টাঙ্গাইল বয়নশিল্প: ঐতিহ্য, সংকট ও সম্ভাবনার অর্থনীতি
শেয়ার করুন
ফলো করুন

টাঙ্গাইল শাড়ির দুটি বড় স্বীকৃতি আছে আমাদের। একটি দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে এর আইনি পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তার চেয়েও বড় সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এসেছে ইউনেসকোর কাছ থেকে। ২০২৫ সালে ‘ট্র্যাডিশনাল শাড়ি উইভিং আর্ট অব টাঙ্গাইল’ ইউনেসকোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্টে’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই স্বীকৃতি শুধু একটি শাড়িকেই নয়, শাড়ি তৈরির সঙ্গে যুক্ত জ্ঞান, দক্ষতা ও সামাজিক অনুশীলনকেও স্বীকৃতি দিয়েছে।
কাগজে-কলমে এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এর সঙ্গেই একটি প্রশ্ন অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়—এসব স্বীকৃতি একজন বয়নশিল্পী কিংবা বয়নসংশ্লিষ্ট কারিগরের জীবন কতটা বদলে দিতে পেরেছে? কিংবা পরম্পরার এই শিল্প পেশা হিসেবে তরুণ প্রজন্মের কাছে কতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে?

আছে স্বীকৃতি, নেই উন্নতি
আছে স্বীকৃতি, নেই উন্নতি

এই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর এখনো সহজে দেওয়া যায় না। তাই জিআই ও ইউনেস্কোর স্বীকৃতির অর্থ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হয়। কারণ, কোনো একটি হেরিটেজ টেক্সটাইল শেষ পর্যন্ত কোনো সনদ, লোগো বা নিবন্ধনের সংখ্যায় বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে মানুষের হাতে, তাদের দক্ষতায়। সেই সক্ষম হাত যদি তাঁত ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যায়, তাহলে একসময় আমাদের কাছে থাকবে কেবল টাঙ্গাইল শাড়ির নাম; থাকবে না টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরির প্রয়োজনীয় শিল্পী।

তাই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা আসলে কী বাঁচাতে চাই? আমরা বাঁচাতে চাই টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্প। আর সেটা হলে আমাদের উচিত হবে টাঙ্গাইল নিয়ে ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ শুরু করা করা।

বিজ্ঞাপন

টাঙ্গাইল শাড়ি ও টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প এক নয়

টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প এবং টাঙ্গাইল শাড়িকে এক করে দেখলে সমস্যাটি বোঝা কঠিন হবে। টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প একটি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিসর। এই শিল্পের সঙ্গে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বয়নশিল্পী ও নানা ধরনের শ্রম যুক্ত। অন্যদিকে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ নামে যে স্বতন্ত্র পণ্য-পরিচয় ও ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে, তার ঐতিহাসিক নির্মাণে বসাক তাঁতিদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে এই উৎপাদনধারায় মুসলিম তাঁতিরাও বড় অংশীদার হয়ে ওঠেন। ইউনেসকোর বর্ণনায়ও বসাক ও জোলা—উভয় সম্প্রদায়ের কথা এসেছে এবং পরিবারভিত্তিকভাবে জ্ঞান ও দক্ষতা প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পরিচয়ের সংকট তৈরি করা যাবে না
পরিচয়ের সংকট তৈরি করা যাবে না

টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প কোনো এক সম্প্রদায়ের একক সম্পত্তি নয়। কিন্তু টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহাসিক ব্র্যান্ড পরিচয়ের সঙ্গে বসাকদের সম্পর্ক অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সংরক্ষণনীতি তাই একই সঙ্গে হেরিটেজ-স্পেসিফিক এবং সোশ্যালি ইনক্লুসিভ হতে হবে। অর্থাৎ টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ও কারিগরি পরিচয় সংরক্ষণ করতে হবে; পাশাপাশি আজ যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বয়নশিল্পী ও কারুশিল্পী এই শিল্পকে জীবিত রাখছেন, তাঁদের সবাইকে হেরিটেজ ইকোনমির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো সম্প্রদায়ের মালিকানা প্রতিষ্ঠা নয়; দক্ষতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।

বিজ্ঞাপন

স্বীকৃতি আছে, কিন্তু পেশার ভবিষ্যৎ কোথায়?

বাংলাদেশের জিআই আবেদনে টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপাদন এলাকার বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসর দেখানো হয়েছে। দেলদুয়ারের পাথরাইল-চণ্ডীসহ বিভিন্ন এলাকা, কালিহাতীর বহু গ্রাম এবং টাঙ্গাইল সদরের বিভিন্ন অঞ্চল এর উৎপাদনভূমির অংশ। অর্থাৎ ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ কোনো একটি কারখানা বা একটি গ্রামের পণ্য নয়; এটি একটি বিস্তৃত প্রোডাকশন ইকোসিস্টেম।

শাড়ি তৈরি একটা একটা ইকোসিস্টেম
শাড়ি তৈরি একটা একটা ইকোসিস্টেম

এই ইকোসিস্টেমের সমস্যা হলো, আমরা পণ্যের হিসাব করতে শিখেছি, কিন্তু মানুষের হিসাব এখনো যথেষ্টভাবে করি না। কতটি তাঁত আছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কতজন সক্রিয় তাঁতি আছেন? কতজন মাস্টার উইভার? কতজন ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী? কতজন নতুন করে এই পেশায় ঢুকছেন? কতজন বেরিয়ে যাচ্ছেন? কতজন নারী ও পুরুষ বয়নপূর্ব ও বয়নোত্তর কাজে যুক্ত? কতজন শিক্ষানবিশ আগামী পাঁচ বছরে একজন দক্ষ বয়নশিল্পী বা বয়নকারিগর হতে পারবেন?
এসব তথ্য ছাড়া হেরিটেজ পলিসি অনেকটাই অন্ধকারে তৈরি হবে। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের জিআই আবেদনে তাঁতিদের প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং বয়নপূর্ব ও বয়নোত্তর সহায়তার মতো কাজের কথাও উল্লেখ আছে। কিন্তু জিআই পাওয়ার পর পরবর্তী প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই দায়িত্বগুলোকে কীভাবে একটি পরিমাপযোগ্য সেফগার্ডিং প্রোগ্রামে পরিণত করা হবে?

হ্যান্ডলুমের সংকটের জন্য কেবল পাওয়ারলুম দায়ী নয়

টাঙ্গাইলের হ্যান্ডলুমের সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই পাওয়ারলুমের দিকে আঙুল তুলি। এতে সমস্যার একটি অংশ ধরা পড়ে, পুরোটা নয়। কারণ, প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়। জ্যাকার্ড, চিত্তরঞ্জন কিংবা পরবর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তন টাঙ্গাইলের বয়নে নতুন নকশা ও উৎপাদনের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য ও ভোক্তার চাহিদাও বদলেছে।

হ্যান্ডলুমের সংকটের দায় এককভাবে পাওয়ারলুমের নয়
হ্যান্ডলুমের সংকটের দায় এককভাবে পাওয়ারলুমের নয়

তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—পাওয়ারলুম থাকবে কি থাকবে না? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন পণ্য হ্যান্ডলুমে থাকবে এবং কেন থাকবে? কারণ, ম্যাস-মার্কেট প্রডাক্ট এবং হেরিটেজ প্রোডাক্টের অর্থনীতি এক নয়। একটি পাওয়ারলুম যদি কম সময়ে বেশি কাপড় তৈরি করে, তাহলে সাধারণ বাজারে তার সঙ্গে হ্যান্ডলুমের সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি করা হ্যান্ডলুমের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

রাষ্ট্রের কাজ তখন পাওয়ারলুম বন্ধ করা নয়; হেরিটেজ হ্যান্ডলুমের জন্য আলাদা ইকোনমিক স্পেস তৈরি করা।

কমে যাচ্ছে দক্ষ মাস্টার উইভার

টাঙ্গাইলের বয়নশিল্পের সামনে আরেকটি বড় সংকট দক্ষ মাস্টার উইভারের ক্রমহ্রাসমান সংখ্যা। যাঁরা বছরের পর বছর অভিজ্ঞতা ও হাতে-কলমে অর্জিত দক্ষতার মাধ্যমে একটি তাঁতকে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করেছেন, তাঁদের বড় একটি অংশের বয়স এখন ৫০ বছর বা তার বেশি। অন্যদিকে, তাঁদের জায়গা নেওয়ার মতো তরুণ প্রজন্মও পর্যাপ্ত সংখ্যায় এই পেশায় আসছে না। ফলে তৈরি হচ্ছে একটি গুরুতর প্রজন্মগত শূন্যতা।

একজন দক্ষ মাস্টার উইভার শুধু তাঁত চালান না; তাঁর অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সুতা বোঝা, টান নিয়ন্ত্রণ, নকশা পড়া, তাঁতের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং কাপড়ের গুণমান ধরে রাখার মতো বহু সূক্ষ্ম দক্ষতা। তাই একজন মাস্টার উইভার হারানো মানে শুধু একজন শ্রমিক হারানো নয়, একটি জ্ঞানভান্ডার হারানো।এসব জ্ঞান মূলত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে দীর্ঘদিনের কাজের মধ্য দিয়ে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। একে গুরুমুখী বিদ্যা বলা যেতে পারে।

তাঁত থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায়

রিকশা চালালে আয় বেশি
রিকশা চালালে আয় বেশি

এই সমস্যা সব বয়ন অঞ্চলে আছে। তবে টাঙ্গাইলের সমস্যাটিকে একটু অন্যভাবে দেখা দরকার। একজন তরুণের কাছে পেশা বেছে নেওয়ার সময় ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেটি একমাত্র সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে না। তার দরকার আয়, স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ। তাঁতে বসে সারা দিনে বড়জোর ৫০০ টাকা আয় করা যায়। সেখানে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে দিনে নিদেনপক্ষে তার দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব। একজন তরুণ তখন রিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকবে—এটাই স্বাভাবিক। তাঁকে এজন্য দোষ দেওয়া যায় না। ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো ‘খারাপ পেশা’র প্রতীক নয়; এটি শ্রমবাজারের একটি বিকল্প। আর সেটিই সমস্যার গভীরতা বোঝায়।

ভবিষ্যৎ টেকসই ফ্যাশনের: হাতে তৈরি পণ্যের বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত

এখানে টাঙ্গাইলের জন্য একটি বড় আন্তর্জাতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। সারা বিশ্বে ফ্যাশন ও টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি এখন সাসটেইনেবিলিটি এবং সার্কুলারিটির দিকে এগোচ্ছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি ইউএনইপি টেক্সটাইল ভ্যালু চেইনকে আরও সাসটেইনেবল ও সার্কুলার করার জন্য কনজামশান প্যাটার্ন বদলানো, উৎপাদন পদ্ধতি উন্নত করা এবং অবকাঠামোয় বিনিয়োগ—এই তিনটি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের Sustainable and Circular Textiles Strategy-ও দীর্ঘস্থায়ী, রিপেয়ারেবল, রিসাইকেল এবং মানসম্পন্ন টেক্সটাইলমুখী বাজার বিস্তারের কথা বলছে।

অর্থাৎ ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ কেবল বেশি উৎপাদন ও দ্রুত বিক্রিতে নয়; পণ্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব, মেরামত, পুনঃব্যবহার ও কম অপচয়ের মধ্যেও।

এই পরিবর্তনের ভেতর হ্যান্ডলুম ও হ্যান্ডমেডের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ হাতে তৈরি একটি পণ্যের সঙ্গে কারিগরের দক্ষতা, সময়, স্থানীয় জ্ঞান ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সরাসরি সম্পর্ক থাকে।

তাই ‘Future is Handmade’ কথাটি শুধু একটি সুন্দর স্লোগান হিসেবে নয়, টাঙ্গাইলের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। হ্যান্ডমেডের ভবিষ্যৎ তখনই তৈরি হবে, যখন এর বাজারমূল্য, কারিগরের আয় ও সামাজিক মর্যাদা—তিনটিই বাড়বে।

তবে হ্যান্ডলুমকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাসটেইনেবল ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না। টেকসইতার প্রশ্নে সুতা, রং, পানি, জ্বালানি, উৎপাদন, ব্যবহার, মেরামত, পুনঃব্যবহার এবং বর্জ্য—পুরো ভ্যালু চেইন দেখতে হবে। কিন্তু এই নতুন বৈশ্বিক চাহিদা টাঙ্গাইলের মতো ঐতিহ্যবাহী হ্যান্ডলুমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কারিগরকে বাঁচানো নয়, কারিগর হওয়াকে আকর্ষণীয় করতে

আমাদের বয়নশিল্পীদের যথাযথ সম্মান দিতে হবে
আমাদের বয়নশিল্পীদের যথাযথ সম্মান দিতে হবে

এখানেই আমাদের হেরিটেজ বা পরম্পরার পেশার নীতিমালার দর্শন বদলানো দরকার। আমরা সাধারণত কারুশিল্পীকে দেখি দরিদ্র, সহায়তাপ্রার্থী, প্রান্তিক ও ব্রাত্য হিসেবে। অথচ তাঁদেরই বলা হয় ঐতিহ্য ধরে রাখতে। এভাবে হেরিটেজ ইকোনমি তৈরি হয় না।
একজন মাস্টার উইভারকে একজন মাস্টার ক্র্যাফটসম্যানের সম্মান ও মূল্য দিতে হবে। একই সঙ্গে তাঁর দক্ষতার বাজারমূল্য থাকতে হবে, তাঁর কাজের পরিচয় থাকতে হবে, তাঁর নিজের নাম থাকতে হবে। একজন ক্রেতা যেন বলতে পারেন, ‘এই শাড়িটি অমুক মাস্টার উইভারের বোনা।’

যেভাবে একজন ফ্যাশন ডিজাইনারের নাম প্রোডাক্টের মূল্য বাড়ায়, একজন কারুশিল্পীর নামও সেভাবে ভ্যালু তৈরি করবে—এমন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। একজন তরুণ তখন বাবার পেশা ‘চালিয়ে যাচ্ছে’ না; সে একটি ক্রিয়েটিভ প্রফেশন বেছে নিচ্ছে।

বয়নশিল্প বাঁচাতে যে পাঁচটি বিষয় জরুরি 

আয়: কারুশিল্পীকে তাঁর দক্ষতার উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে।
পরিচয়: তাঁর কাজের সঙ্গে তাঁর পরিচয় যুক্ত করতে হবে।
উদ্ভাবন: নতুন প্রযুক্তি, নতুন পণ্য ও নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে।
দৃশ্যমানতা: ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি, মিডিয়া, জাদুঘর, ডিজাইনার, গবেষণা, লাকজারি রিটেইল—সব জায়গায় কারুশিল্পীদের দৃশ্যমানতা বাড়াতে হবে।
জাতীয় স্বীকৃতি: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বীকৃতি দিতে হবে, যাতে মাস্টার ক্র্যাফটসম্যান হওয়া একটি সামাজিক মর্যাদার পরিচয় হয়ে ওঠে।

এই পাঁচটি স্তম্ভের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে কারুশিল্পী-ডিজাইনার-ব্র্যান্ডের একটি কার্যকর চক্র। আমাদের দেশে এই কলাবোরেশন এখনো যথেষ্ট নয়। অথচ বয়নশিল্পী, ডিজাইনার ও গবেষক মিলে কাজ করলে নতুন পণ্য, নতুন গল্প ও নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। বেনারসিতে এমন একটি পরীক্ষায় আমি নিজে একজন ডিজাইনারের সঙ্গে কাজ করে সফল হয়েছি; টাঙ্গাইলেও সেই অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করা যেতে পারে।

টাঙ্গাইলের জন্য একটি নতুন অর্থনীতি দরকার

টাঙ্গাইল শাড়িকে শুধু ‘তাঁতজাত পণ্য’ হিসেবে বাজারজাত করলে হবে না। এটিকে একটি হেরিটেজ টেক্সটাইল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং শাড়ির পাশাপাশি ডাইভারসিফায়েড প্রোডাক্ট রেঞ্জ তৈরি করতে হবে। কারণ, একটি ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পকে টেকসই করতে হলে তার বাজার শুধু শাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। পোশাক, ওড়না, স্কার্ফ, স্টোল, কুশন ও টেবিল-টেক্সটাইল, ব্যাগ, হোম ডেকর, ছোট লাইফস্টাইল প্রোডাক্ট এবং ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ—টাঙ্গাইলের বয়ন, নকশা ও কাপড়ের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নতুন পণ্য তৈরি করা যেতে পারে।

সাধারণ ক্রেতার জন্য দৈনন্দিন টাঙ্গাইল; নির্দিষ্ট ঐতিহ্যবাহী বয়ন ও মানের হেরিটেজ টাঙ্গাইল; উন্নত সুতা, বিশেষ বয়ন ও অলংকরণ এবং সীমাবদ্ধ উৎপাদনের জন্য প্রিমিয়াম টাঙ্গাইল; আর মাস্টার উইভারের সিগনেচার পিস হিসেবে কালেকটর’স টাঙ্গাইল।

এই ডাইভারসিফিকেশনে উদ্দেশ্য শাড়ির গুরুত্ব কমানো নয়; বরং শাড়িকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর টাঙ্গাইল টেক্সটাইল ইকোসিস্টেম তৈরি করা। এতে একই তাঁতি ও তাঁতপ্রযুক্তির জন্য একাধিক বাজার তৈরি হবে, সিজনাল ডিমান্ডের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং নতুন প্রজন্মের ডিজাইনার ও উদ্যোক্তারা হেরিটেজ টেকনিক নিয়ে কাজ করার আরও সুযোগ পাবেন।

তখন একটি শাড়ির দাম শুধু কাপড়ের পরিমাণ বা উৎপাদন খরচ দিয়ে নির্ধারিত হবে না। তার সঙ্গে যুক্ত হবে দক্ষতা, সময়, উৎস, বয়ননৈপুণ্য ও প্রাপ্যতা, যা লাক্সারি ইকোনমির ভিত্তি তৈরি করে।

