হাল ফ্যাশন এক্সপ্লেইনার: ইউরোপের নতুন আইন যেভাবে বদলে দেবে বৈশ্বিক ফ্যাশনশিল্প
শেয়ার করুন
ফলো করুন

একসময় অবিক্রীত পোশাক পুড়িয়ে ফেলা ছিল বৈশ্বিক ফ্যাশনশিল্পের এক অস্বস্তিকর কিন্তু বহুল প্রচলিত বাস্তবতা। ব্র্যান্ডের মর্যাদা রক্ষা, গুদাম খালি করা কিংবা অতিরিক্ত মজুত কমানোর নামে নতুন পোশাক ধ্বংস করা হতো নিয়মিত। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও বহু বছর ধরে বিলাসবহুল ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে ফাস্ট ফ্যাশন কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ ছিল এই অপচয়।

পোশাক তৈরি হওয়ার আগেই তার পেছনে বিপুল ব্যয়
পোশাক তৈরি হওয়ার আগেই তার পেছনে বিপুল ব্যয়

অথচ একটি পোশাক তৈরি হওয়ার আগেই তার পেছনে খরচ হয়ে যায় বিপুল পরিমাণ তুলা, পানি, জ্বালানি, রাসায়নিক, শ্রম ও পরিবহন ব্যয়। সেই পোশাক যদি কখনো ভোক্তার গায়েই না ওঠে; বরং সরাসরি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে অপচয় হয় শুধু একটি পণ্যের নয়; অপচয় হয় তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরো উৎপাদনব্যবস্থার সম্পদের।

এই বাস্তবতাই বদলে দিতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। অবিক্রীত পোশাক ও জুতা ধ্বংসের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি আইন নয়; এটি ফ্যাশনশিল্পের ব্যবসায়িক দর্শন বদলে দেওয়ার ঘোষণা। এর প্রভাব শুধু ইউরোপের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খল, উৎপাদনব্যবস্থা ও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পেও এর প্রতিফলন পড়বে।

বিজ্ঞাপন

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই আইন

ইইউর ইকোডিজাইন ফর সাসটেইনেবল প্রোডাক্টস রেগুলেশন (ইএসপিআর)–এর অধীন বড় কোম্পানিগুলো আর অবিক্রীত পোশাক, জুতা ও নির্দিষ্ট ফ্যাশন–অনুষঙ্গ নিয়মিত ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ধ্বংস করতে পারবে না। এই বিধান ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হতে শুরু করেছে। লক্ষ্য একটাই—পণ্যের জীবনচক্রকে দীর্ঘয়িত করা এবং অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য কমানো।

নতুন আইন কেবল পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়
নতুন আইন কেবল পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়

এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার আইন নয়; এটি উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত পুরো ব্যবসায়িক মডেলকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।

অর্থাৎ এখন থেকে শুধু একটি পোশাক কীভাবে তৈরি হবে, তা নয়; বিক্রি না হলে তার কী পরিণতি হবে, সেটিও আইনের আওতায় চলে এল।

বিজ্ঞাপন

এত পোশাক যায় কোথায়

ফ্যাশনশিল্পে একটি শব্দ রয়েছে—ওভারপ্রোডাকশন বা অতিরিক্ত উৎপাদন। এত দিন এই অতিরিক্ত উৎপাদনের খরচ বহন করেছে মূলত পরিবেশ।

কোনো ব্র্যান্ড কখনোই ঠিক জানে না, কোন পণ্য কত বিক্রি হবে। তাই চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন করাই দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক কৌশল।

বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অবিক্রিত পোশাকের বেশিরভাগই ধংস করা হয়ে থাকে
বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অবিক্রিত পোশাকের বেশিরভাগই ধংস করা হয়ে থাকে

সমস্যা হলো সেই অতিরিক্ত পণ্যের একটি অংশ আর কখনো বিক্রি হয় না।
কখনো সেগুলো গুদামে পড়ে থাকে, কখনো ডিসকাউন্টে বিক্রি হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রেই ধ্বংস করা হয়।

ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, এমন অপচয় এমন এক সময়ে গ্রহণযোগ্য নয়, যখন ফ্যাশনশিল্পকে বিশ্বের অন্যতম দূষণকারী শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিরও প্রশ্ন

কাপড় পুড়িয়ে ফেলা যেমন অপচয় তেমনি পরিবেশের ক্ষতি
কাপড় পুড়িয়ে ফেলা যেমন অপচয় তেমনি পরিবেশের ক্ষতি

অবিক্রীত পোশাক ধ্বংস মানে শুধু কাপড় নষ্ট হওয়া নয়। এর সঙ্গে নষ্ট হয় তুলা উৎপাদনে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, রাসায়নিক রং, শ্রমঘণ্টা ও পরিবহন ব্যয়।

অর্থাৎ একটি পোশাক পুড়িয়ে ফেলা মানে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরো উৎপাদনব্যবস্থার সম্পদকেও অপচয় করা।

তাহলে ব্র্যান্ডগুলো কী করবে

এভাবেই পুনর্বব্যবহার করেত হবে ব্র্যান্ডগুলোকে
এভাবেই পুনর্বব্যবহার করেত হবে ব্র্যান্ডগুলোকে

ইউরোপের নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর ব্র্যান্ডগুলোর ব্যবসায়িক কৌশলও বদলাতে হবে। চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদনের বদলে গুরুত্ব পাবে পরিকল্পিত উৎপাদন, সঠিক মজুত ব্যবস্থাপনা এবং বিক্রি না হওয়া পণ্যের বিকল্প ব্যবহার।
তাই অতিরিক্ত পণ্য ধ্বংস করার পরিবর্তে সেগুলো পুনর্বিক্রি, মেরামত, পুনর্ব্যবহার, আপসাইক্লিং কিংবা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের মতো পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ইতিমধ্যে এ ধরনের উদ্যোগকে তাদের ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ করে তুলছে।

এই পরিবর্তন অবশ্য ভবিষ্যতের বিষয় নয়। প্যাটাগোনিয়া বহু বছর ধরেই 'Worn Wear' কর্মসূচির মাধ্যমে পুরোনো পোশাক মেরামত ও পুনর্বিক্রি করছে। জারা ও এইচঅ্যান্ডএমও বিভিন্ন দেশে প্রি-ওনড বা প্রি-লাভড পোশাক বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে।

সার্কুলার ফ্যাশনের যুগ

এখন পোশাক কিংবা অনুষঙ্গকে বারবার ব্যবহার করতে হবে
এখন পোশাক কিংবা অনুষঙ্গকে বারবার ব্যবহার করতে হবে

দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাশনশিল্পের ব্যবসায়িক মডেল ছিল—তৈরি করো, কেনো, ব্যবহার করো, তারপর ফেলে দাও। এখন সেই রৈখিক (লিনিয়ার) ধারণার জায়গা নিচ্ছে সার্কুলার ফ্যাশন। এখানে একটি পোশাকের জীবন প্রথম ব্যবহারে শেষ হয় না; বরং মেরামত, পুনর্বিক্রি, পুনর্ব্যবহার কিংবা আপসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে সেটিকে যত দিন সম্ভব ব্যবহারের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়।

এই পরিবর্তনের ফলেই ইউরোপে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে রিসেল প্ল্যাটফর্ম, পোশাক ভাড়ার সেবা, রিপেয়ার সার্ভিস এবং আপসাইক্লিংভিত্তিক ব্র্যান্ড। লক্ষ্য একটাই—একটি পোশাককে যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা এবং নতুন উৎপাদনের প্রয়োজন কমিয়ে আনা।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী

এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ইউরোপ আমাদের প্রধান বাজার। অতএব ইউরোপের নতুন নীতির প্রভাব শুধু ইউরোপের ব্র্যান্ডেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা পৌঁছে যাবে বাংলাদেশের কারখানাতেও।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকেও ভাতে হবে নতুন করে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকেও ভাতে হবে নতুন করে

ইউরোপের নতুন আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো তাদের সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও একই ধরনের জবাবদিহি চাইবে। আগামী দিনে ক্রেতারা শুধু দাম বা উৎপাদনক্ষমতা দেখবে না। তারা জানতে চাইবে—
• অতিরিক্ত উৎপাদন কত?
• অবিক্রীত পণ্যের কী হয়?
• পুনর্ব্যবহৃত উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে কি?
• উৎপাদন কতটা ট্রেসেবল?
• কার্বন নিঃসরণ কমাতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
অর্থাৎ প্রতিযোগিতার নতুন ভাষা হবে সাসটেইনেবিলিটি।

শুধু আইন নয়, মানসিকতার পরিবর্তন

প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তনও
প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তনও

এই আইন আসলে ফ্যাশনশিল্পকে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একটি নতুন পোশাক কি এতটাই সস্তা যে বিক্রি না হলে সেটিকে পুড়িয়ে ফেলাই সহজ সমাধান? নাকি প্রতিটি পোশাকের পেছনে থাকা শ্রম, পানি, কাঁচামাল ও পরিবেশের মূল্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ?

এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উত্তর স্পষ্ট—একটি পোশাকের মূল্য শুধু তার দামে নয়; তার পুরো জীবনচক্রে। এক অর্থে এটি ‘টেক-মেক-ওয়েস্ট’ অর্থনীতি থেকে ‘সার্কুলার’ অর্থনীতিতে রূপান্তরের অংশ।

ভবিষ্যতের ফ্যাশন কেমন হবে

ফাস্ট ফ্যাশন বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
ফাস্ট ফ্যাশন বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

আগামী দশকের প্রতিযোগিতা হবে শুধু কে বেশি পোশাক বিক্রি করল, তা নিয়ে নয়; বরং কে কম অপচয় করে বেশি মূল্য তৈরি করতে পারল, তা নিয়েও।
ফ্যাশনবিশেষজ্ঞরা এই পরিবর্তনকে ‘ফ্রম ওয়েস্ট টু ওয়্যারড্রোব’ নামে অভিহিত করছেন—অর্থাৎ বর্জ্য থেকেই আবার নতুন পোশাকের যাত্রা।

শেষ কথা

এক সময় ফ্যাশনশিল্পের সাফল্য মাপা হতো তিনটি মানদণ্ডে। ১. কত বেশি উৎপাদন করা যায়, ২. কত দ্রুত নতুন সংগ্রহ বাজারে আনা যায়; আর ৩. কত বেশি বিক্রি করা যায়।

ইউরোপের নতুন আইন সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এখন প্রশ্নটি আর শুধু কত পোশাক তৈরি হলো নয়; বরং কত পোশাকের জীবন বাঁচানো গেল, সেটিই মুখ্য হয়ে উঠছে।

এখন প্রতিযোগিতা উৎপাদনের নয়, টিকিয়ে রাখার
এখন প্রতিযোগিতা উৎপাদনের নয়, টিকিয়ে রাখার

ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ হয়তো নতুন পোশাক বানানোর প্রতিযোগিতায় নয়; বরং একটি পোশাককে যত দিন সম্ভব জীবিত রাখার সক্ষমতায় নির্ধারিত হবে।

তথ্যসূত্র: ইউরোপীয় কমিশন (ইকোডিজাইন ফর সাসটেইনেবল প্রোডাক্টস রেগুলেশন–ইএসপিআর), ইউরোপীয় ইউনিয়নের অফিশিয়াল জার্নাল, ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থা (ইইএ), জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি), এলেন ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশন,   ম্যাককিনজি অ্যান্ড কোম্পানি, দ্য স্টেট অব ফ্যাশন (বার্ষিক প্রতিবেদন), টেক্সটাইল এক্সচেঞ্জ

ছবি: এআই, উইকিপিডিয়া, প্রথম আলো, ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১১: ০০
বিজ্ঞাপন