
নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইকের ২৫তম আসর কেবল কোনো ফ্যাশন সেলিব্রেশন ছিল না; বরং নিজের পরিচয় নতুন করে আবিষ্কারেরও উপলক্ষ ছিল। এবারের আসরে মাউরি ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আদিবাসী ফ্যাশন শুধু জায়গাই করে নেয়নি; বরং ছিল মূল ফোকাস। ১৬ জন ডিজাইনারের কাহুই কালেকটিভ রানওয়ে, প্রথমবারের মতো আয়োজিত আদিবাসী ফ্যাশন সিম্পোজিয়াম এবং একাধিক মাউরি ও প্যাসিফিক-কেন্দ্রিক শো মিলিয়ে এবারের আয়োজন আদিবাসী ফ্যাশনের প্রতিনিধিত্বকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।

নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইকের ইতিহাসে আদিবাসী ফ্যাশনের উপস্থিতি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই উপস্থিতি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৬-এর আসরে এসে সেটি আর কোনো পার্শ্ব-আয়োজন নয়; বরং ফ্যাশন উইকের অন্যতম প্রধান বক্তব্য।
আর এখানেই এবারের আয়োজনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।

কাহুই কালেকটিভের ১৬ ডিজাইনারের রানওয়ে ছিল এবারের সবচেয়ে আলোচিত আয়োজনগুলোর একটি। আটজন মাউরি ও প্যাসিফিকা ডিজাইনারের সঙ্গে ছিলেন আলাস্কা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার ফার্স্ট নেশনস, ভারত, ফিজি, রোটুমা ও তাইওয়ানের আটজন আদিবাসী ডিজাইনার। অর্থাৎ, ভিন্ন ভিন্ন দেশের ১৬ জন সৃজনশীল মানুষ একই রানওয়েতে নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সমকালীনতার গল্প বলেছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পুরো আয়োজনটিই ছিল মাউরি-নেতৃত্বাধীন। চুল ও মেকআপ থেকে শুরু করে প্রযোজনা—সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব ছিল তাঁদের হাতে।
এখানে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মূলধারার ফ্যাশন উইকে আদিবাসী ডিজাইনারদের জন্য একটি শো রাখা এক বিষয়; আর সেই শো–এর গল্প, নির্মাণ ও উপস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ তাঁদের নিজেদের হাতে তুলে দেওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়।
এবার দ্বিতীয়টিই ঘটেছে।
রানওয়ের বাইরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মশালা, আলোচনা, বিক্রয়-আয়োজন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নানা পর্ব। ফলে কাহুই কালেকটিভ শুধু একটি দলগত ফ্যাশন শো হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে আদিবাসী ডিজাইনারদের জন্য জ্ঞান, সম্পর্ক ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরির একটি বড় প্ল্যাটফর্ম।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন ডিজাইনার কিরি নাথান। তাঁর নিজের ক্যারিয়ারও যেন নিউজিল্যান্ডের সাম্প্রতিক মাউরি ফ্যাশনের ইতিহাসের সঙ্গে পাশাপাশি এগিয়েছে।
২০০৯ সালে তিনি মাউরি ফ্যাশন অ্যাপারেল বোর্ডের মিরোমোডা এমার্জিং ডিজাইনার পুরস্কারের প্রথম বিজয়ী হন। একই বছর নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইকে তাঁর অভিষেক। ২০২৩ সালে তিনি হন আয়োজনটির ২২ বছরের ইতিহাসে প্রথম মাউরি ডিজাইনার, যিনি নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইক উদ্বোধন করেন। ২০২৫ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাহুই কালেকটিভ ছয়জন মাউরি ও আদিবাসী ডিজাইনারকে নিয়ে প্রথমবারের মতো এই আয়োজনে অংশ নেয়। আর এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬–তে।
অর্থাৎ, ২০২৬-এর এই বৃহৎ রানওয়ে হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পথচলা—একজন ডিজাইনারের ব্যক্তিগত সাফল্য থেকে একটি কালেকটিভ, আর সেই কালেকটিভ থেকে বৃহত্তর আদিবাসী ফ্যাশন পরিসর তৈরির চেষ্টা।

কিরি নাথানের উদ্যোগে গ্লেন ইনেসে গড়ে উঠেছে তে পা—মাউরি ও আদিবাসী ফ্যাশন, শিল্প ও সৃজনশীল উদ্যোগের একটি কেন্দ্র। সেখানে ফ্যাশন, শিল্প, খুচরা বিক্রি ও সৃজনশীল ব্যবসাকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা চলছে। কাহুই কালেকটিভের নিজস্ব ডিপার্টমেন্ট স্টোরও এই উদ্যোগের অংশ।
অর্থাৎ, লক্ষ্য শুধু রানওয়েতে পোশাক দেখানো নয়; আদিবাসী ডিজাইনারদের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও সৃজনশীল অবকাঠামো তৈরি করা।

