প্যারিস ফ্যাশন উইক ২০২৬:  জিভাঁশির শোতে আমন্ত্রিত বাংলাদেশের তাসমিম জোবায়ের
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বিশ্ব ফ্যাশনের সবচেয়ে গ্ল্যামারাস ও প্রভাবশালী আসরগুলোর একটি প্যারিস ফ্যাশন উইক ২০২৬। আলো, ক্যামেরা, সৃজনশীলতা আর সাংস্কৃতিক ভাষ্যের এই মহামঞ্চে এবার দৃশ্যমান হয়েছে বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল নাম—তাসমিম জোবায়ের।
জিভাঁশির স্প্রিং–সামার ২০২৬ উইমেনসওয়্যার কালেকশনে তাঁর সম্পৃক্ততা কেবল একটি পেশাগত অর্জন নয়; বরং এ এক সৃজনযাত্রা, যেখানে স্থানীয় সত্তা মিশে গেছে বৈশ্বিক নান্দনিকতার সঙ্গে।

বিজ্ঞাপন

সারাহ বার্টনের ভিশন: আধুনিক নারীর পুনর্জাগরণ

জিভাঁশির ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর সারাহ বার্টনের এই কালেকশন যেন রেখে গেছে এক নান্দনিক প্রশ্ন—‘আমরা কীভাবে নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলব এই পৃথিবীতে?’
নিখুঁত কাট, শার্প টেইলারিং এবং নিটোল সিলুয়েটের ভেতর দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন আধুনিক নারীর শক্তি, ভঙ্গুরতা এবং বহুমাত্রিক পরিচয়।

ফ্লুইড ড্রেপ, শৈল্পিক টেক্সচার, এমনকি ইউরোপিয়ান ক্ল্যাসিক চিত্রকলার প্রভাব—সব মিলিয়ে এই শো হয়ে উঠেছে একাধারে সমকালীন, আবার চিরকালীনও।

পারিপাট্যে প্রতীয়মা সৃজনসৌকর্য

তাসমিমের ভাষায়, জিভাঁশির আসল শক্তি তাদের সূক্ষ্ম কারিগরি— একটি স্লিভের মাত্র কয়েক মিলিমিটার পরিবর্তনই বদলে দিতে পারে পুরো পোশাকের ভাষা।
স্টুডিওতে আমাদের প্রতিটি দিন শুরু হতো স্কেচ আর ফেব্রিক নিয়ে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। প্যাটার্ন মেকার, ডিজাইনার, আর্টিজান—সবার মিলিত উপস্থিতিতেই তৈরি হতো এক নীরব সিম্ফনি।

প্রথম স্কেচ থেকে র‍্যাম্পের চূড়ান্তরূপে পৌঁছাতে বারবার বদলেছে একটি ডিজাইন, পরিণত হয়েছে, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি আমি।

বিজ্ঞাপন

প্রস্তুতির দিনগুলো: নিরবচ্ছিন্ন ছন্দের ভেতর সৃজন

ফ্যাশন উইকের প্রস্তুতি মানেই এক অবিরাম গতিময়তা। স্টুডিওর ভেতর তখন সময় যেন নদীর স্রোতের মতো দ্রুত বহমান। ফেব্রিক নির্বাচন, ফিটিং সেশন, শেষ মুহূর্তের সংশোধন—সবকিছু সমান্তরালে চলতে থাকে। প্রতিটি লুক ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে এক একটি গল্প হয়ে ওঠে; সেই গল্পই দর্শকদের শোনানো হয় র‍্যাম্পে। এভাবে পূর্ণতা পায় আমাদের সৃজনস্বপ্ন।

ব্যাকস্টেজ: এক বিদ্যুৎময় জগৎ

রানওয়ের দিনটি যেন এক বিস্ফোরিত আবেগের। ব্যাকস্টেজে তখন সবকিছু চলে দ্রুতলয়ে, নিখুঁত ছন্দে। মডেল, স্টাইলিস্ট, মেকআপ আর্টিস্ট, ফটোগ্রাফার, প্রযোজক— সবাই ছুটে চলে সংকীর্ণ করিডর ধরে।

স্টিম আয়রনের গরম বাষ্প, গার্মেন্ট ব্যাগের শব্দ, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ক্রমেই এগিয়ে যায় পরিণতির পথে।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেও থাকে এক অদ্ভুত ছন্দ। প্রতে৵ক মানুষ জানেন—তাঁর ভূমিকা, প্রতিটি মুহূর্ত জরুরি, প্রতিটি স্পর্শ অপরিহার্য।

অপেক্ষা, উত্তেজনা আর স্বপ্নের উদ্‌যাপন

ডিজাইনারদের জন্য এই সময়টা এক অদ্ভুত অনুভূতির। মাসের পর মাসের শ্রম, ভাবনা আর নিরবচ্ছিন্ন সাধনা মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়। এ যেন একসঙ্গে অপেক্ষা, উত্তেজনা আর শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতার উদ্‌যাপন।

যখন র‍্যাম্পে নেমে আসে গল্প

প্রথম লুকটি র‍্যাম্পে পা রাখলে মনে হয়—সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, মাঝে কেবল শোনা যায় ক্যামেরার ক্লিক আর সুরের মৃদু প্রবাহ। প্রতিটি সিলুয়েট, প্রতিটি রেখা, প্রতিটি সেলাই হয়ে ওঠে এক জীবন্ত গল্প; এ তো শুধু পোশাক নয়; বরং অভিব্যক্তি, দর্শন আর সময়ের ভাষা।
মডেলদের পদচারণের সঙ্গে পুরো কালেকশন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় উপস্থিত দর্শক আর বিশ্বজুড়ে থাকা ফ্যাশনপ্রেমীদের সামনে।

স্বপ্নের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা

‘মনে হচ্ছিল আমি যেন এক স্বপ্নের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি’, বলছিলেন তাসমিম।
মাসের পর মাসের পরিশ্রম কয়েক মিনিটে প্রকাশ পায়, এ যেন একই সঙ্গে বিস্ময় আর আবেগের এক অনন্য মিশ্রণ। সেই মুহূর্তে ডিজাইনগুলো আর স্টুডিওর সীমায় বন্দী থাকে না; হয়ে ওঠে সময়ের, সংস্কৃতির এবং এক বৃহত্তর সৃজনকাহিনির অংশ।

বাংলাদেশের ফ্যাশনের নতুন দিগন্ত

তাসমিম জোবায়েরের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটা বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য এক গর্বের অধ্যায়। জিভাঁশির মতো একটি আইকনিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করা তাঁর ক্যারিয়ারে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

এটি প্রমাণ করে বাংলাদেশের ডিজাইনাররা এখন শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নন; বরং তারা বিশ্ব ফ্যাশনের ভাষায় কথা বলছেন, নিজেদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে।

এক নতুন বৈশ্বিক গল্পের সূচনা

এই গল্প কেবল একজন ডিজাইনারের নয়; বরং এটা বাংলাদেশের এক প্রজন্মের, এক স্বপ্নের গল্প। যেখানে সৃজনশীলতা, পরিশ্রম আর দুঃসাহস মিলেমিশে তৈরি করছে নতুন এক বৈশ্বিক পরিচয়।

প্যারিসের র‍্যাম্পে সেই গল্প আজ উচ্চারিত; সেটি হয়তো নীরব, তবু গভীরভাবে অনুরণিত।

ছবি: তাসনিম জোবায়ের

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬, ১৭: ০০
বিজ্ঞাপন