
আজ ২৯ আগস্ট, মাইকেল জ্যাকসনের ৬৮তম জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে কিং অব পপকে স্মরণ করা যাক ‘মাইকেল’ সিনেমায় তাঁর লুক পুনর্নির্মাণের নেপথ্যের গল্পে। কারণ মাইকেলকে পর্দায় ফিরিয়ে আনার এই আয়োজন শুধু গান, নাচ কিংবা পোশাকের গল্প নয়। চুল, মেকআপ, ভ্রু, মুখের গড়ন, ত্বকের টোন এবং শরীরের অবয়ব সবকিছু মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের মাইকেল জ্যাকসনকে।

মাইকেল জ্যাকসনের ফ্যাশন নিয়ে কথা বললে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঝলমলে বা মিলিটারি জ্যাকেট, ফেডোরা, সাদা গ্লাভস কিংবা মঞ্চে আলো ছড়ানো অসংখ্য পোশাক। কিন্তু ‘মাইকেল’ সিনেমায় তাঁর ফ্যাশনকে শুধু কয়েকটি বিখ্যাত পোশাকের সমষ্টি হিসেবে দেখা হয়নি। বরং একজন তরুণ শিল্পী কীভাবে সময়ের সঙ্গে নিজের আলাদা দৃশ্যমান পরিচয় তৈরি করেছিলেন, সেই বিবর্তনের মধ্য দিয়েই তুলে ধরা হয়েছে তাঁর স্টাইল-যাত্রা।

সিনেমার কস্টিউম ডিজাইনের দায়িত্বে ছিলেন মার্সি রজার্স। তাঁর কাজ ছিল শুধু মাইকেল জ্যাকসনের বিখ্যাত পোশাকের অনুকরণ করা নয়; প্রতিটি পোশাকের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনের আলাদা সময়, মানসিক পরিবর্তন এবং শিল্পী হিসেবে মাইকেল জ্যাকসনের বিকাশকে দৃশ্যমান করা। এই কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ আর্কাইভাল তথ্য। রজার্স প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার গবেষণাসামগ্রী তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। পুরোনো ম্যাগাজিন, আলোকচিত্র, ভিডিও এবং মাইকেলের আসল পোশাকের খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করে তৈরি করা হয়েছে সিনেমার পোশাকগুলো।
‘থ্রিলার’-এর লাল জ্যাকেট, ‘ব্যাড’ যুগের জিপারযুক্ত পোশাক, ‘মোটাউন ২৫’-এর ঐতিহাসিক লুক কিংবা ভিক্টরি ট্যুরের পোশাক। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল নিখুঁত উপস্থাপনার চেষ্টা। রং, কাপড়ের গঠন, অলংকরণের ধরন থেকে শুরু করে ঝলমলে পাথরের বিন্যাস সবকিছুতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পর্দায় জাফর জ্যাকসনকে মাইকেল জ্যাকসনে রূপান্তরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মুখাবয়ব ও শারীরিক পরিবর্তন। সেই দায়িত্বে ছিলেন মেকআপ ও হেয়ার ডিজাইনার বিল কোরসো। মাইকেলের জীবনের বিভিন্ন সময়ের চেহারা আলাদা করে ফুটিয়ে তুলতে কোরসোকে কাজ করতে হয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। প্রতিটি সময়ের মাইকেলের ছবি মেকআপ রুমে রাখা হতো। কারণ জাফরের চেহারায় সময়ের সঙ্গে বদলে দিতে হয়েছে ভ্রু, চুল, ত্বকের টোন, নাক, থুতনি এবং মুখের সামগ্রিক গড়ন।
ফলে একই অভিনেতাকে কখনো দেখা যায় তরুণ মাইকেল হিসেবে, আবার অন্য দৃশ্যে তিনি হয়ে ওঠেন ক্যারিয়ারের পরবর্তী সময়ের মাইকেল। পরিবর্তনগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে দর্শকের কাছে তা আলাদা চরিত্র নয়, বরং একই মানুষের সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া চেহারা বলেই মনে হয়।

বিল কোরসোর জন্য ‘থ্রিলার’ ছিল বিশেষ একটি অধ্যায়। কিশোর বয়সে তিনি রিক বেকারের তৈরি ‘থ্রিলার’-এর মেকআপ দেখে চলচ্চিত্রের মেকআপ শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। পরবর্তীতে সেই একই ‘থ্রিলার’কে ‘মাইকেল’ সিনেমায় পুনর্নির্মাণ করার সুযোগ তাঁর ক্যারিয়ারের এক ধরনের পূর্ণবৃত্ত হয়ে ওঠে।
‘থ্রিলার’ অংশে আধুনিক প্রযুক্তির বদলে সেই সময়ের মেকআপ পদ্ধতি ব্যবহার করে লুকটির কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করা হয়েছে। মাইকেলের রূপান্তর এবং জম্বিদের মেকআপেও পুরোনো দিনের ফোম রাবার ও গ্রিজপেইন্ট ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে মেকআপের কাজ শুধু ‘থ্রিলার’-এ সীমাবদ্ধ ছিল না। সিনেমার পুরো সময়জুড়েই মেকআপকে ব্যবহার করা হয়েছে চরিত্রের বয়স ও চেহারার পরিবর্তন বোঝাতে।

মাইকেল জ্যাকসনের পোশাক কখনোই শুধু পোশাক ছিল না। তাঁর মিলিটারি জ্যাকেট, ঝলমলে মঞ্চপোশাক, ফেডোরা কিংবা এক হাতে গ্লাভস সবই ধীরে ধীরে তাঁর নিজস্ব দৃশ্যমান ভাষার অংশ হয়ে উঠেছিল। সিনেমায় সেই ভাষাকেই ব্যবহার করা হয়েছে গল্প বলার উপকরণ হিসেবে। বাবার নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে নিজের একক ক্যারিয়ারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় মাইকেলের সামরিক ধাঁচের পোশাক ও অ্যাভিয়েটরস তাঁর নতুন আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। কস্টিউম ডিজাইনার মার্সি রজার্সও পোশাকের মাধ্যমে চরিত্রের এই বিবর্তনকে তুলে ধরার কথা বলেছেন। অর্থাৎ একটি জ্যাকেট এখানে শুধু একটি জ্যাকেট নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মাইকেলকে বোঝানোর দৃশ্যমান সংকেত।

মাইকেল জ্যাকসনের মতো বিশ্বখ্যাত তারকাকে পর্দায় পুনর্নির্মাণ করা মানেই দর্শকের স্মৃতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা। কারণ মাইকেলের আসল ছবি, ভিডিও ও পারফরম্যান্স কোটি মানুষের চোখে গেঁথে আছে।

সেই কারণেই ‘মাইকেল’ সিনেমার সৃজনশীল দলকে প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। এমনকি মাইকেলের গ্র্যামি পারফরম্যান্সের পোশাকের ওজনও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালক অ্যান্টোয়ান ফুকোয়া জানিয়েছেন, সেই পোশাকের পুনর্নির্মিত সংস্করণটির ওজন প্রায় ১৫ পাউন্ড ছিল এবং আসল পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে তা তৈরি করা হয়েছিল।

বিল কোরসোর কাজেও ছিল একই ধরনের নিখুঁততার চেষ্টা। তাঁর ভাষায়, সিনেমার কোনো লুকই তিনি এমন মনে করেননি যা আর একটু উন্নত করা যেত না। এই ‘আরও একটু ভালো’ করার মানসিকতাই যেন মাইকেল জ্যাকসনের নিজের কাজের প্রতিটি অংশকেই পারফেক্ট করার মনভাবের সঙ্গে মিলে যায়।

মাইকেল জ্যাকসনের ফ্যাশন তাই শুধু পোশাকের ইতিহাস নয়। এটি একজন শিল্পীর নিজের পরিচয় তৈরি করার গল্প। ছোটবেলার মঞ্চ থেকে ‘থ্রিলার’, ‘ব্যাড’, ‘মোটাউন ২৫’ কিংবা পরবর্তী বিশ্বখ্যাত পারফরম্যান্স, প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর চেহারা ও পোশাক বদলেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে এমন এক স্টাইল, যা শেষ পর্যন্ত মাইকেল জ্যাকসনকেই তুলে ধরেছে।

‘মাইকেল’ সিনেমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো, সিনমায় মাইকেল জ্যাকসনের স্টাইলকে কেবল পুনর্নির্মাণ করা হয়নি; বরং পোশাক, চুল ও মেকআপের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে কীভাবে একজন মানুষ ধীরে ধীরে কিভাবে নিজেকে আইকন হিসেবে তৈরি করেছে।
আজ তাঁর ৬৮তম জন্মদিনে তাই মাইকেল জ্যাকসনকে শুধু ‘কিং অব পপ’ হিসেবে নয়, ফ্যাশন ও দৃশ্যমান সংস্কৃতির এক অনন্য নির্মাতা হিসেবেও মনে করা যায়। তাঁর পোশাক বদলেছে, চেহারা বদলেছে, সময় বদলেছে। কিন্তু তাঁর তৈরি স্টাইলের স্বাক্ষর রয়ে গেছে একই রকম অমলিন।
ছবি: লায়ন্সগেট, সেন্ট উইন্সটন ক্যারেকটার অব আর্ট, বিল কোরসো