
জর্জিও আরমানির চলে যাওয়া মানেই কি আরমানি প্রিভের বদলে যাওয়া? মনে হয় না। আর সেই স্টেটমেন্টকে এই লাক্সারি ব্র্যান্ড জোরালোভাবেই তুলে ধরেছে প্যারিসে সদ্য প্রদর্শিত স্প্রিং সামার কতুর কালেকশনের মাধ্যমে। গত বছর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যু হয় জর্জিও আরমানির। তবে এই ইটালিয়ান ফ্যাশন কিংবদন্তির প্রাণের চেয়ে প্রিয় ব্র্যান্ড তার আরমানি প্রিভে দিয়ে ধরে রেখেছে তাঁর লেগ্যাসি।

আরমানি প্রিভে শো: মাস্টারের উত্তরাধিকারে অবিচল
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে প্যারিসের রু ফ্রঁসোয়া প্রিমিয়ারের রাজকীয় পালাজ্জো আরমানির ভেতরে জড়ো হয়েছিলেন ইটালিয়ান লাক্সারি ফ্যাশন হাউস আরমানির ঘনিষ্ঠ মহল। সেখানেই উপস্থাপিত হয় এক পরিমিত আভিজাত্যে ভরা কতুর সংগ্রহ। এটি আসলে ছিল একটি প্রতীকী আয়োজন। আর ডিজাইনারের ডেব্যু একক কালেকশন। সেই ডিজাইনার আর কেউ নন। তিনি আরমানির ভাতিজি সিলভানা।
ফ্যাশনের ইটালিয়ান কিংবদন্তির অনুপস্থিতিতে প্রথম আর্মানি প্রিভে শো
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে, প্যারিস কতুর উইকের তৃতীয় দিনে ক্যাটওয়াকে একা দাঁড়ান জর্জিও আরমানির ভাতিজি ও চার দশকের বেশি সময়ের সহকর্মী সিলভানা আরমানি। এ বছরের কতুর উইকে ডিওর ও শ্যানেলের বর্ণাঢ্য শোয়ে অনেক নতুন সূচনার দেখা মিললেও আরমানির ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল আবেগপ্রধান। জর্জিও আর আমাদের মাঝে না থাকলেও, তাঁর উত্তরাধিকার যেন পুরো কালেকশনে আগের চেয়েও শক্তিশালীভাবে উপস্থিত। আরমানিকে মিস করার কোনো অবকাশই দেন নি সিলভানা।



জেড নামের এই স্প্রিং-সামার ২০২৬ সংগ্রহটির নামকরণ করা হয়েছে সবুজ এই প্রেশাস স্টোনের নামে, যা সুরক্ষা ও প্রশান্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
সংগ্রহটি সংযমী। কোথাও কোনো বাহুল্য বা আধিক্য চোখে পড়েনা। সবুজের চোখজুড়ানো সব প্যাস্টেল শেডের অনন্য সৌন্দর্যে ভরপুর বেশ কিছু পোশাক। নরম এই প্যাস্টেল রঙের ধাপে ধাপে ব্যবহারের মাঝে মাঝেই উঠে এসেছে কালো পোশাক।


এই কালো শোকের কালো। আরমানিকে মিস করার কালো। শ্রদ্ধাভরা ট্রিবিউটের গাম্ভীর্যে টইটম্বুর কালো। আর সবচেয়ে বড় কথা এই কালোই ছিল জর্জিও আরমানির প্রিয় সিগনেচার রং। আরমানি হাউসের চিরাচরিত রীতির বাইরে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল সবসময়ের মতো নজরকাড়া সব অ্যাকসেসরির প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। বিশেষ করে সেই টুপিগুলোকে খুব মিস করেছি, যা আরমানির খুব প্রিয় ছিল আর সব সংগ্রহেই চেরি টপিং হয়ে থাকত সব পোশাকের সঙ্গে।
আর্মানি প্রিভে মানেই অতিরঞ্জন বা জাঁকজমক এড়ানো আভিজাত্য। কোয়ায়েট লাক্সারির কথা এখন ডিজাইনার ও ফ্যাশনপ্রেমী মানুশের মুখে মুখে শোনা যায়। অথচ সেই ধারনাটি নিজের মধ্যে বহু বছর ধরে ধারণ করে এসেছিলেন জর্জিও।


বহুদিন তাঁর সঙ্গে ও হাতে হাতে কাজ করা সহকর্মী সিলভানা সেই চ্যালেঞ্জ কিন্তু তাঁর এই সোলো কালেকশনে নিপুণভাবে সামলেছেন। সেই সঙ্গে গৌরবময় ও কিছুটা অনমনীয় আরমানি ঐতিহ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের দিকে কিছুটা ফ্লুইড ট্রানজিশনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এবার কি একটু বেশিই সতর্ক থেকেছেন সিলভানা জর্জিওর ঠিক করে যাওয়া ব্লু প্রিন্ট ধরেই হাঁটার বিষয়ে? হয় তো সামনের সংগ্রহগুলোতে আমরা তাঁর নিজস্বতাকে আরও বেশি করে আবিষ্কার করতে পারব।


কেমন ছিল এবারের সংগ্রহের কাট, প্যাটার্ন ও ডিটেইলস
স্যাটিন কাপড়ের ড্রেপিং, স্বচ্ছ মাইক্রো-ক্রিস্টালে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি করা বডিস, সিল্ক কেপ চোখে পড়েছে। সব মিলিয়ে ফ্লুইড লাইন, স্ট্রেট কাট আর ঝলমলে ইভনিং গাউনে সুসজ্জিত এই স্প্রিং-সামার ২০২৬ সংগ্রহ আমাদের পুরোপুরি জর্জিও আরমানির জগতে ডুবিয়ে দিয়েছে।
পুরুষ ও নারীর পোশাকশৈলীর মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে। ড্যান্ডি কালচারের ফিউশন ড্যাপার স্টাইল অনুপ্রাণিত স্যুটের লুকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্গানজা টাই। আর্মানির নারীচরিত্র আগের মতোই ক্ষীণকায়া, স্থির ও সংযত। এখানে বডি পজিটিভিটির বিতর্ক টানা অবশ্য অবান্তর। আরমানির রেখে যাওয়া রিলে নিয়ে রেসে ছুটেছেন সিলভানা খুব নিরীক্ষায় না গিয়ে। আর তাই আধুনিক হলেও এই কালেকশন নীরব,পরিশীলিত এক আভিজাত্যের প্রতিচ্ছবি।


১৯৫০-এর দশক থেকে চলে আসা কতুর রীতির ধারাবাহিকতায় আরমানির এই স্মৃতিভারাক্রান্ত শোটি শেষ হয় এক নস্টালজিক মুহূর্ত দিয়ে। আর তা একটি রাজকীয় বিয়ের গাউন প্রদর্শনের মাধ্যমে। প্রথমবারের মতো উন্মোচিত এই পোশাকটি নাকি জর্জিও আর্মানি নিজেই ডিজাইন করেছিলেন। কিন্তু কেন যেন উন্মোচিত হয় নি এই ব্রেথ টেকিং ফ্যাশন মেমোরিয়ালটির।

এটি যেন এক শক্তিশালী বার্তা। আর তা হলো, মহান এই ফ্যাশন ডিজাইনারের অদৃশ্য অথচ চিরস্থায়ী উপস্থিতি থাকবেই আরমানি প্রিভের রানওয়েতে, কাল থেকে কালান্তরে।
সূত্র: নিউমেরো
ছবি: ইন্সটাগ্রাম