
বিশ্ব ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে বিলাসবহুল পণ্যের নকল হওয়ার সমস্যা পুরোনো। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য থেকে এই ধারা চলমান। তবে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এতে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। প্রতিনিয়ত এর রূপ হচ্ছে আরও নিখুঁত।

বিলাসী পণ্যের নকল হওয়া নিয়ে সম্প্রতি এনট্রুপি একটি জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে আছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নকল হওয়া বিলাসী ব্র্যান্ডগুলোর তালিকা। এই নকলের ফলে বিশ্বব্যাপী কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, সেটাও এই রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে।
এনট্রুপির প্রতিবেদন থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। এই তালিকায় শীর্ষে আছে লাক্সারি ব্র্যান্ড ‘লুই ভিতোঁ’। কারণ, তাদের পণ্য বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি নকল হচ্ছে। এর হার প্রায় ৩২.৭৬ শতাংশ। এর পরিমাণ অন্তত ৬৪ কোটি টাকা।
কেবল হ্যান্ডব্যাগের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে প্রাদা। এই ব্র্যান্ডের ব্যাগের মধ্যে ১৪.৪২ শতাংশই আসল বা নকল হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তাতে ধরে নেওয়া যায় এসব পণ্য সন্দেহজনক কিংবা নিশ্চিতভাবেই নকল।

অন্যদিকে গত বছর স্ক্যান করে গুচির যত নকল ব্যাগ পাওয়া গেছে, তার মূল্য প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ ডলার। এর সব ধরনের নকল হওয়া শ্যানেলের পণ্যের মোট মূল্য ছিল প্রায় ৫০ কোটি ডলার।

রিপোর্ট থেকে আরও জানা যায় গয়ার্ড ব্র্যান্ডের জনপ্রিয় সেন্ট লুই টোট ব্যাগের ১৮.৪ শতাংশই নকল। এ ছাড়া নকল হওয়া আরও অনেক ব্র্যান্ডই আছে। কিন্তু সেগুলো চিহ্নিত করা যায়নি। এমন নকল হওয়া লাক্সারি পণ্যের মূল্য প্রায় ৬১ মিলিয়ন ডলার।
লাক্সারি ব্র্যান্ডের পণ্য নকল করা হলেও তা খারাপ কিছু না বলে মনে করেন অনেকে। স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায় বলেই তাদের মধ্যে এই ধারণা জন্মায়। এসব ব্র্যান্ডের পণ্যের মাস্টারকপির দামও বেশ চড়া। তবে আসল পণ্যের নামে, মাস্টারকপিও চালিয়ে দেওয়া হয়। আসল পণ্য ও মাস্টারকপির মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে; যেটা অনেকেই বোঝেন না।

তবে এই নকল পণ্য বিপণনের প্রভাব শুধু আর্থিকই নয়, মানবিক দিক থেকেও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অফিসের দেওয়া তথ্য বলছে, নকল পণ্যের কারণে বছরে ব্র্যান্ডগুলোর ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৬০০ কোটি ইউরো। চাকরি হারাচ্ছেন সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষ।
নকল পণ্য তৈরির সবচেয়ে ভয়ানক দিকগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে পোশাক। এসব কাপড় অনেক সময় বিষাক্ত রাসায়নিক দিয়ে তৈরি করা হয়। এতে ত্বকের সমস্যা থেকে শুরু করে মারাত্মক অ্যালার্জিরও আশঙ্কা থাকে। এমনকি এসব পোশাক তৈরির সঙ্গে মানব পাচার আর শিশুশ্রমও জড়ি থাকে। রিপোর্ট বলছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩৮ শতাংশ পাচারের শিকার হওয়া শিশুরা আছে।
সমস্যা সমাধানে এনট্রুপির প্রতিষ্ঠাতা বিদ্যুৎ শ্রীনিবাসন বলেন, এই সংকট এড়াতে হলে বিরাট পরিসরে তথ্য সংগ্রহ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করতে এআই তো আছেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো হয়ে উঠেছে নকল পণ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাজার। অনেক সময় বিজ্ঞাপনেও থাকে বিভ্রান্তিকর ছবি ও দাম। ২০২৩ সালে, শুধু ‘শিন’ ও ‘তেমু’তে আমেরিকার ৪০ শতাংশ এবং ইউরোপের প্রায় ২৬ শতাংশ ক্রেতা কেনাকাটা করেছেন। এর মধ্যে অধিকাংশ পণ্যই ছিল নকল বা অস্বীকৃত।

আবার এর ইতিবাচক দিকগুলোও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। যেমন ২০২৪ সালে ব্যাগ ও স্নিকার্সের মধ্যে নকল শনাক্তের হার কমে ৮.৯ থেকে ৮.৪ শতাংশে নেমেছে। তবে সামগ্রিকভাবে নকলের পরিমাণ এখনো বিপজ্জনকভাবে বেশি।
পণ্য নকলের পেছনে মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং একটি নির্দিষ্ট অংশের মানুষের স্বার্থোদ্ধারের চেষ্টা কাজ করে। নকল বন্ধে এসব বিষয় নির্মূল করা জরুরি বলেই বিদ্যুৎ শ্রীনিবাসনের অভিমত।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম