
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটি চমকপ্রদ এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভিশন টোয়েন্টিথার্টির অধীনে সৌদি ফ্যাশনের পালে লেগেছ জোয়ার। সৌদি আজ পরিণত হয়েছে লাক্সারি ফ্যাশনের এক নতুন কেন্দ্রে।
সৌদির কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বালুময় মরুভূমি, পবিত্র নগরী মক্কা-মদিনা আর আরব ঐতিহ্যের গৌরবময় সব বিষয়। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটি চমকপ্রদ এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তেলের অর্থনীতিনির্ভর সৌদি আজ পরিণত হয়েছে লাক্সারি ফ্যাশনের এক নতুন কেন্দ্রে—যেখানে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার দুর্দান্ত মেলবন্ধন তৈরি করছে অনন্য সাংস্কৃতিক নবজাগরণ।

সৌদি ডিজাইনাররা এখন আর শুধু আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নন। প্যারিস, মিলান, লন্ডনসহ বিশ্বের বিখ্যাত র্যাম্পগুলোতে সৌদি ব্র্যান্ডগুলোর উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। ‘মেড ইন সৌদি’এখন কেবল একটি লেবেল নয়—এটি মর্যাদা, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার প্রতীক। আশি স্টুডিওর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আশি ২০২৩ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম ডিজাইনার হিসেবে প্যারিস ওত কতুর ফ্যাশন উইকে অংশ নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। পাশাপাশি রিম আর কানহাল, নোরা আলদামার, খালিদ আল মাসউড ও তালা আবু খালেদের মতো ডিজাইনাররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৌদি ফ্যাশনের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ভিশন টোয়েন্টিথার্টির অধীনে সৌদি ফ্যাশন কমিশন-এর ‘সৌদি হানড্রেড ব্র্যান্ডস’ উদ্যোগের মাধ্যমে সে দেশের ৪০টির বেশি ফ্যাশন ব্র্যান্ড হোয়াইট মিলানো, প্যারিস ফ্যাশন উইক ও লন্ডন সেলফরিজেজের মতো বিশ্বখ্যাত সব ইভেন্টে অংশ নিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়, সৌদি এখন বৈশ্বিক ফ্যাশন মানচিত্রের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিনিধি।
আজকের সৌদি ফ্যাশনের প্রাণকেন্দ্র রিয়াদ ও জেদ্দা। এখানকার রিয়াদ ফ্যাশন উইক ও সৌদি ডিজাইন ফেস্টিভ্যালে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ডিজাইনারদের সৃজননৈপুণ্যে ঝলমল করে র্যাম্প। সিল্ক গাউন, হীরার কাজ করা আবায়া, সোনালি জুয়েলারি ও কাফতান—সবকিছুর মধ্যেই ঘটছে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার নিখুঁত মেলবন্ধন।
বর্তমানে চলছে রিয়াদ ফ্যাশন উইক ২০২৫। চলবে ১৬ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর। এবার ৩০টির মতো রানওয়ে শো হচ্ছে। আরও চমক হলো দুই ব্রিটিশ ব্র্যান্ড ভিভিয়েন ওয়েস্টউড ও স্টেলাম্যাককার্টনি।

রিয়াদের তহলিয়া স্ট্রিট ও কিং আবদুল্লাহ ফিনানসিয়াল ডিস্ট্রিক্ট আর জেদ্দার আল-বালাদ ও সালাম মল এখন বিলাসী শপিং ও ফ্যাশনপ্রেমীদের নতুন গন্তব্য। রিয়াদ সিজন ও জেদ্দা সিজনের মতো সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো এই ফ্যাশন জোয়ারে যুক্ত করছে সংগীত, শিল্পকলা ও বিনোদনের রঙিন আবহ। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে রিয়াদ সিজন। চলবে মার্চ পর্যন্ত।
সৌদি ফ্যাশনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর লাক্সারি মডেস্ট ওয়্যার। ঐতিহ্যবাহী আবায়া, কাফতান কিংবা ফ্লোয়িং গাউনকে নতুন ডিজাইন, আধুনিক কাট ও সূক্ষ্ম অলঙ্করণে আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ধর্মীয় মূল্যবোধে আপস না করেই কীভাবে আধুনিক ফ্যাশন ধারণা ফুটিয়ে তোলা যায়—সৌদি ডিজাইনাররা তারই উদাহরণ দিচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশের অভিজাত নারীরা, যারা আভিজাত্য বজায় রেখে মার্জিত পোশাক পছন্দ করেন, তাদের কাছে সৌদি ফ্যাশন হয়ে উঠছে নতুন অনুপ্রেরণা। রিয়াদের কিংডম সেন্টার মল, জেদ্দার রেড সি মল ও দিরিয়াহের বিলাসবহুল বুটিকগুলোতে এই ধরনের পোশাক বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
সৌদি আরবে ফ্যাশন এখন কেবল পোশাক নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। আলউলা সামার নাইটে মরুভূমির বুকে তারার চাঁদোয়া অনুষ্ঠিত কতুর শো কিংবা রিয়াদের জ্যাক্স ডিস্ট্রিক্টের ফ্যাশন, আর্ট ও ডিজাইনের মিলন অনন্য আবহ তৈরি করছে।

দিরিয়াহের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য, উৎকৃষ্ট রেস্টুরেন্ট ও লাক্সারি স্টোরগুলো পর্যটকদের জন্য সৌদি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক মিশ্র অভিজ্ঞতা এনে দিচ্ছে। রেড সি প্রজেক্টের নতুন সব উদ্যোগ ভবিষ্যতে উপকূলজুড়ে বিলাসবহুল শপিং ও রিসোর্ট সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত সমাজে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের প্রভাব ছিল প্রবল। কিন্তু এখন সেই রুচিতে আসছে পরিবর্তন। সৌদি ফ্যাশনের নবজাগরণ তাদের জন্য খুলে দিয়েছে এক নতুন দিগন্ত—যেখানে বিলাসিতা ও সংস্কৃতি চলছে সমান্তরালে।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ী পরিবার, কূটনীতিক ও প্রবাসীরা এখন সৌদির ফ্যাশন উইক, রিয়াদ বুলেভার্ড সিটি বা দিরিয়াহের বুটিক স্ট্রিটে শপিংকে নিজেদের মর্যাদার অংশ হিসেবে দেখছেন। এটি কেবল কেনাকাটার অভিজ্ঞতা নয়, বরং সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক আভিজাত্যের এক মেলবন্ধন।
সৌদি সরকারের ভিশন টোয়েন্টিথার্টি কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফ্যাশন এখন একটি কৌশলগত শিল্প খাত। সৌদি ফ্যাশন কমিশন ডিজাইনারদের জন্য আন্তর্জাতিক মেন্টরশিপের ব্যবস্থা করা ছাড়াও ব্র্যান্ডিং সাপোর্ট দিচ্ছে। এমনকি বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগও করে দিচ্ছে।

এই প্রচেষ্টায় সৌদি প্রমাণ করছে—ফ্যাশন কেবল স্টাইল নয়, এটি সাংস্কৃতিক কূটনীতি। ফ্যাশনের মাধ্যমে দেশটি তার নতুন, উদার ও আধুনিক ভাবমূর্তি তুলে ধরছে বিশ্বের সামনে।
সৌদি আরবের লাক্সারি ফ্যাশনের এই নবজাগরণ আসলে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেও কীভাবে আধুনিক ওত কতুরকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা যায়, তার অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সৌদি।
বাংলাদেশের অভিজাত সমাজের কাছে সৌদি ফ্যাশন এখন শুধু কেনাকাটা নয়—এটি রুচি, আভিজাত্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। মরুর বুকে জন্ম নেওয়া এই ‘ওত কতুরের রূপকথা’ তাই কেবল সৌদির নয়, বরং এক বৈশ্বিক ফ্যাশন আন্দোলনেরই অনন্য অধ্যায়।
ছবি: সৌদি টুরিজম অথরিটি