বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের জার্সি: গোলের পথে গর্বের পোশাক
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল। খেলাধুলার জগতে আমাদের এই মেয়েরা সব সময়েই ছিলেন হ্যাপেনিং। তুন করে তাঁরা নিজেদের অতিক্রম করে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছেন। তাঁরা আমাদের গর্ব, অনুপ্রেরণা আর লক্ষ্য অর্জনের দারুণ দৃষ্টান্ত।

এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জনই নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে নিজেদের তৈরি করেছেন এই মেয়েরা। স্বভাবতই তাঁদের সাফল্য সবাইকে বলতে বাধ্য করছে, ‘তাঁরা পেরেছেন!’

তাঁদের শরীরে থাকে আরেকটি ‘গোল’—তাঁদের জার্সি
তাঁদের শরীরে থাকে আরেকটি ‘গোল’—তাঁদের জার্সি

কিন্তু মাঠে নামার আগেই তাঁদের শরীরে থাকে আরেকটি ‘গোল’—তাঁদের জার্সি। কারণ, এই জার্সিই তাঁদের জাতীয় পরিচয়, দেশাত্মবোধের প্রতীক। এই জার্সি তাঁদের উজ্জীবিত করে, উদ্বুদ্ধ করে। এই জার্সির মধ্য দিয়ে অনেক কিছুই প্রতিফলিত হয়। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সেটা উপলব্ধি করেছে। ফলে পেশাদার ডিজাইনারদের দিয়ে এখন জার্সির নকশা করানো হচ্ছে। পুরুষ ফুটবল দলের জার্সিও সেভাবে করা হয়েছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় এসেছে মেয়েদের জার্সি। আর নতুন এই জার্সি পরেই এবার তাঁরা বাজিমাত করেছে। পুরুষদের মতো মেয়েদের জার্সিও ডিজাইন করেছেন ফ্যাশন ডিজাইনার তাসমিত আফিয়াত আর্নি। এই তরুণ ডিজাইনার তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে গল্প বলেন। যেখানে অতীত অনুপ্রেরণা হয়ে মিশে থাকে বর্তমানে চলমানতায়। এর মধ্য দিয়েই তিনি হাত ধরে পৌঁছে যেতে চান সোনালি ভবিষ্যতে।

বিজ্ঞাপন

এবার মেয়েদের জন্য তিনি যে জার্সির নকশা করেছেন, অর্থাৎ যে জার্সি পরে ঋতুপর্ণা, রুপনা, আফইদারা খেলেছেন, সেটির থিম হল ‘গোল’।
এই গোল মানে কেবল প্রতিপক্ষের জালে বল ফেলা নয়, উপরন্তু এটি জীবনের গোলও। এটি অন্যদের মতো নারীর গোল, বাংলাদেশের গোল। বস্তুত, লক্ষ্যে পৌঁছানো। আর সেটি সম্ভব হবে সাফল্য অর্জনের মধ্য দিয়ে।

ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধ

ঐতিহ্যের সঙ্গে আছে আধুনিকতা
ঐতিহ্যের সঙ্গে আছে আধুনিকতা

আর্নির ডিজাইন করা এই জার্সি কোনো সাধারণ কাপড়ের টুকরা নয়। এর প্রতিটি কাট আর প্যাটার্নে নিহিত আছে বাংলাদেশের শক্তিশালী জাতীয়তা বোধ আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গল্প। সেগুলো আমরা নানা মাত্রায় দেখতে পারি, ব্যাখ্যাও করতে পারি ডিজাইনের উপলব্ধি আর দৃষ্টিকোণকেও।

বিজ্ঞাপন

‘সবে মিলি চলি পথ’: কবি অতুলপ্রসাদ সেন সেই কবে বিবিধের মাঝে মহান মিলন দেখেছেন। আমরা সেটাই দেখি আমাদের খেলাধুলায়ও। এই মেয়েদের দলটির কথাই ভাবুন। এখানেও তো সেটি স্পষ্ট। রংপুরের একটি মেয়ের সতীর্থ চট্টগ্রামের আরেকটি মেয়ে, কিংবা অন্য আরেক জেলার আরেকটি মেয়ে। তাঁরা খেলছেন একসঙ্গে। দেশের হয়ে, দেশের জন্য। এটাই তো বস্তুত বিবিধের মাঝে ঐক্যের সৌন্দর্য।

বিবিধের মাঝে ঐক্যের সৌন্দর্য
বিবিধের মাঝে ঐক্যের সৌন্দর্য

আবার দেখুন, জার্সির মাঝে থাকা তিরচিহ্ন বা শেভরনগুলো যেন চারদিক থেকে এসে মিলেছে কেন্দ্রে। অর্থাৎ, এরাও লক্ষ্যে স্থির। এর অর্থকে আমরা একটু অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি, ডিজাইনার এই নকশার মধ্য দিয়ে শুধু মাঠে ‘গোল’ করার কথা বলছেন না; বরং তিনি দেশের সব অঞ্চলের সব নারীর সব স্বপ্ন নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অভিন্ন লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলতে চেয়েছেন। সেই লক্ষ্যে অবশ্যই থাকছে জাতীয়তাবোধ। এ ছাড়া এর মধ্য দিয়ে একটি ভবিষ্যতের পর্থনির্দেশনাও আছে।

প্রেরণায় লোক–ঐতিহ্য: জামদানি আমাদের হেরিটেজ। আমাদের লোক ও বয়ন ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জামদানির মোটিফকে দারুণ মুনশিয়ানায় ব্যবহার করেছেন ডিজাইনার। একটু খেয়াল করে দেখলে স্পষ্ট হবে, ডিজাইনের ভেতরে আছে জ্যামিতিক প্যাটার্ন। জামদানির আদি মোটিফকে তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন জার্সির জমিনে।

জামদানি তাঁর ডিজাইনে থাকে
জামদানি তাঁর ডিজাইনে থাকে

আর পাতলা, সুতা সুতা লাইনগুলো যেন কারিগরের মমতা মেশানো। আমাদের বয়নশিল্পীদের দক্ষতা আর নিপুণতা প্রতীয়মান হয়েছে। ফিউচার ইজ হ্যান্ডমেড—টেকসই পৃথিবীর জন্য একেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিজাইনার সেই বার্তাও এখানে স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

অন্যদিকে একজন ফুটবল খেলোয়াড় যেমন নিজের শরীর আর মন দিয়ে প্রতিদিন নিজেকে গড়েন, তেমনি এই জার্সিও তৈরি ভালোবাসা, মমতা আর দায়িত্বে।

চারটি দিক: ডিজাইনের ভেতরে চারটি তির আকারে থাকা চিহ্ন—উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের নির্দেশক, অর্থাৎ দেশের প্রতিটি কোণ থেকে আসা শক্তিই প্রতীয়মান। আরও স্পষ্ট করে অন্তর্ভুক্তির বার্তাকে।

এ ছাড়া এর মধ্যে দিয়ে ডিজাইনার আরও বলতে চেয়েছেন আমাদের দেশের চারটি বিশেষ বিষয় বা খাতের কথা—শিক্ষা, কৃষি, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি, যা নারীর জীবনের শক্তি জোগায়। পক্ষান্তরে আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্তিও ঘটায়।

ফ্যাশন নয় চৈতন্যের প্রকাশ

ওরা দেশের প্রতিনিধি
ওরা দেশের প্রতিনিধি

এ জার্সি শুধু একটি ইউনিফর্ম নয়, এটি প্রত্যক নারী ফুটবলারকে ‘আমিও পারি’ বলার সাহসে বলীয়ান করে।

জার্সি পরে তাঁরা মাঠে নামেন কেবল খেলার জন্য নয়, বরং হন বার্তাবাহক। সেই বার্তায় থাকে, ‘আমরা আসছি। এই আমরা, যাঁদের লক্ষ্য স্থির, পা শক্তিময় আর দৃষ্টি গোলপোস্টে।’

ছেলেদের নয়, মেয়েদের এ জার্সি প্রথম ডিজাইন করা হয়

তাসমিত আফিয়াত আর্নি বর্তমানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ও মার্কেটিং কমিটির সদস্য। তিনি এখন দোহায় আছেন। এই জার্সি নিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি জানান, ‘প্রথমে আমি মেয়েদের জার্সি ডিজাইন করেছিলাম, যদিও ছেলেদেরটা আগে সবার নজরে এসেছে। কারণ, ছেলেদের জার্সি ঘটা করে উন্মোচন করা হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি।

ডিজাইনার তাসমিত আফিয়াত আর্নি
ডিজাইনার তাসমিত আফিয়াত আর্নি

‘আমি মেয়েদের জার্সি ডিজাইন করতে গিয়ে তাদের লক্ষ্যে স্থির থাকার, তাদের দৃঢ়সংকল্পের বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। লাল ও সবুজ দুটি রঙের জার্সি করেছি। বেসিক রং এই দুটো। তবে দুটো রংকে ব্যবহার করেছি। একটার মধ্যে অন্য রঙের ছোঁয়া আছে। এর ওপরেই সারফেস অর্নামেন্টেশন নিয়ে ভেবেছি।

‘জামদানির প্রতি আমার আলাদা দুর্বলতা আছে। আমি চেষ্টা করি, আমাদের এই হেরিটেজ টেক্সটাইল নিয়ে কাজ করতে। বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে। ছেলেদের জার্সিতেও সেটা ছিল। এই জার্সিতেও আছে। বাংলাদেশের এই হেরিটেজ বয়নের মোটিফকে ব্যবহার করেছি। এখানে একটা মোটিফকে ভেঙে চমৎকারভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট করেই বোঝানো হয়েছে সবার লক্ষ্য অভিন্ন, সবাই সংকল্পে অটুট।
‘সেটা তারা প্রতিনিয়ত প্রমাণও করছে সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে। আমার ডিজাইন করা জার্সি পরে দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়েছে মিয়ানমারে। বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে। এটা আমার কাছে দারুণ আনন্দের। বলতেই হবে, আমাদের মেয়েরা ক্রমেই কঠিন লক্ষ্য স্থির করে সেটা উতরে যাচ্ছে। আমার ডিজাইনের মূলমন্ত্রও কিন্তু সেটাই, অর্থাৎ গোল বা লক্ষ্য।

‘আমার ডিজাইন করা জার্সি পরে মেয়েরা সাফল্য অর্জন করছে। এর চেয়ে আনন্দের ও গর্বের কী হতে পারে আমার জন্য! একজন মেয়ে হিসেবে আমি মনে করি, আমার দায়িত্ব পরবর্তী প্রজন্মের চলার পথকে সহজ করে দেওয়া। আমি সেটা চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের ফুটবলাররাও সেটাই করছে।’

তাঁদের গল্প আমাদের গল্প

বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের এই জয়যাত্রা কেবল খেলার গল্প নয়, এটি একটি আন্দোলনের শুরু। যেখানে ডিজাইনার তাসমিত আফিয়াত আর্নির মতো তরুণ ডিজাইনার তাঁদের কাজের মাধ্যমে আমাদের বলে দেন, ‘তোমার শিকড় ভুলে যেয়ো না। শিকড় থেকেই উঠে এসে ডানা মেলো।’

মেয়েরা এগিয়ে যায় অভীষ্টে
মেয়েরা এগিয়ে যায় অভীষ্টে

তাই মাঠে লাল-সবুজে মোড়ানো একঝাঁক মেয়ে যখন প্রতিপক্ষের ব্যুহ ভেদ করে গোলের দিকে ছোটেন, তখন একটু খেয়াল করবেন—তাঁদের জার্সিটাও তাঁদের সঙ্গে এগিয়ে যায় অভীষ্টে।

একটা নীরব, অথচ স্পষ্ট গোল—বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর নারীর শক্তিকে একসঙ্গে বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে। তাই আর্নির এই ডিজাইন ভাবনা শুধু ফ্যাশন নয়, ভবিষ্যতের দিকচিহ্নও। তাই আমরা বলতেই পারি, এটি কোনো হাইপ নয়, হেরিটেজ উইথ স্টাইল।

ছবি: প্রথম আলো, বাফুফের সামাজিক মাধ্যম ও তাসমিত আফিয়াত আর্নি

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৫, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন