প্রতীক হয়ে ওঠে। এখানে আরেকটি মজার তথ্য দিতে হয়। ফ্রিদা কিন্তু একসময় শাড়ির প্রেমে পড়েছিলেন। পুরোনো ছবি ঘেঁটে তাঁর শাড়ি পরা ছবি পাওয়া যায়। এ জন্য অবশ্য ধন্যবাদ জানাতে হয় ভারতীয় লেখক নয়নতারা সেহগালকে। ১৯৪৭ সালে ছোট বোন রিতাকে নিয়ে মেক্সিকোয় ঘুরতে যান নয়নতারা। সেখানে ফ্রিদার বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এই দুই বোন। তাঁদের কারণে শাড়ি পরে ছবি তোলেন ফ্রিদা।

ছবি: ইনস্টাগ্রাম ও উইকিপিডিয়া

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৪, ১৪: ৩১
বিজ্ঞাপন