একটি শাড়িরও ‘পাসপোর্ট’ থাকা উচিত

নারীদের আরও বেশি করে ক্ষমতায়িত করতে হবে
নারীদের আরও বেশি করে ক্ষমতায়িত করতে হবে

জিআইয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখানেই। একটি অথেনটিক টাঙ্গাইল শাড়ির সঙ্গে এমন একটি ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে কিউআর কোড স্ক্যান করলে ক্রেতা জানতে পারবেন—কোন গ্রামের, কোন বয়নশিল্পীর, কোন তাঁতে তৈরি, কোন সুতা, কত কাউন্ট, কোন টেকনিক এবং কবে তৈরি।

গ্রাম-বয়নশিল্পী-তাঁত-সুতা-টেকনিক-প্রোডাক্ট—এই চেইনকে দৃশ্যমান করা গেলে জিআই কেবল আইনি প্রোটেকশন হিসেবে থাকবে না; বাজারমূল্যও তৈরি করবে। আর সেই মূল্য তৈরি হলেই বাড়বে বয়নশিল্পী তথা বৃহত্তর অর্থে কারুশিল্পীর গ্রহণযোগ্যতা।
নারীকে সহকারী নয়, উদ্যোক্তা করতে হবে

টাঙ্গাইলের বয়নশিল্পে নারীদের ভূমিকা নতুন করে দেখতে হবে। ইউনেসকোর বর্ণনায়ও পুরুষের পাশাপাশি বয়নপূর্ব ও বয়নোত্তর পর্যায়ে নারী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ভূমিকার কথা এসেছে। কিন্তু নারীকে যদি শুধু ‘বয়নশিল্পীর স্ত্রী’ বা ‘পরিবারের সহায়ক শ্রমিক’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এই সম্ভাবনাটিই নষ্ট হবে।

নারী হতে পারেন—আর্টিজান, ডিজাইনার, ফিনিশার, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার, উদ্যোক্তা, সমবায় নেতা, অনলাইনে বিক্রেতা কিংবা ব্র্যান্ড ওনারও।

বিশেষ করে ডিজিটাল কমার্সের যুগে গ্রাম থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই প্রয়োজন হতে পারে, একটি উইমেন উইভার অ্যান্ড হেরিটেজ এন্টারপ্রাইজ প্রোগ্রাম—যেখানে শুধু বোনার ট্রেনিং নয়, ডিজাইন, কস্টিং, ব্র্যান্ডিং, ফটোগ্রাফি, ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স ও এক্সপোর্ট রেডিনেসের মতো বিষয় থাকবে।

জিআইয়ের নামে ইতিহাস ও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন

ভারতের ‘Tangail Saree of Bengal’ জিআই নিবন্ধন নিয়ে প্রশ্নটি শুধু নামের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পণ্যের প্রকৃত ভৌগোলিক পরিচয়, ইতিহাস এবং বয়নপ্রযুক্তির প্রশ্ন। ভারতের আবেদনটি ২০২০ সালে প্রথমে ‘Tangail Saree of West Bengal’ নামে করা হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় পণ্যের নাম নিয়েই একাধিক অসংগতি ধরা পড়ে—নথিতে ‘Tangail Saree of West Bengal’, ‘Fulia Tangail Saree’, ‘Tangail Jamdani’ এবং ‘Tangail Saree (Indian variety)’—এমন একাধিক নাম ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে পরামর্শক গোষ্ঠীর সুপারিশে নাম পরিবর্তন করে ‘Tangail Saree of Bengal’ করা হয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভারতের নিজস্ব আবেদনের নথিতেই টাঙ্গাইল, বাংলাদেশ এবং পূর্ববঙ্গকে এই শাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এমনকি ভারতের GI Journal-সংক্রান্ত গবেষণায় উল্লেখ আছে, আবেদনপত্রের কিছু নথিতে বাংলাদেশের টাঙ্গাইলকে উৎপত্তিস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে পরে ‘Tangail Saree of Bengal’ নামে জিআই দেওয়া হলে প্রশ্ন ওঠে—একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক নামকে কীভাবে এত বিস্তৃত ঐতিহাসিক-ভৌগোলিক পরিচয়ের মধ্যে পুনর্নির্ধারণ করা হলো?

প্রযুক্তিগত পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন আছে। ভারতের GI Journal-এ পণ্যটিকে ‘Tangail Saree of Bengal (Jamdani variety)’ বলা হয়েছে এবং extra-weft অলংকরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু জামদানি কোনো মোটিফের নাম নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র বয়নপ্রযুক্তি। ফলে টাঙ্গাইলের নিজস্ব নকশা বা মোটিফ এবং জামদানির বয়নপ্রযুক্তিকে কীভাবে একই পরিচয়ের মধ্যে আনা হচ্ছে, সে বিষয়ে কারিগরি প্রশ্ন থেকেই যায়। ভারতের নথিতে এই পরিভাষার ব্যবহারকে তাই গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এখানেই বিষয়টি আইনি লড়াইয়েও গড়িয়েছে। বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ভারতের এই জিআই নিবন্ধনকে চ্যালেঞ্জ করে মাদ্রাজ হাইকোর্টে OP(GI) No. 1 of 2025 মামলা করেছেন। ৮ এপ্রিল ২০২৬-এর সর্বশেষ পাওয়া আদেশে প্রথম বিবাদীপক্ষ আবেদনকারী ‘person aggrieved’ নন—এই যুক্তিতে মামলা খারিজের আবেদন করেছে বলে আদালত নথিভুক্ত করেছে এবং সেই আবেদনটি মূল rectification petition-এর সঙ্গে শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।

আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের বয়ানও তৈরি করতে হবে

ভারতের জিআই নিয়ে আইনি লড়াই এবং তাদের নথিতে থাকা অসংগতিগুলো নিয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কিন্তু শুধু অন্যের নথির ভুল ধরিয়ে দিলেই হবে না; টাঙ্গাইল সম্পর্কে আমাদের নিজেদের তথ্য ও বয়ানকেও আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে নির্ভরযোগ্য ও authoritative documentation তৈরি করা জরুরি।

আন্তর্জাতিক ক্রেতা, গবেষক, ডিজাইনার, মিউজিয়াম ও গণমাধ্যম টাঙ্গাইল সম্পর্কে তথ্য খুঁজলে যেন বাংলাদেশের তৈরি তথ্যই সহজে পাওয়া যায়—সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাস, বয়নপ্রযুক্তি, কারিগরি পরিভাষা ও টাঙ্গাইলের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আমাদের নিজেদের ভাষ্য আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত না হলে অন্যের তৈরি বয়ানই সেখানে প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। এজন্য জিআই রক্ষা তাই শুধু আদালতে নয়; তথ্যের ক্ষেত্রেও আবশ্যক।

হেরিটেজ হ্যান্ডলুম জোন

টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর জন্য আলাদা জোনিং পলিসি নিয়েও ভাবা দরকার। এটি পাওয়ারলুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়; বরং এমন একটি হেরিটেজ হ্যান্ডলুম জোন, যেখানে হ্যান্ডলুম ক্লাস্টারকে বিশেষ সুরক্ষা ও প্রণোদনা দেওয়া হবে।
এই অঞ্চলে থাকতে পারে:
১. কাঁচামালের সাপোর্ট, ২. সুতা রং করার ব্যবস্থা, ইয়ার্ন ও ডাই ব্যাংক, লুম রিপোয়ার সেন্টার, ডিজাইন স্টুডিও, টেস্টিং ল্যাব ও ট্রেনিং সেন্টার, শিক্ষানবিশ তৈরির কর্মসূচি, ডিজিটাল মার্কেট সাপোর্ট। আর অবশ্যই ছোট পরিসরের হলেও একটি টাঙ্গাইল হেরিটেজ টেক্সটাইল মিউজিয়াম থাকা দরকার। প্রয়োজনে ঐতিহ্যবাহী ক্লাস্টারের চারপাশে নির্দিষ্ট বাফার জোনে পাওয়ারলুম স্থাপন নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। ব্লাঙ্কেট ব্যান নয়, হেরিটেজ-সেনসেটিভ জোনিংই হবে বাস্তবানুগ পথ।

পরম্পরা টিকিয়ে রাখাটাই জরুরি

ইউনেসকো যে বিষয়টিকে হেরিটেজের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তার কেন্দ্রে আছে জ্ঞান ও দক্ষতা প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়া। এ জন্য অ্যাপ্রেন্টিস বা শিক্ষানবিশ তৈরি না হলে কোনো সেফগার্ডিং প্রোগ্রাম সফল হবে না।

রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দিতে পারে একজন মাস্টার উইভার কত বছরে কতজন শিক্ষানবিশ তৈরি করবেন। প্রশিক্ষণের সময় মাস্টার উইভার যেমন সম্মানী পাবেন, তেমনি শিক্ষানবিশও ভাতা পাবেন। নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনের পর শিক্ষানবিশ পাবেন সার্টিফিকেট। এতে ‘বয়নশিল্পী বা বয়ন কারিগর হওয়া’ আবার একটি স্ট্রাকচারড ক্যারিয়ার পাথ হয়ে উঠতে পারে।

ইউনেসকোর পর এখন কী?

ইউনেসকোর ইন্সক্রিপশন কোনো শেষ নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি; এর সঙ্গে সেফগার্ডিংয়ের দায়িত্বের প্রশ্নও আসে। তাই বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি টাঙ্গাইল সেফগার্ডিং অ্যাকশন প্ল্যান। এতে শুধু হেরিটেজ সেলিব্রেশন থাকবে না; থাকবে মেজারেবল টার্গেট।

এটি পাঁচ বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা হতে পারে। আগামী পাঁচ বছরে কতজন নতুন বয়নশিল্পী ও বয়নসহায়ক কারুশিল্পী তৈরি হবে? কয়টি হ্যান্ডলুম সক্রিয় থাকবে? কতজন মাস্টার উইভার স্বীকৃতি পাবেন? কতজন নারী উদ্যোক্তা তৈরি হবে? কয়টি ঐতিহ্যবাহী টেকনিক ডকুমেন্টেড হবে? কতটি নতুন আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হবে? একজন সার্টিফায়েড হেরিটেজ উইভারের বাৎসরিক গড় আয় কতটা বাড়বে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ইউনেসকোর স্বীকৃতি উদ্‌যাপন করা সহজ; কিন্তু তার অর্থনৈতিক সুফল তৈরি করা কঠিন।

টাঙ্গাইল বয়নশিল্প বাঁচাতে তিনটি অগ্রাধিকার

ক. মানুষ ও দক্ষতা: কারিগরকে পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা

১. জাতীয় টাঙ্গাইল আর্টিজান রেজিস্ট্রি: শুধু বয়নশিল্পী নয়, মাস্টার উইভার, শিক্ষানবিশ, ডায়ার, ডিজাইনার, ফিনিশার ও তাঁতসংশ্লিষ্ট সব কারুশিল্পীকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ডেটাবেজ তৈরি করা।

২. মাস্টার উইভার কর্মসূচি: দক্ষ বয়নশিল্পী ও বয়নসহায়ক কারুশিল্পীদের জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া।

৩. মাস্টার উইভার শিক্ষানবিশ কর্মসূচি: নতুন প্রজন্মকে পেশায় আনতে মাস্টার উইভারের অধীনে শিক্ষানবিশ তৈরির জন্য ভাতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

৪. উইমেন হেরিটেজ এন্টারপ্রাইস মিশন: নারীকে দক্ষ কর্মী থেকে উদ্যোক্তা ও ব্র্যান্ড ওনারে উন্নীত করা।

৫. কারুশিল্পীর আয় ও সামাজিক নিরাপত্তা: স্বল্পসুদের ঋণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে কারুশিল্পীকে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক হিসেবে না দেখে পেশাজীবী ক্র্যাফটসম্যান হিসেবে বিবেচনা করা।

খ. পণ্য ও বাজার: টাঙ্গাইলকে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা

১. প্রিমিয়াম ও ডাইভারসিফায়েড টাঙ্গাইল মার্কেট স্ট্র্যাটেজি: সাধারণ পণ্যের পাশাপাশি হেরিটেজ ও লাকজারি সেগমেন্ট আলাদা করার পাশাপাশি শাড়ির বাইরে পোশাক, অ্যাকসেসরিজ, হোম টেক্সটাইল ও লাইফস্টাইল প্রডাক্টের নতুন বাজার তৈরি করা।

২. অথেনটিক টাঙ্গাইল সার্টিফিকেশন: জিআই-এর সঙ্গে যুক্ত ট্রেসেবিলিটি ও কিউআর-ভিত্তিক অথেনটিকেশন সিস্টেম চালু করা।

৩. সাসটেইনেবল হ্যান্ডলুম ইনিশিয়েটিভ: পানি, রং, সুতা, জ্বালানি, বর্জ্য, রিপেয়ার ও রিইউজসহ পুরো ভ্যালু চেইন বিবেচনায় নিয়ে টাঙ্গাইল হ্যান্ডলুমের জন্য টেকসই মান তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ ঘটানো।

গ. জ্ঞান, সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠান: ঐতিহ্যকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা

১. হেরিটেজ হ্যান্ডলুম জোন: ঐতিহ্যবাহী ক্লাস্টারগুলোকে আলাদা পলিসি প্রটেকশন ও প্রণোদনা দেওয়া।

২. টাঙ্গাইল ডিজাইন ও নলেজ আর্কাইভ: ঐতিহ্যবাহী টেকনিক, কনস্ট্রাকশন, ডিজাইন ভোকাবুলারি, মোটিফ ও প্রোডাকশন নলেজ ডকুমেন্টেড করা।

