
একটি শাড়ির ছেঁড়া পাড় নতুন করে ব্যবহার, পুরোনো শার্টের মাপ বদলে নেওয়া কিংবা ব্যবহারের অনুপযোগী কাপড় দিয়ে কাঁথা তৈরি—এসব একসময় বাঙালি জীবনের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ ছিল। পোশাক পুরনো হয়ে গেলে তা ফেলে দেওয়ার আগে ভাবা হতো, আর কীভাবে ব্যবহার করা যায়। প্রয়োজন, মিতব্যয়িতা ও সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল এই জীবনচর্চা। তখন একে কেউ টেকসই ফ্যাশন বলত না। অথচ আজ বিশ্বজুড়ে যে চর্চাকে পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তার অনেকটাই আমাদের পরিচিত ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলে যায়।
কম দামে, দ্রুত এবং ঘন ঘন নতুন পোশাক বাজারে আনার সংস্কৃতি ফ্যাশনের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ট্রেন্ড বদলানোর সঙ্গে পোশাক বদলানোর প্রবণতা বেড়েছে। ফলে অনেকের কাছে পুরোনো পোশাক মেরামত করার চেয়ে নতুন পোশাক কেনা সহজ ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শহুরে ভোক্তা সংস্কৃতিতে পোশাকের দীর্ঘস্থায়িত্বের বদলে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে এই পরিবর্তনের পরিবেশগত মূল্যও রয়েছে। পোশাক উৎপাদনে ব্যবহৃত পানি, জ্বালানি, কাঁচামাল ও শ্রমের পাশাপাশি ব্যবহারের অল্প সময়ের মধ্যে পোশাক ফেলে দেওয়ার প্রবণতা বস্ত্রবর্জ্যের পরিমাণ বাড়ায়। ফলে পোশাকের আয়ু বাড়ানো, মেরামত এবং পুনর্ব্যবহারের বিষয়গুলো আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ফ্যাশনইউনাইটেডের ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপে পোশাক ও জুতা মেরামতের বাজার ২০২৫ সালে আনুমানিক ২৮০ কোটি ইউরোর ছিল। ২০৩০ সাল নাগাদ বাজারটির আকার ৩৭০ কোটি ইউরোতে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও মেরামত এখনো ফ্যাশনশিল্পের প্রধান ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হয়নি।

আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও এ ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাচ্ছে। প্যাটাগোনিয়া দীর্ঘদিন ধরে পোশাক মেরামতসেবা দিয়ে আসছে। নুডি জিনস ২০১৪ সাল থেকে বিনা মূল্যে জিনস মেরামতের সেবা চালু রেখেছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন ব্র্যান্ড এখন মেরামত, পুনর্বিক্রয় ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে।
এই প্রবণতা দেখায়, পোশাকের জীবনকাল বাড়ানো শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়; এটি গ্রাহকসেবা ও ব্যবসায়িক কৌশলেরও অংশ হতে পারে। তবে মেরামতের খরচ, দক্ষ শ্রমিকের প্রাপ্যতা এবং নতুন পোশাকের সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশে পোশাক মেরামতের জন্য নতুন করে সংস্কৃতি তৈরি করার প্রয়োজন নেই। পাড়ার দর্জির দোকান, পোশাকের মাপ পরিবর্তন, পুরোনো শাড়ি থেকে নতুন পোশাক তৈরি কিংবা পুরনো কাপড় দিয়ে কাঁথা বানানো—এসবের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের পরিচয় রয়েছে। পুরোনো পোশাক পরিবারের অন্য সদস্যের কাজে লাগানো কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী পোশাকের নকশা বদলে নেওয়ার অভ্যাসও বহু পরিবারে প্রচলিত।

তবে এই চর্চাকে আধুনিক ব্যবসায় রূপ দেওয়ার সুযোগ এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড, বুটিক ও অনলাইন পোশাক বিক্রেতারা মেরামতসেবা, পোশাকের মাপ পরিবর্তন এবং পুরোনো পোশাক নতুন নকশায় তৈরির উদ্যোগ নিতে পারে। নির্ধারিত মূল্য, কাজের মান এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এটি নিয়মিত আয়ের একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
এতে স্থানীয় দর্জি ও কারিগরদের কাজের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি, পুরোনো পোশাককে নতুনভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রেতার ব্যয়ও কমতে পারে। ফ্যাশন ডিজাইনার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুরোনো কাপড়ের সৃজনশীল ব্যবহারকে নকশা ও প্রশিক্ষণের অংশ করতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য টেকসই ফ্যাশনের আলোচনা আরও বিস্তৃত। পোশাক তৈরির সময় অবশিষ্ট কাপড়, ত্রুটিপূর্ণ পণ্য এবং অন্যান্য বস্ত্রবর্জ্য ব্যবস্থাপনা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়ভাবে এসব বর্জ্যের একটি অংশ ‘ঝুট’ হিসেবে পরিচিত এবং এর কিছু অংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়।

তবে কারখানার ঝুট পুনর্ব্যবহার ও ভোক্তার ব্যবহৃত পোশাক মেরামত এক বিষয় নয়। প্রথমটি উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত, আর দ্বিতীয়টি পোশাকের ব্যবহারকাল বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। দুটির জন্যই প্রয়োজন দক্ষতা, কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা ও উপযুক্ত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা।
ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো উৎপাদনের শুরু থেকেই দীর্ঘস্থায়ী ও মেরামতযোগ্য পোশাক তৈরিতে গুরুত্ব দিতে পারে। একই সঙ্গে পোশাকের যত্ন, মেরামত এবং পুনর্ব্যবহারের বিষয়ে ক্রেতাদের সচেতন করা প্রয়োজন।
পোশাক মেরামতের প্রবণতা বাড়ছে বলেই যে এটি ফ্যাশনশিল্পের কাঠামো বদলে দেবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য মূল্য, দক্ষ কারিগর, মানসম্মত সেবা এবং ক্রেতার মানসিকতার পরিবর্তন।

তবে বাংলাদেশের সামনে একটি স্বতন্ত্র সুযোগ রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে মেরামতের ধারণা ধার করার প্রয়োজন নেই; বরং নিজেদের পুরোনো অভ্যাস ও কারিগরি দক্ষতাকে নতুনভাবে কাজে লাগানোই হতে পারে বড় শক্তি।
একসময় আমরা পোশাক মেরামত করতাম প্রয়োজনের তাগিদে। এখন বিশ্ব তা করছে সম্পদের অপচয় কমানো ও পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে। ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ হয়তো আমাদের আবার সেই পুরোনো অভ্যাসের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে—তবে এবার ঐতিহ্যের পাশাপাশি থাকবে নতুন নকশা, নতুন ব্যবসা এবং নতুন অর্থনীতি।
ছবি: প্রথম আলো, পেকজেলসডটকম, আনস্প্ল্যাশড, ইন্সটাগ্রাম