চীনের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব লোকজ মোটিফ। চীনের ৫৬ জাতির অন্যতম মিয়াও জাতিগোষ্ঠী। তাদের নিজস্ব এমব্রয়ডারি সারা বিশ্বে সুপরিচিত। মিয়াও এমব্রয়ডারির বৈশিষ্ট্য হলো উজ্জ্বল রং এবং বিভিন্ন রকম নকশা। মিয়াও এমব্রয়ডারির নকশাকে বোল্ড অ্যান্ড বিউটিফুল বলে মনে করেন বিশ্বের ফ্যাশনপ্রেমীরা। ইতালিসহ অন্যান্য দেশের ফ্যাশন উইকের র্যাম্পে মডেলদের গায়ে শোভা পেয়েছে মিয়াও এমব্রয়ডারি করা পোশাক।
চীনের কুইচৌ প্রদেশের এক প্রবীণ নারী শি ইয়াংচিউ। তাঁর বয়স এখন ৭৩ বছর। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন সুই–সুতা। এর পর থেকে তিনি মিয়াও নকশিকাজে পার করেছেন জীবনের দীর্ঘ সময়।
৪৯টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রদেশ কুইচৌ। এদের অন্যতম মিয়াও জাতিগোষ্ঠী। মিয়াও জাতির লোকজ সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মিয়াওদের নকশিকাজ বা মিয়াও সূচিকর্মের রয়েছে ঐতিহ্য দীর্ঘ। এই এমব্রয়ডারি কেবল নারীরাই করেন। তাঁরাই জানেন প্রতিটি নকশার ভাঁজে লুকিয়ে আছে কী গোপন রহস্য। প্রকৃতপক্ষে মিয়াও এমব্রয়ডারির মধ্যে তাঁদের জাতির ইতিহাস, লোককাহিনি ব্যক্ত করা হয়। মিয়াও নকশিকাজ চীনের অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ) তালিকায় রয়েছে।
এই ঐতিহ্যের একজন ধারক বা ইনহেরিটর হলেন শি ইয়াংচিউ। তিনি তাঁর মায়ের কাছ থেকে শিখেছিলেন এই কারুশিল্প। শি ইয়াংচিউ তাঁর মেয়ে শি ছুয়ানইয়িংকে এই শিল্প শেখানো শুরু করেন। ছুয়ানইয়িংয়ের তখন মাত্র ১১ বছর বয়স।
শি ছুয়ানইয়িং বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন বিশ্বে এক পরিচিত ব্যক্তি। তিনি মিয়াও নকশার উজ্জ্বল ও সাহসী রংগুলোকে তুলে ধরেছেন ফ্যাশন জগতে।
শি ছুয়ানইয়িং বলেন, তিনি তাঁর মা ও নানির কাছ থেকে শিখেছেন। শি ইয়াংচিউ মনে করেন, তাঁর মেয়ে বেশি দক্ষ শিল্পী। কারণ, তিনি এর সঙ্গে যোগ করেছেন আধুনিক চিন্তা।
১৯৩০–এর দশক থেকে শি ইয়াংচিউ নকশিকাজের নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলেন। তখন আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাঁর দুই মেয়ে জুনিয়র মিডল স্কুল পাস করেন। ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট হন। নকশিকাজের কাপড় বাজারজাত করেই সংসার চালিয়েছেন তিনি। টাকা ধার করে ব্যবসা চালাতে হয়েছে। শুধু তা–ই নয়, অক্লান্ত পরিশ্রমে বড় করেছেন প্রতিষ্ঠান। এমনকি বিদেশেও কাপড় সরবরাহ করতে থাকেন। পরে মেয়ে তাঁর ব্যবসার হাল ধরেন।
১৯৯০–এর দশক থেকে শি ইয়াংচিউ বলে আসছেন, এই নকশিকাজ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তিনি প্রশিক্ষণ কর্মশালা শুরু করেন। গ্রামের নারীদের এই কাজে প্রশিক্ষণ দেন। তাঁর মাধ্যমে অন্তত ৩০০ নারী তাঁদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছেন।
শি ছুয়ানইয়িং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন নতুন মিয়াও পোশাক, অ্যাকসেসরিজ উপহার দিয়ে খ্যাতি পেয়েছেন। বিশ্ব ফ্যাশন দরবারে এখন মা–মেয়ে দুজনেই নাম করেছেন।
আন্তজার্তিক ফ্যাশন শোগুলোতে যখন মিয়াও এমব্রয়ডারির পোশাকে মডেলরা র্যাম্পে হাঁটেন, তখন সেই নকশিকাজের মাধ্যমে যেন বলা হতে থাকে মিয়াও নারীদের যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত আনন্দ-বেদনার কাব্য।
তথ্যসূত্র: সিসিটিভি
ছবি: সিসিটিভি, চায়না ফ্যাশন উইকের অফিশিয়াল সাইট, ইন্সটাগ্রাম