ঈদের সিনেমা ‘দম’: ইদিলা ফরিদ তুরিনের লুক ডিজাইনের গল্প
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বাংলা সিনেমায় লুক ও কস্টিউম ডিজাইনের জগতে ইদিলা ফরিদ তুরিন একটি পরিচিত নাম। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এবারের ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘দম’-এ তিনি হাজির হয়েছেন একেবারেই অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে। এই ছবিতে তাঁর কাজ শুধু কস্টিউম ডিজাইন ছিল না, বরং ছিল চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার নীরব শিল্পচর্চা।

শেষ মুহুর্তে ঠিকঠাক করে দেওয়া
শেষ মুহুর্তে ঠিকঠাক করে দেওয়া

পরিচালক রেদোয়ান রনির সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজের সম্পর্ক থেকেই এ প্রকল্পে তাঁর যুক্ত হওয়া। বিজ্ঞাপনের সময় থেকেই গড়ে ওঠা পারস্পরিক বোঝাপড়া ধীরে ধীরে গভীর হয়েছে। ‘দম’-এর গল্প প্রথম শোনার পরই তুহিন অনুভব করেন—এটি সাধারণ কোনো সিনেমা নয়। গল্পের আবেগ, চরিত্রের স্তর, আর রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট তাঁকে টেনে নেয় ভেতরের দিকে। সেই টান থেকেই এই যাত্রা।

বিজ্ঞাপন

এই ছবির লুক ডিজাইনের মূল দর্শন—চরিত্র আগে, নান্দনিকতা পরে। অর্থাৎ বাহ্যিক সৌন্দর্যের আগে চরিত্রের সত্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া। তাই পুরো কস্টিউমে রাখা হয়েছে আর্থি, র ও আনফিল্টার্ড এক অনুভব। মেটে রং, বিবর্ণ সবুজ, ধূসর বাদামি বা অফ হোয়াইট— এ ধরনের রঙের ব্যবহার ছবির আবহকে করেছে ভারী, চাপা ও গভীর। প্রতিটি চরিত্র তাদের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়, আলাদা করে চোখে না পড়ে, বরং মনে দাগ কাটে—এভাবে পোশাকের রং নির্বাচন করা হয়েছে।

আফরান নিশোর সঙ্গে ইদিলা ফরিদ তুরিন
আফরান নিশোর সঙ্গে ইদিলা ফরিদ তুরিন

শুটিং হয়েছে কাজাখস্তানের শুষ্ক ও কনকনে ঠান্ডা পরিবেশে। এই চরম আবহাওয়ায় কাজ করাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। গল্পের প্রয়োজনে যেখানে হালকা পোশাক দরকার, সেখানে বাস্তবে তীব্র ঠান্ডা সামলাতে লুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখতে হয়েছে থার্মাল লেয়ার। আবার ঠান্ডায় কাপড় শক্ত হয়ে যাওয়া, রং ফ্ল্যাট দেখানো—এসব সমস্যাও সামলাতে হয়েছে দক্ষতার সঙ্গে। প্রতিদিনের লুক অবিকল রাখার জন্য ধারাবাহিকতার চ্যালেঞ্জ ছিল সবচেয়ে কঠিন।

বিজ্ঞাপন

কস্টিউম ডিজাইনের ডিটেইলিংয়ে তুহিনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর চরিত্র বিশ্লেষণ। একটি চরিত্র কীভাবে বাঁচে, কী পরে, কতটা আরাম বা চাপের মধ্যে থাকে—এই ভাবনাগুলো থেকেই তৈরি হয়েছে প্রতিটি পোশাক। কাপড়ে আনা হয়েছে ব্যবহারজনিত ক্লান্তি—ওয়াশ, ডাই, এমনকি হ্যান্ডডিস্ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে। ছোট ছোট বিষয়, যেমন বাটন, সেলাই, স্লিভের ভাঁজ—এসবের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে চরিত্রের ভেতরের গল্প। তাঁর মতে, নিখুঁত ডিটেইলিং চোখে পড়ার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য।

শুটিংয়ের ফাঁকে
শুটিংয়ের ফাঁকে

তুরিন বলেন, চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে থাকা আফরান নিশোর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল এককথায় ‘সহযোগিতামূলক’। নিজের লুক নিয়ে তাঁর খুঁতখুঁতে স্বভাবই এ কাজকে করেছে আরও নিখুঁত। কস্টিউম শুধু পরা নয়, সেটির ভেতরে ঢুকে অভিনয় করার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করে তোলে। অনেক সময় ডিজাইনের ছোটখাটো পরিবর্তন, হাতার ভাঁজ বা বাটনের ব্যবহার—এসব তাঁর নিজস্ব ইনপুটেই লুক পেয়েছে আরও বাস্তব রূপ। ফলে চরিত্র ‘শাহজাহান’-এর ভিজ্যুয়াল জার্নিও হয়েছে জীবন্ত।
অন্যদিকে পূজা চেরীকে এখানে দেখা গেছে একেবারেই নন-গ্ল্যামারাস লুকে। ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে তাঁর কমফোর্ট জোনের বাইরে এনে তৈরি করা হয়েছে এক সংগ্রামী, বাস্তব চরিত্র। বিবর্ণ পোশাক, এলোমেলো চুল, ন্যাচারাল ক্রিজ—সব মিলিয়ে তাঁর উপস্থিতি হয়ে উঠেছে নিখাদ ও বিশ্বাসযোগ্য। এই রূপান্তরকে পূজাও দারুণভাবে গ্রহণ করেছেন।

চঞ্চল চৌধুরীসহ অন্যান্য চরিত্রের ক্ষেত্রেও ছিল একই দর্শন—‘ইমপারফেকশন ইজ দ্য কি’। নিখুঁত নয়, বরং অসম্পূর্ণতাই এখানে সৌন্দর্য। হালকা ডার্ক সার্কেল, ক্লান্ত ত্বক, অসমান স্লিভ—এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো চরিত্রকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। কস্টিউম ও মেকআপ—দুটোকেই ভাবা হয়েছে একসঙ্গে, যেন কোনো কিছু আলাদা করে চোখে না পড়ে, বরং পুরোটা মিলেই তৈরি করে বাস্তব জগৎ।

এভাবেই তৈরি হয়েছে লুক
এভাবেই তৈরি হয়েছে লুক

পুরো প্রজেক্টের সবচেয়ে কঠিন দিক ছিল এক্সট্রিম কন্ডিশনে কনসিস্টেন্সি বজায় রাখা। প্রতিদিনের আবহাওয়া বদলের মধ্যেও একই লুক ধরে রাখা, আবার চরিত্রের ধীরে ধীরে পরিবর্তনকে সূক্ষ্মভাবে দেখানো—এই ভারসাম্য রক্ষা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই চ্যালেঞ্জই শেষ পর্যন্ত কাজকে দিয়েছে একটি বিশ্বাসযোগ্যতার ছোঁয়া।

তুরিনের কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল যখন প্রথমবার সব চরিত্রকে চূড়ান্ত লুকে একসঙ্গে দেখা। তখনই মনে হয়েছিল, ভাবনাটা হয়তো ঠিক দিকেই এগিয়েছে।
দর্শকদের কাছে তুরিনের প্রত্যাশা একটাই—এ গল্পকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা। শুধু বিনোদন নয়, বরং নতুন ধাঁচের গল্প, চরিত্র আর ভিজ্যুয়ালের ভাষাকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি হোক। তাঁর বিশ্বাস, দর্শকের ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত এই সিনেমাকে এগিয়ে নেবে।

নিজেই ক্যামেরার সামনে
নিজেই ক্যামেরার সামনে

ঈদ নিয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতিতেও রয়েছে সরলতা। পরিবার, বন্ধু, ছোট ছোট আনন্দ—এসব নিয়েই তুহিনের উদ্‌যাপন। আর ফ্যাশন পরামর্শে তিনি রাখেন সহজ বার্তা—অতিরিক্ত জাঁকজমক নয়, বরং হালকা, ফ্রেশ রং আর ন্যাচারাল মেকআপেই ফুটে ওঠে সত্যিকারের সৌন্দর্য।

সব মিলিয়ে ‘দম’ শুধু একটা সিনেমা নয়, এটা একধরনের ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা, যেখানে কস্টিউম কথা বলে নীরবে, গভীরভাবে। আর সেই গল্পের কারিগর ইদিলা ফরিদ তুহিন, যিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের ডিজাইন চোখে পড়ে না, অনুভবে থেকে যায়।

ছবি: ইদিলা ফরিদ তুরিন

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬, ১৭: ০০
বিজ্ঞাপন