৩. ইউনেস্কো টাঙ্গাইল সেফগার্ডিং অ্যাকশন প্ল্যান: ইউনেস্কোর ইন্সক্রিপশনকে কেন্দ্র করে পাঁচ ও দশ বছরের পরিমাপযোগ্য জাতীয় কর্মসূচি তৈরি করা।

অতঃপর

টাঙ্গাইল শাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসলে বাইরের প্রতিযোগিতা নয়; দেশের ভেতরের শ্রমবাজার। বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিচয় ও ঐতিহ্যগত দাবির সুরক্ষার জন্য আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ চলতেই হবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ দেশের ভেতরে। প্রশ্নটি হলো টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প কি আগামী প্রজন্মের কাছে একটি সম্মানজনক, লাভজনক ও ভবিষ্যৎমুখী পেশা হয়ে উঠতে পারবে?

বিশ্ব যখন ফাস্ট ফ্যাশনের অপচয় থেকে সরে ডিউরেবল, রিপেয়ারেবল, রিইউজেবল এবং সার্কুলার টেক্সটাইলের দিকে তাকাচ্ছে ও ঝুঁকছে, তখন টাঙ্গাইলের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। ‘ফিউচার ইজ হ্যান্ডমেড’ তাই শুধু আবেগের কথা নয়; এটি হতে পারে নতুন বাজারের ভাষা, যদি আমরা হ্যান্ডমেডের সঙ্গে ন্যায়সংগত আয়, ট্রেসেবিলিটি, মান, উদ্ভাবন আর সাসটেইনেবিলিটিকে এক সূত্রে গাঁথতে পারি। ইউএনইপি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান টেক্সটাইল পলিসিতেও দীর্ঘস্থায়িত্ব, রিইউজ, রিপেয়ার, সার্কুলারিটি এবং রেসপন্সিবল প্রডাকশনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

হেরিটেজ প্রোডাক্টের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর শিল্পীরা
হেরিটেজ প্রোডাক্টের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর শিল্পীরা

একটি হেরিটেজ প্রোডাক্টের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ডিজাইন নয়, তার ব্র্যান্ড নয়, এমনকি তার জিআইও নয়; বরং তার সবচেয়ে বড় সম্পদ সেই মানুষ—যিনি জানেন কীভাবে সেটি তৈরি করতে হয়।

একজন তরুণ যদি তাঁত ছেড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ধরেন, তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ, সে তার জীবনের জন্য একটি বাস্তব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু তখন রাষ্ট্রকে নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হবে—কেন তাঁতে বসে থাকার চেয়ে এই রিকশা চালানোই তার কাছে বেশি নিরাপদ ভবিষ্যৎ হয়ে উঠল?

এ প্রশ্নের উত্তর না বদলালে কোনো হেরিটেজ পলিসিই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারুশিল্প বাঁচাতে হলে শুধু কারিগরকে টিকিয়ে রাখলে হবে না। কারিগর হওয়াকে আকর্ষণীয় করতে হবে।

তাঁতে বসে যেন একজন তরুণ বলতে পারেন—এটি আমার বাবার পেশা নয়। এটি আমার পেশা। এটি আমার দক্ষতা। এটি আমার পরিচয়। এবং এটাই আমার ভবিষ্যৎ।
তখনই জিআই অর্থবহ হবে, ইউনেসকোর স্বীকৃতি অর্থবহ হবে, আর টাঙ্গাইল শাড়ির ভবিষ্যৎও সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হবে। কারণ, হেরিটেজ কোনো সার্টিফিকেটে বেঁচে থাকে না; বেঁচে থাকে মানুষের হাতে।

তথ্যসূত্র: ইউএনইপি, সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড সার্কুলারিটি ইন দ্য টেক্সটাইল ভ্যালু চেইন: আ গ্লোবাল রোডম্যাপ (২০২৩); ইউএনইপি টেক্সটাইল ইনিশিয়েটিভ, সাসটেইনেবল অ্যান্ড সার্কুলার টেক্সটাইলস (আপডেটেড ২০২৬); ইউরোপিয়ান কমিশন, সাসটেইনেবল অ্যান্ড সার্কুলার টেক্সটাইলস স্ট্র্যাটেজি (২০২২, কারেন্ট ইমপ্লিমেন্টেশন আপডেটস)।

লেখক: কনসালট্যান্ট, হাল ফ্যাশন ও হেরিটেজ টেক্সটাইল গবেষক

ছবি: পটের বিবি ও লেখকের আর্কাইভ

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন