সামনেই ঈদ। আর এই ঈদের উৎসবমুখর পরিবেশ এ বছর ঝলমলে হয়ে উঠল হাল ফ্যাশন ঈদ ফিয়েস্তা ২০২৬-এর হাত ধরে। ১ থেকে ৩ মার্চ ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই ফ্যাশন উৎসব। উৎসবই বলব আমি এই আয়োজনকে। কারণ, জমজমাট এই মেলায় একত্র হয়েছিলেন উদীয়মান ও অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা, ইনডিপেনডেন্ট ফ্যাশন লেবেলসহ এ বছরের ঈদ সংগ্রহ আবিষ্কার করতে আগ্রহী অসংখ্য উৎসুক দর্শনার্থী ও ক্রেতা।
সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো, ঈদ ফিয়েস্তার তৃতীয় ও শেষ দিন বিভিন্ন ফ্যাশন ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষার্থীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল নিজের মতো করে ঈদ ফিয়েস্তা ঘুরে দেখতে। আমি পড়াশোনা করছি দেশের স্বনামধন্য ফ্যাশন ইউনিভার্সিটি বিইউএফটিতে। বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির একজন ফ্যাশন–শিক্ষার্থী হিসেবে এ ছিল আমার জন্য এক অনন্য সুযোগ। তাই অত্যন্ত উচ্ছ্বাস নিয়ে বড় বোনের সঙ্গে জুটি বেঁধে আমিও চললাম হাল ফ্যাশনের ঈদ ফিয়েস্তায়। ঘুরে দেখলাম পুরো মেলা।
ভেতরে ঢুকতেই দেখি পুরো ভেন্যু গমগম করছে উৎসবের আমেজে। ৫৮ জন উদ্যোক্তা অংশ নেওয়ায় এই মেলায় আকর্ষণীয় সব ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পণ্যের ছড়াছড়ি ছিল চারদিকে, যা যেকোনো ফ্যাশনপ্রেমী মানুষকেই টানবে। উদ্যোক্তা ও আয়োজকদের আন্তরিকতা দেখে মনে হলো, যেন ঠিক এমনই একটা পরিবেশের এক ইভেন্টই দরকার ছিল সেমিস্টার ফাইনালের পর।
বৈচিত্র্যময় নকশার ঈদের পোশাক, হাতে তৈরি ও দেশি কারিগর দিয়ে তৈরি অভিনব সব গয়না, কারুশিল্প, কোনো কিছুরই কমতি ছিল না এই ফিয়েস্তায়। স্টলগুলো খুবই যত্ন নিয়ে সাজানো হয়েছিল, তা একনজরেই বোঝা যায়। মনে হয়েছে, উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য শুধুই পণ্য বিক্রি করা নয়, ক্রেতারা যেন মেলা উপভোগও করেন তা নিশ্চিত করতে সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
একজন ফ্যাশন–শিক্ষার্থী হিসেবে ফ্যাশনভিত্তিক মেলায় গিয়ে ট্রেন্ড পর্যবেক্ষণ করতে, নতুন নতুন জিনিস দেখতে, স্বাধীনভাবে কাজ করা ব্র্যান্ডগুলো কীভাবে নিজেদের কাজ উপস্থাপন করে তা নিয়ে ভাবতে, বিশ্লেষণ করতে আমার বরাবরই ভীষণ ভালো লাগে। তাই এখানেও একই কাজে লেগে পড়লাম। মেলা পর্যবেক্ষণ করতে করতে বেশির ভাগ স্টলের মধ্যেই একটা কমন থিম চোখে পড়ল। আর তা হলো সাসটেইনেবিলিটি। এই শব্দটির সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। আর এই সাসটেইনেবল থিমের পণ্যই ঈদ ফিয়েস্তাতে বেশি ছিল।
এই সময়ে এসে পুরো বিশ্বে যখন ফাস্ট ফ্যাশন রাজত্ব করছে, প্রতিবছর লাখ লাখ টন ফ্যাশন–বর্জ্য সৃষ্টি করছে, সেখানে দেখা গেল ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারের এই মধ্যম পরিসরের মেলায় সবাই পরিবেশসচেতন হয়ে কাজ করতে প্রাণপণে চেষ্টা করছেন। যার যার নিজস্ব জায়গা থেকে সাসটেইনেবিলিটি প্র্যাকটিস করার, রিসাইকেলড প্রোডাক্ট সোর্স করার, দীর্ঘস্থায়ী, টেকসই ভালো মানের পণ্য বিক্রয় করার এই প্রয়াস সত্যিই প্রশংসনীয়। দেশের সচেতন নাগরিক এবং একজন পরিবেশসচেতন মানুষ হিসেবে আমরা ঠিক এমনই তো চাই।
হাল ফ্যাশন ঈদ ফিয়েস্তা ২০২৬-এ এসে দেখলাম ন্যাচারাল ডাই দিয়ে রাঙানো পোশাক, মাটির তৈরি গয়না, মোম-বাটিক ও টাইডাই শাড়ি, বাটিকের শার্ট, এমনকি টিনটিন, হ্যালো কিটি, ডিজনি কার্টুনসহ খুবই মজার মজার প্রিন্টের কাপড়, কাঁসা–পিতলের আকর্ষণীয় সামগ্রীও ছিল এখানে।
সেই সঙ্গে ছিল ফুড স্টলে মুখে লেগে থাকার মতো সব খাবার। তবে পবিত্র রমজান মাসের দিকেও রাখা হয়েছিল বিশেষ নজর। রোজাদারদের দিকে খেয়াল রেখে ছিল ইফতারের ব্যবস্থা। মেলা ঘুরে স্টুডেন্ট বাজেট থাকা সত্ত্বেও আমি কিনে ফেললাম টুকিটাকি বেশ অনেক কিছুই।
ডিজাইনাররা কীভাবে সাংস্কৃতিক নান্দনিকতাকে বর্তমান ফ্যাশন ট্রেন্ডের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, তা নিজের চোখে দেখে ও উদ্যোক্তা আর আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে এই আয়োজন থেকে অনেক কিছু শিখলাম। ঈদ ফিয়েস্তার আরেকটি লক্ষণীয় দিক ছিল, যেটি না বললেই নয়। আর তা হলো উদ্যোক্তা ও গ্রাহকদের মধ্যে ব্যক্তিগত সংযোগ। অনেক স্টলমালিক সরাসরি দর্শনার্থীদের সঙ্গে আন্তরিক কমিউনিকেশন করছিলেন, তাঁদের ডিজাইন, কাপড় ও অনুপ্রেরণার পেছনের গল্পগুলো ব্যাখ্যা করছিলেন।
ফ্যাশন বিষয়ে অধ্যয়নরত কারও জন্য এই কথোপকথনগুলো শিল্পের ব্যবসায়িক দিক সম্পর্কে খুবই মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টির সুযোগ করে দিতে পারে। আর আমিও লোভীর মতো লুফে নিলাম সেই সুযোগ। জানলাম এই ফ্যাশন উদ্যোগগুলোর স্বতন্ত্র ডিজাইনাররা কীভাবে তাঁদের পণ্য বাজারজাত করেন ও তাঁদের গ্রাহকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন।
সব মিলিয়ে, হাল ফ্যাশন ঈদ ফিয়েস্তায় অংশগ্রহণ করা ছিল খুবই আনন্দদায়ক এবং শিক্ষণীয়। উৎসবমুখর কেনাকাটার পরিবেশের বাইরে, এই ইভেন্টটি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সৃজনশীলতা ও দৃঢ় সংকল্পকে তুলে ধরেছে, যাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীন ফ্যাশন ল্যান্ডস্কেপে বর্তমানে সক্রিয়ভাবে অংশ রাখছেন। একজন ফ্যাশন–শিক্ষার্থী হিসেবে এই ঈদ ফিয়েস্তা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ফ্যাশনশিল্প শুধু ডিজাইন করা নয় বরং কাজের মাধ্যমে গল্প বলা আর সেই সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে পরিধেয় পণ্যে রূপান্তর করার ক্ষমতাকেও বোঝায়।
পরিশেষে বলি, হাল ফ্যাশন যেন প্রতিবছর দেশি উদ্যোক্তাদের নিয়ে জনসাধারণের জন্য আরও বড় পরিসরে এমন জাঁকজমকপূর্ণ, জমজমাট ফিয়েস্তার আয়োজন করতে পারে আমি এই কামনাই করছি।
ছবি: লেখক ও হাল ফ্যাশন