
পরিচিত জামদানিকে সমকালীন পোশাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন ফ্যাশন ডিজাইনার শরিয়ার আলী খান। তাঁর পোশাকের সংগ্রহ ‘রিওয়ায়াত-হোয়্যার হেরিটেজ মিটস দ্য নাও’-তে জামদানির ঐতিহ্যবাহী মোটিফ ও বুননের সঙ্গে মিলেছে আধুনিক সিলুয়েট।

সংগ্রহটি তৈরি হয়েছে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) সহকারী অধ্যাপক শর্মিলী সরকার মিশুর তত্ত্বাবধানে।

‘রিওয়ায়াত’ শব্দের অর্থ ঐতিহ্য, প্রথা বা প্রচলিত রীতি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত ঐতিহ্য, জ্ঞান ও কারুশিল্পের ধারাবাহিকতাই এই সংগ্রহের মূল ভাবনা। জামদানির পরিচিত জুপ ফুল, পাটি জাল ও জুঁই ফুলের মোটিফকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন শরিয়ার।

পোশাকগুলোতে প্রধানত ব্যবহার করা হয়েছে সাদা ও কালো রং। ফলে রঙের বৈচিত্র্যের বদলে জামদানির বুনন, মোটিফ ও জ্যামিতিক বিন্যাসই হয়ে উঠেছে পোশাকগুলোর মূল আকর্ষণ। শরিয়ার আলী খানের ভাষায়, ‘জামদানি শুধু একটি কাপড় বা বয়নশিল্প নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কারিগরের প্রজন্মান্তরের জ্ঞান বহন করে। আমি চেয়েছি সেই ঐতিহ্যকে হুবহু পুনরাবৃত্তি না করে আজকের প্রজন্মের চোখে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে।’
‘রিওয়ায়াত’-এর ছয়টি পোশাকে জামদানিকে ছয়টি ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি পোশাকেই ঐতিহ্যবাহী জামদানি মোটিফের সঙ্গে মিশেছে আধুনিক সিলুয়েট, কাট ও নির্মাণশৈলী। ফলে চেনা জামদানি পেয়েছে সমকালীন ফ্যাশনের নতুন ভাষা।

প্রথম পোশাকে রয়েছে ডাবল পকেট ক্রপড কিউবান কলার শার্ট। এর সঙ্গে রয়েছে সামনের অংশে বিশেষ ডিজাইন প্যানেলযুক্ত এ-লাইন প্লিটেড মিডি স্কার্ট। সাদা জমিনে কালো জামদানি মোটিফের নকশায় পোশাকটিতে ফুটে উঠেছে ঐতিহ্যের ছাপ। অন্যদিকে ক্রপড শার্ট ও প্লিটেড স্কার্টের সমন্বয়ে পুরো লুকে এসেছে আধুনিক ও ট্রেন্ডি আবেদন।
দ্বিতীয় পোশাকে রয়েছে কিউবান কলার শার্ট। এর সঙ্গে পরা হয়েছে বুটকাট প্যান্ট। সাদা-কালোর জামদানি নকশায় সাজানো শার্টটির সঙ্গে বুটকাট প্যান্টের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ছিমছাম অথচ স্টাইলিশ একটি লুক।

তৃতীয় পোশাকটি তৈরি হয়েছে ১৬ কলি আনারকলি সিলুয়েটে। এর সঙ্গে রয়েছে স্টেটমেন্ট টু-স্ট্র্যাপ ক্রপ টপ ও ওয়াইড-লেগ প্যান্ট।


ঐতিহ্যবাহী আনারকলিকে এমন সমকালীন কাঠামোয় উপস্থাপনই পোশাকটির বিশেষত্ব।
চতুর্থ পোশাকে জামদানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ফরমাল পোশাকের কাঠামো।

ডাবল-ব্রেস্টেড ব্লেজারের সঙ্গে রয়েছে ওয়াইড-লেগ বটম। ব্লেজারের জমিনজুড়ে ব্যবহার করা হয়েছে নজরকাড়া জামদানি মোটিফ।

উৎসবের আবহকে মাথায় রেখে সংগ্রহে রাখা হয়েছে পাঞ্জাবিও। স্লিম-ফিট পাঞ্জাবির বুকের অংশে করা হয়েছে ডিটেইলড ডাবল প্যানেলের কাজ। এর সঙ্গে মিলিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে ওয়াইড-লেগ ট্রাউজার্স।


সবশেষে রয়েছে আরেকটি কিউবান কলার শার্ট। শার্টটির বুকের অংশে করা হয়েছে প্যাঁচ প্যানেলের কাজ। এর সঙ্গে জুটি হয়েছে বুটকাট প্যান্ট। প্যানেল ও জামদানি মোটিফের ব্যবহারের সঙ্গে বুটকাট সিলুয়েটের সমন্বয়ে এই পোশাকেও ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন স্পষ্ট।

‘রিওয়ায়াত’-এর পোশাকগুলোতে শুধু মোটিফের ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ডিজাইনার। সিলুয়েট তৈরিতেও রয়েছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। শিয়ার লেয়ার, নেগেটিভ স্পেস, ভলিউম ও টেক্সচারের ব্যবহারে জামদানির পরিচিত রূপকে তিনি নিয়ে গেছেন সমকালীন পোশাকের পরিসরে। বিভিন্ন ধরনের কাট ও প্যাটার্নের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সংগ্রহটিতে।

রঙের বৈচিত্র্যের বদলে সাদা-কালো বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে শরিয়ার বলেন, ‘আমার উদ্দেশ্য ছিল রং নয়, বরং জামদানির বুনন, মোটিফ ও কারিগরের হাতের কাজকে সামনে নিয়ে আসা। আমি চেয়েছি দর্শক প্রথমে পোশাকের গঠন, টেক্সচার ও বুননের গল্প অনুভব করুক।’ছয়টি পোশাকেই তাই জামদানির ঐতিহ্য ধরা দিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে। কখনো স্কার্টে, কখনো শার্টে, কখনো আনারকলি বা ব্লেজারে; পুরুষের পোশাকেও এসেছে পাঞ্জাবি ও কিউবান কলার শার্টের মতো ট্রেন্ডি নকশা।

পরিচিত জামদানি মোটিফকে অপরিবর্তিতভাবে তুলে ধরার বদলে পোশাকের কাট, গঠন ও সিলুয়েটের সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে ব্যবহার করাই এই সংগ্রহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শরিয়ার আলী খানের কাছে ঐতিহ্য মানে শুধু অতীতকে ধরে রাখা নয়, বরং তাকে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। তাঁর কথায়, ‘আমার কাছে হেরিটেজ মানে শুধু অতীতকে সংরক্ষণ করা নয়, বরং সেটিকে এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে তা বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গেও কথা বলে। “রিওয়ায়াত” সেই কথোপকথনেরই একটি প্রচেষ্টা।’
ছবি: শরিয়ার আলী খান