
ফ্যাশন দুনিয়ায় খুব কম ডিজাইনারই আছেন, যাদের নামের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোন রং চিরকালের জন্য জড়িয়ে যায়। বিখ্যাত ইতালিয়ান ডিজাইনার ভ্যালেন্তিনো গারাভানি সেই বিরল ডিজাইনারদের একজন, যিনি তাঁর ‘ভ্যালেন্তিনো রেড’ দিয়ে ফ্যাশনের ইতিহাসে স্বতন্ত্র ছাপ ফেলেছেন। প্যানটোনে নিজের নামে একটি রং থাকা ভ্যালেন্তিনোর সৃজনশীল উত্তরাধিকারেরই প্রমাণ। ভ্যালেন্তিনো নিজেই বলেছিলেন, ‘একজন নারীকে যখন সুন্দর লাল ইভনিং ড্রেসে দেখা যায়, সেটা সত্যিই বিশেষ কিছু।’

একটি মাত্র ড্রেস দিয়েই ফ্যাশনের ইতিহাসে লালের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়; যা পরবর্তী দশকগুলোতে ভ্যালেন্তিনোর পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ১৯৫৯ সাল। ভ্যালেন্তিনো ডিজাইন করেন প্রথম লাল ড্রেসটি। স্ট্র্যাপলেস ককটেল ড্রেস।

সেটা ছিল ফিয়েস্তা শিরোনামের স্প্রিং/সামার কালেকশন। সেই সংগ্রহে ছিল এই ড্রেস। সেটা প্রদর্শন করা হয় প্যারিস ফ্যাশন উইকে। ক্রমেই তিনি প্রেমে পড়ে যান এই লাল রংয়ের। পরবর্তীতে সারা বিশ্বই অনুরাগী হয়ে ওঠে এই লালের। ফলে ভ্যালেন্তিনোর এই লাল স্থান করে নেয় অফিশিয়াল প্যান্টোন কালার চার্টে। শতভাগ ম্যাজেন্টা, শতভাগ হলুদ আর ১০ ভাগ কালোর নিখুঁত মিশ্রণে তৈরি 'ভ্যালেন্তিনো রেড'।
কিন্তু কীভাবে ভ্যালেন্টিনোর জীবনে আসে এই লাল? এ নিয়ে আছে একাধিক গল্প; যা মুগ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। তরুণ ভ্যালেন্তিনো একবার স্পেনের বার্সেলোনার এক অপেরা হাউসে জর্জ বিজের ‘কারমেন’ উপভোগ করতে গিয়েছিলেন। বলা হয়, মঞ্চে লাল পোশাকে শিল্পীদের দৃঢ় উপস্থিতি তাঁকে মুগ্ধ করে। সেই মুহূর্তে তিনি অনুভব করেছিলেন— লালের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত শক্তি, অনন্য আবেগ। আবার এও শোনা যায়, তিনি একদিন এক বৃদ্ধাকে দেখেছিলেন ধূসর চুল আর লাল ভেলভেটের পোশাকে। ভ্যালেন্তিনো খেয়াল করেছিলেন, অন্যান্য মহিলাদের মধ্যে তিনি একেবারে আলাদা। স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।

ভ্যালেন্তিনোর কাছে ফ্যাশন মানে নারীদের সুন্দর করে তোলা। তিনি ভাবতেন লাল মানে কেবলই পোশাক নয়, নারীকে আলোকিত করার শক্তিশালী ভাষাও। ট্রেন্ডের পেছনে দৌড়ানো নয়, বরং এমন পোশাক তৈরি করা, যা সময়ের সীমা পেরিয়ে টিকে থাকে। এই দর্শন থেকেই জন্ম নেয় তাঁর সব স্বাক্ষরশৈলী; এসবই কার্ল লাগারফেল্ড বা ইভ সাঁ লোঁর যুগ পেরিয়েও নিজের অবস্থান অটুট রেখেছে। সময়ের সঙ্গে, ভ্যালেন্টিনো রেড ছাড়িয়েছে সীমা।
১৯৩২ সালে ইতালির ভোগেরা শহরে জন্ম নেওয়া ভ্যালেন্তিনো ক্লেমেন্তে লুদোভিকো ছোটবেলা থেকেই ফ্যাশনের স্বপ্ন দেখতেন। মিলানের সান্তা মার্তা ইনস্টিটিউটে ফ্যাশন ড্রয়িংয়ের পাঠ শেষে প্যারিসে গিয়ে কঠোর কতুর প্রশিক্ষণ নেন। জঁ দেসেস ও গাই লারোশের মতো হাউসে কাজ করে ১৯৫৯ সালে ইতালিতে নিজের ফ্যাশন হাউস প্রতিষ্ঠা করেন।

শুরুর দিকের কাজ ছিল ফরাসি প্রভাবিত, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভ্যালেন্তিনোর শেকড়ের সৌরভ- ইতালিয়ান আমেজ। তাঁর ডিজাইনের বিশেষত্ব ছিল ইতালিয়ান ফ্যাশনের সাহসী রং ও আবেগের সঙ্গে ফরাসি ওত্ কতুরের সূক্ষ্ম কারিগরি ও শৃঙ্খলার নিখুঁত মেলবন্ধন। এই দুই ধারার সংমিশ্রণ থেকেই জন্ম নেয় ভ্যালেন্তিনোর সিগনেচার সিলুয়েট— সংযত, পরিমিত, অথচ গভীরভাবে প্রভাবশালী।


বিশ্বমঞ্চে ভ্যালেন্তিনোর উত্থান ছিল ধীর, কিন্তু দৃঢ়। এলিজাবেথ টেলরের মতো তারকাদের পোশাক পরানো, ১৯৬২ সালে ফ্লোরেন্সের পিত্তি প্যালেসে প্রথম শো, কিংবা ১৯৬৮ সালের ঐতিহাসিক ‘হোয়াইট কালেকশন’— সবমিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন অভিজাত সমাজ ও সেলিব্রিটিদের প্রিয় ডিজাইনার। তাঁর পোশাকের দাম ছিল আকাশছোঁয়া, কিন্তু তা ছিল মর্যাদার প্রতীক।
তবে ভ্যালেন্তিনোর নামের সঙ্গে যে বিষয়টি চিরকালের জন্য জড়িয়ে গেছে, তা হলো ' ভ্যালিন্তিনো রেড'। পরবর্তী দশকগুলোতে এই লাল হয়ে ওঠে তাঁর সৃজনশীলতার উত্তরাধিকার। প্যানটোনে নিজের নামে একটি রং থাকা এই প্রভাবেরই স্বীকৃতি।



জ্যাকি কেনেডি থেকে অড্রে হেপবার্ন, জুলিয়া রবার্টস, অ্যান হ্যাথাওয়ে থেকে জ্যেনিফার অ্যানিস্টন— অসংখ্য আইকনিক নারী এই লালে রাঙিয়েছেন নিজেদের;খুঁজে পেয়েছেন নিজের সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী রূপ।


সমালোচনা এসেছে, বিতর্কও। কিন্তু বাধা হতে পারেনি বলেই সময়ের সঙ্গে ভ্যালেন্তিনো হাউস বদলেছে; সৌন্দর্যের সংজ্ঞা হয়ে উঠেছে আরও বিস্তৃত। অবশ্য একটিই বিষয় অটল থেকে গেছে— লালের সরব আধিপত্য। ভ্যালেন্তিনোর প্রতিটি লাইনে তা সে ভ্যালেন্তিনোই হোক বা ভ্যালেন্তিনো গারাভানি কিংবা ভ্যালেন্তিনো রেড— লাল পোশাকের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়াটাই নিয়ম।

২০০৮ সালের স্প্রিং ও কতুর উইকে ভ্যালেন্তিনোর শেষ কালেকশন সম্পূর্ণ লাল ড্রেসে সাজানো হয়েছিল। পরবর্তী ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টররা এই ঐতিহ্যকে সম্মানের সঙ্গে এগিয়ে নিয়েছেন। ২০২২ সালে পিচিওলির ফল কতুর কালেকশনে সেই ঐতিহাসিক ‘ফিয়েস্তা’ ফিরে আসে। এই পুনরাবৃত্তি ভ্যালেন্তিনো রেডের মাহাত্ম্যকে আরও দৃঢ়তর করে।

ভ্যালেন্তিনো গারাভানি চলে গেলেও ভ্যালেন্তিনো রেড অমলিন থাকে যাবে। প্রতিটি লাল ড্রেসে, প্রতিটি নিখুঁত কাটে, প্রতিটি সংযত অথচ দৃঢ় উপস্থিতিতে বেঁচে থাকবে তাঁর দর্শন। ফ্যাশন ইতিহাসে লাল রং যখনই কথা বলবে, সেখানে ভ্যালেন্তিনোর নাম উচ্চারিত হবে বারবার।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম