হাজারো মানুষকে ছুঁয়ে যাওয়া দিশার জীবন যে কারণে তাঁর মৃত্যুর চেয়ে বড়
শেয়ার করুন
ফলো করুন

হাল ফ্যাশন ডেস্ক

সায়কা শাহরিন দিশা। চল্লিশ পেরিয়েছেন মাত্র। বহু আরাধ্য সন্তান জন্মদানের সময় হার্ট অ্যাটাক করে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে তাঁর গত পরশুদিন ১ নভেম্বর রোববার। আজ ৩ নভেম্বর তাঁর জন্মদিন।

সায়কা শাহরিন দিশা আর আমাদের মাঝে নেই। আজ তাঁর জন্মদিন
সায়কা শাহরিন দিশা আর আমাদের মাঝে নেই। আজ তাঁর জন্মদিন

অত্যন্ত মেধাবী ও সৃজনশীল ফ্যাশন উদ্যোক্তা সায়কা শাহরিন দিশার মৃত্যুতে দেশের ফ্যাশন, ভ্রমণ, অ্যাক্টিভিজিম, লেখালেখি ও সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক বিভিন্ন কমিউনিটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হলো, হাজারো মানুষকে ছুঁয়ে যাওয়া দিশার জীবন তাঁর মৃত্যুর চেয়েও বড়। কারণ এই ক্ষুদ্র জীবনকালে জীবনটাকে দিশা সত্যিকার অর্থেই বেঁচেছেন পুরোপুরি।

বিজ্ঞাপন

এইযে আজ দিশা নেই বলে এত এত মানুষ এতটা শোকাহত, তাঁর জন্য উপচে পড়া ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে, তার কারণ দিশা নিজেই।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও সোচ্চার অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে তাঁকে অনেকেই চেনেন
অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও সোচ্চার অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে তাঁকে অনেকেই চেনেন

তাঁকে কোনো একটি বিশেষ পরিচয়ের সীমায় বাঁধা অসম্ভব। ব্লগ জগতে ও সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি ও বিভিন্ন সমকালীন ইস্যুতে নিজের মতামত তুলে ধরার সুবাদে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও সোচ্চার অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে তাঁকে অনেকেই চেনেন।

বিজ্ঞাপন

ভ্রমণ ছিল তাঁর প্যাশন। অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে যেতে পারার তৃপ্তি প্রকাশ করেছিলেন ফেসবুকের পোস্টে। মৃত্যুর আগের দিনও আগের ভ্রমণের গল্প ও ছবি শেয়ার করেছিলেন সবার সঙ্গে। দেশে তো বটেই বিভিন্ন দেশের বহু জায়গায় চ্যালেঞ্জিং সব ট্র্যাভেল অভিজ্ঞতা আছে তাঁর।

অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে যেতে পারার তৃপ্তি প্রকাশ করেছিলেন ফেসবুকের পোস্টে
অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে যেতে পারার তৃপ্তি প্রকাশ করেছিলেন ফেসবুকের পোস্টে

পশুপ্রেম দিশার আরেক প্যাশন। নিজে বিড়াল পুষে আসছেন পরম মমতায়। আর সেই সঙ্গে জগতের সকল পশুপাখির জন্য তাঁর প্রবল মায়া। পশুপাখিদের প্রতি সহিংসতা নিয়ে সোচ্চার ছিলেন তিনি। তাঁর সৃজনে বিড়ালের উপস্থিতি অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল নানাভাবে।

সৃজনশীলতার বিষয়ে সায়কা শাহরিন দিশার বৈচিত্র্য ও রেঞ্জ আসলেই বিস্ময়কর। এক সময় মেহেদি আর্টিস্ট হিসেবে জয় করেছেন বহু মানুষের হৃদয়, হয়ে উঠেছিলেন সুপরিচিত। আর 'রঙের মানুষ' থিমে তাঁর দিশাজ রোডব্লক নামের উদ্যোগটি যেন সৃজনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ।

দিশাজ রোডব্লক নামের উদ্যোগটি যেন সৃজনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ
দিশাজ রোডব্লক নামের উদ্যোগটি যেন সৃজনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ

সেই প্রায় দুই দশক ধরে তিনি এই উদ্যোগের একমাত্র ডিজাইনার। আর তাঁর সকল ডিজাইন অত্যন্ত ইউনিক। হাল ফ্যাশনে বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাজের নিদর্শন দেখা গিয়েছে। একেবারে ব্যতিক্রমী সব ব্লকের স্রষ্টা তিনি।

একেবারে ব্যতিক্রমী সব ব্লকের স্রষ্টা তিনি
একেবারে ব্যতিক্রমী সব ব্লকের স্রষ্টা তিনি

আর সেই ডিজাইন উঠে এসেছে তাঁর বানানো শাড়ি, পর্দা, বিছানার চাদর, কুর্তি, শাল, শার্ট, পাঞ্জাবি, কামিজ আর গজ কাপড়ে। তুলির আঁচড়েও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর করা গ্লাস পেইন্টের সমাহার মুগ্ধ করার মতো। এঁকেছেন জিনসে আর অন্যান্য পোশাকেও।

২০২৩ সালে নিউ মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাঁর বহু কাঠের ব্লক পুড়ে ছাই হয়ে যায়। হয়ে যায় বিশাল আর্থিক ক্ষতি। আর এত সব ইউনিক ব্লক হারিয়ে ফেললে অন্য যে কেউ ভেঙে পড়ত পুরোপুরি। কিন্তু দিশা সেখান থেকে উঠে এসেছেন ফিনিক্স পাখির মতো।

নিজের সিগনেচার ব্লক ও নতুন শুরু করা ডিজিটাল প্রিন্টের পোশাক নিয়ে ফিরে আসেন তিনি
নিজের সিগনেচার ব্লক ও নতুন শুরু করা ডিজিটাল প্রিন্টের পোশাক নিয়ে ফিরে আসেন তিনি

আবার নিজের সিগনেচার ব্লক ও নতুন শুরু করা ডিজিটাল প্রিন্টের পোশাক নিয়ে ফিরে আসেন তিনি। এর আগে হলুদের গয়না থেকে শুরু করে বুক ব্যাগের মতো নানা ফ্যাশন পণ্যে নিজের সিগনেচার স্টাইল জুড়ে দিয়ে নজর কেড়েছেন তিনি।

সহউদ্যোক্তাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। যেকোনও মেলা বা ইভেন্টে অত্যন্ত প্রাণবন্ত উপস্থিতি দেখা যেত তাঁর। হাল ফ্যাশনের মেলাসহ নানা গেট টুগেদারে দিশা ছিলেন উজ্জ্বল হয়ে।

হাল ফ্যাশনের মেলাসহ নানা গেট টুগেদারে দিশা ছিলেন উজ্জ্বল হয়ে
হাল ফ্যাশনের মেলাসহ নানা গেট টুগেদারে দিশা ছিলেন উজ্জ্বল হয়ে

আর তার চেয়েও বড় কথা, মানুষের প্রতি দিশার মমত্ববোধ ছিল সীমাহীন। কার কখন কী প্রয়োজন, কার কী বিপদ হয়েছে সবকিছুর খেয়াল রাখতেন দিশা।

ক্যান্সার আক্রান্তদের জন্য নিজের চুল ডোনেট করেছেন তিনি
ক্যান্সার আক্রান্তদের জন্য নিজের চুল ডোনেট করেছেন তিনি

কারও জরুরি রক্তের সন্ধান দেওয়া বা মেন্টাল হেলথ সাপোর্ট এমনকী কোথায় কী পাওয়া যায় সেই তথ্য দিয়ে ও নিজে উপস্থিত হয়েও সবার উপকার করতেন তিনি। কোভিডের পর ক্যান্সার আক্রান্তদের জন্য নিজের চুল ডোনেট করেছেন তিনি।

শিশুদের প্রতি দিশার ভালোবাসা ছিল অকপট, স্পষ্ট আর অসীম। আর নিজের শিশুসন্তানটিকেই দেখতে পেলেন না এই মমতায় ভরা মানুষটি।

দিশার জীবন তাঁর মৃত্যুর চেয়েও বড়
দিশার জীবন তাঁর মৃত্যুর চেয়েও বড়

তার আগেই চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। তারপরেও বলতে হয়। দিশার জীবন তাঁর মৃত্যুর চেয়েও বড়। এই ছোট জীবনে তিনি অসংখ্য মানুষকে ছুঁয়ে গিয়েছেন, তাঁদের জীবনের অংশ হয়েছেন আর তাঁদের স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছেন চিরকালের জন্য।

ছবি: ফেসবুক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬: ১৫
বিজ্ঞাপন