কাহুই কালেকটিভের পাশাপাশি প্যাসিফিক ফিউশনের আয়োজনেও আদিবাসী কারুশিল্পের উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। হাতে বোনা কাপড়, প্রাকৃতিক রং, হারাকেকি ও মুকার মতো ঐতিহ্যবাহী উপাদান সমকালীন পোশাকের সঙ্গে মিশেছে।
তবে এবারের আয়োজনের সৌন্দর্য শুধু ঐতিহ্য ব্যবহারে নয়; বরং ঐতিহ্যকে সমকালীন ফ্যাশনের ভাষায় নতুন করে বলার মধ্যে।

এখানে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প কোনো জাদুঘরের স্মারক হয়ে থাকেনি। তা এসেছে নতুন সিলুয়েট, নতুন নির্মাণ ও নতুন প্রজন্মের পোশাকের মধ্যে। ফলে হেরিটেজ এখানে পোশাকের অলংকার নয়; পোশাক তৈরির ভাষারই অংশ।

আদিবাসী ফ্যাশনের শক্তি এখানেই। একটি পোশাকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভূমি, পরিবার, পূর্বপুরুষ, সংস্কৃতি ও স্মৃতি। ফলে পোশাকটি শুধু শরীরকে ঢেকে রাখে না; বহন করে একটি জনগোষ্ঠীর গল্পও।

এবারের আয়োজনের আরেকটি আবেগঘন মুহূর্ত এসেছে ফিজিয়ান ডিজাইনার মাকাইরা লির প্রথম একক কালেকশন ‘বাই কাই’-এর মাধ্যমে। কালেকশনের নাম—‘হোয়েন আর ইউ কামিং হোম?’, অর্থাৎ ‘কখন বাড়ি ফিরবে?’
নিউজিল্যান্ডে তৈরি এই কালেকশনে লি অনুসন্ধান করেছেন ভিন্ন জায়গা ও মানুষের মধ্যে সেই টানাপোড়েনকে, যেখানে একাধিক জায়গাই একই সঙ্গে ‘বাড়ি’ বলে মনে হতে পারে। তাঁর ফিজিয়ান শিকড়, বর্তমানের জীবন এবং নিজের পরিচয়ের মধ্যে তৈরি হওয়া এই টানাপোড়েন পোশাকে এসেছে মৃদু ও সমকালীন ভাষায়।
ফ্যাশন তখন শুধু শরীর সাজানোর মাধ্যম থাকে না। হয়ে ওঠে স্মৃতি, পরিচয়, বিচ্ছেদ এবং আপন হয়ে থাকার অনুভূতি নিয়ে কথা বলার ভাষা।
তবে এবারের নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন সম্ভবত কোনো রানওয়ে নয়; বরং প্রথমবারের মতো আয়োজিত নিউজিল্যান্ড আদিবাসী ফ্যাশন সিম্পোজিয়াম।
এখানে বাণিজ্য, শিল্পের বিকাশ, মেধাস্বত্ব, ভবিষ্যৎ বাজার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ, আদিবাসী ফ্যাশনকে শুধু ঐতিহ্য বা সংস্কৃতির বিষয় হিসেবে নয়, একটি কার্যকর সৃজনশীল শিল্প এবং অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেও দেখার চেষ্টা হয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন।
কারণ, আদিবাসী ফ্যাশন নিয়ে আলোচনা অনেক সময় ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে আটকে যায়। অথচ একজন আদিবাসী ডিজাইনারের বাস্তব প্রশ্ন আরও অনেক বেশি বিস্তৃত—নিজস্ব মেধাস্বত্ব কীভাবে সুরক্ষিত হবে?

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ কী? স্থানীয় কারুশিল্প কীভাবে টেকসই ব্যবসায় পরিণত হবে? আর আদিবাসী জ্ঞান ও নকশা যেন অন্যের বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত না হয়, সেটি কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে?
নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইক এবার সেই প্রশ্নগুলোকে রানওয়ের বাইরেও আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
আন্তর্জাতিকতা এবার শুধু বাজারের জন্য নয়; বরং এবারের আয়োজনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল আন্তর্জাতিকতার নতুন সংজ্ঞা। অতীতে নিউজিল্যান্ডের ফ্যাশনকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়াই যেখানে বড় লক্ষ্য ছিল, এবার সেই ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারস্পরিক বিনিময়।

কাহুই কালেকটিভের রানওয়েতে তাইওয়ান, আলাস্কা, ফিজি, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ডিজাইনাররা অংশ নিয়েছেন। প্রথম আদিবাসী ফ্যাশন সিম্পোজিয়ামেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সৃজনশীল মানুষ একত্র হয়েছেন।


এখানে আদিবাসী ফ্যাশন আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, আদিবাসী পরিচয় কোনো একটি দেশের একক গল্প নয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর আমেরিকা কিংবা এশিয়া—ভিন্ন ভূগোলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা আলাদা হলেও ভূমি, ঐতিহ্য, পরিচয়, সংস্কৃতি ও মেধাস্বত্বের প্রশ্নে তাদের মধ্যে তৈরি হয় একধরনের গভীর সংযোগ।
নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইক এবার সেই সংযোগকে রানওয়ের ভাষায় দৃশ্যমান করেছে।

অবশ্য এবারের নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইক শুধু আদিবাসী ফ্যাশনকে ঘিরেই আবর্তিত হয়নি; বরং ২৫তম আসরে দেখা গেছে প্রতিষ্ঠিত নাম, নতুন ডিজাইনার এবং পরীক্ষামূলক কাজেরও সমৃদ্ধ উপস্থিতি।
ক্যারেন ওয়াকার অকল্যান্ড আর্ট গ্যালারিতে ৮০ মডেলের একটি ভ্রমণ-ভাবনার শো করেছেন। ক্যাটলিন ক্রিস্প একক প্রধান শো করেছেন রয়্যাল নিউজিল্যান্ড ব্যালের সঙ্গে। টুয়েন্টি-সেভেন নেমস উদ্যাপন করেছে ২০ বছর। অন্যদিকে জুলিয়েট হোগান, ক্যাথরিন উইলসন, টেইলর, জামবেজি এবং ক্লডিয়া লি ছিল শেড টেনের সূচির গুরুত্বপূর্ণ নাম।

ক্যারেন ওয়াকারের শোতে বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও আর্কাইভের পোশাকের পাশাপাশি অ্যাডিডাস ও লিভাইস–এর সঙ্গে তাঁর সহযোগিতার কাজও উঠে এসেছে। অন্যদিকে ক্লডিয়া লি তাঁর নতুন অর্ডার নিয়ে তৈরি ভাস্কর্যধর্মী সিল্কের বিয়ের পোশাক ও বিশেষ অনুষ্ঠানের পোশাক উপস্থাপন করেছেন।
জামবেজির উপকূলঘেঁষা রানওয়েতেও প্রকৃতি ও ফ্যাশনের মেলবন্ধন দেখা গেছে। হালকা টিউল, মেশ ও সিল্কের পোশাকের সঙ্গে ফ্রিঞ্জ ও রাফিয়ার ব্যবহার তৈরি করেছে সমুদ্রঘেঁষা এক স্বপ্নময় আবহ।
একটি ফ্যাশন উইকের সাফল্য শুধু কতগুলো কালেকশন দেখানো হলো, কতজন তারকা সামনের সারিতে বসলেন কিংবা কোন ডিজাইনার কতটা জাঁকজমকপূর্ণ শো করলেন—এসব দিয়ে মাপা যায় না।

২৫তম আসরে নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইকের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত অন্য জায়গায়। এটি ধীরে ধীরে কেবল শিল্পসংশ্লিষ্ট মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ একটি আয়োজন থেকে আরও উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে। সাধারণ দর্শকের জন্য টিকিট, বিক্রয়-আয়োজন, কর্মশালা এবং শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক স্থানের ব্যবহার সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত।

আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক আদিবাসী ফ্যাশন।
কারণ, মাউরি ও প্যাসিফিক ডিজাইনারদের রানওয়ের কেন্দ্রে নিয়ে আসা শুধু প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়। এটি ক্ষমতারও প্রশ্ন—কে নিজের গল্প বলবে, কে নিজের ঐতিহ্যের অর্থ নির্ধারণ করবে, কে সেই ঐতিহ্য থেকে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করবে এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন–ব্যবস্থার মধ্যে নিজের জায়গাটি কীভাবে তৈরি করবে।
এবারের নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইক সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার একটি চেষ্টা করেছে।
২০২৬-এর নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইক তাই শুধু ২৫ বছরের একটি উৎসব নয়। এটি যেন একটি ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানের নিজের পরিচয় নতুন করে ভাবার মুহূর্ত।
এখানে ঐতিহ্য আছে, কিন্তু শুধুই নস্টালজিয়া নেই। আদিবাসী পরিচয় আছে, কিন্তু তা কোনো আলংকারিক উপাদান হয়ে নেই। আন্তর্জাতিকতা আছে, কিন্তু তা কেবল বিদেশি বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়।

আর ফ্যাশন আছে—কিন্তু ফ্যাশনকে শুধু পোশাকের মধ্যে আটকে রাখা হয়নি।
কাহুই কালেকটিভের রানওয়ে থেকে মাকাইরা লির ‘কখন বাড়ি ফিরবে?’—দুই প্রান্তের গল্প শেষ পর্যন্ত এসে মেশে একই জায়গায়: আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, আর আমার গল্পটি আমি নিজেই কীভাবে বলব?

সম্ভবত এটাই ২০২৬-এর নিউজিল্যান্ড ফ্যাশন উইকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। রানওয়ে বদলেছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, রানওয়ের গল্প বলার অধিকারটিও বদলাতে শুরু করেছে।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম