ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের প্যাকেটের পোশাকে বলিউডের খেয়ালি ফ্যাশনিস্তা আর মায়াময়ী মায়ের গল্প
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ফ্যাশনের সৌন্দর্য কি শুধু দামি কাপড়, নিখুঁত কাটিং আর ঝলমলে নকশায়? কালকি কোয়েচলিনের সাম্প্রতিক এক লুক যেন চেনা এই ধারণাকেই নতুন করে ভাবতে শেখায়। সাদা, স্বচ্ছ ও জালের মতো বুননে তৈরি অভিনব এক পোশাকে সম্প্রতি দেখা গেছে বলিউডের এই অভিনেত্রীকে। খেয়ালি ফ্যাশনিস্তা তিনি বিটাউনের।

নাসিব সিহাগের এই পোশাকে শুট করছেন কালকি
নাসিব সিহাগের এই পোশাকে শুট করছেন কালকি
সেই সঙ্গে এই পোশাকটি পরে একে বিশেষ করে তুলেছেন নাসিবের মা
সেই সঙ্গে এই পোশাকটি পরে একে বিশেষ করে তুলেছেন নাসিবের মা

তবে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে এই শ্বেতশুভ্র পোশাকটি পরেছেন এক মমতাময়ী ও ত্যাগী মা। প্রথম দেখায় পোশাকটির বুনন নজর কাড়লেও এর গল্প আরও বেশি আকর্ষণীয়। কারণ, পোশাকটি তৈরি হয়েছে ফেলে দেওয়া ছোট ছোট সাদা পলিথিনের প্যাকেট দিয়ে।

বিজ্ঞাপন

ফরাসি নাগরিক হলেও ভারতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা কালকি কোয়েচলিন। ছোটবেলা থেকেই থিয়েটারের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। পরে লন্ডনের গোল্ডস্মিথস বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক নিয়ে পড়াশোনা করেন। অভিনয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁকে নিয়ে আসে হিন্দি চলচ্চিত্রে। তবে শুধু অভিনয়েই নিজেকে আটকে রাখেননি কালকি। লেখালেখি ও প্রযোজনাতেও দেখিয়েছেন সৃজনশীলতার পরিচয়। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কারসহ পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা।

কোনো কিছুই তাঁর আত্মবিশ্বাসকে থামাতে পারেনি
কোনো কিছুই তাঁর আত্মবিশ্বাসকে থামাতে পারেনি

বলিউডে কালকির যাত্রা কখনোই খুব গতানুগতিক ছিল না। প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণা কিংবা চেনা চরিত্রের বাইরে গিয়ে কাজ করতেই তাঁকে বেশি দেখা গেছে। ব্যক্তিগত ও পেশাজীবনেও পেরোতে হয়েছে নানা চড়াই-উতরাই। কাস্টিং কাউচের অভিজ্ঞতা থেকে বিবাহবিচ্ছেদ—জীবনের কঠিন সময়গুলোও নিজের মতো করে সামলে নিয়েছেন তিনি। চেহারা ও শারীরিক গড়ন নিয়েও শুনতে হয়েছে নানা কটাক্ষ। তবে কোনো কিছুই তাঁর আত্মবিশ্বাসকে থামাতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে আরও স্বাধীন ও স্পষ্টবাদী হয়ে উঠেছেন কালকি।

কালকির ফ্যাশনবোধও তাঁর ব্যক্তিত্বের মতোই—স্বাধীন, সাহসী ও বাঁধনহীন
কালকির ফ্যাশনবোধও তাঁর ব্যক্তিত্বের মতোই—স্বাধীন, সাহসী ও বাঁধনহীন

ব্যক্তিগত জীবনেও এখন বেশ ইতিবাচক সময় কাটাচ্ছেন এই অভিনেত্রী। ছোট্ট মেয়ে ও সঙ্গীকে নিয়ে জীবনে এসেছে অন্য রকম প্রশান্তি। অভিনয়ের ব্যস্ততার বাইরে যোগব্যায়াম, ভ্রমণ আর নিজের মতো করে সময় কাটাতেই স্বচ্ছন্দ তিনি। কালকির ফ্যাশনবোধও তাঁর ব্যক্তিত্বের মতোই; স্বাধীন, সাহসী ও বাঁধনহীন। কখনো অপ্রচলিত পোশাকে, কখনো একেবারে সাদামাটা সাজে, আবার কখনো শিল্পের সঙ্গে ফ্যাশনের মেলবন্ধনে নিজেকে উপস্থাপন করেন তিনি। তাই তাঁর পোশাক শুধু সাজের অংশ হয়ে থাকে না, অনেক সময় হয়ে ওঠে শক্তিশালী এক ভাষা। সাদা এই পোশাকটিও তেমনই একটি গল্প বলে।

বিজ্ঞাপন

পোশাকটি তৈরি করেছেন ডিজাইনার নাসিব। ছোটবেলা থেকেই মা ও তিনি নানা ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে নিজেদের মতো করে কিছু তৈরি করতে ভালোবাসতেন। ঘরের অপ্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে শৈশবে তৈরি করা সেই ছোট ছোট জিনিসই পরে নাসিবের ডিজাইনের ভাবনায় রূপ নেয়। ছোট ছোট সাদা পলিথিনের প্যাকেট হাতে বুনে তৈরি করা হয়েছে পুরো পোশাকটি। ফলে দূর থেকে এটি অনেকটা হাতে বোনা সাদা কাপড়ের মতো দেখায়। কাছে গেলে অবশ্য ধরা পড়ে এর অভিনব উপাদান।

র থেকে এটি অনেকটা হাতে বোনা সাদা কাপড়ের মতো দেখায়
র থেকে এটি অনেকটা হাতে বোনা সাদা কাপড়ের মতো দেখায়

তবে পোশাকটির নেপথ্যের গল্প আরও আবেগময়। নাসিবের মা সুনীতা সিহাগ একজন বিধবা। স্বামীকে হারানোর পর জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি সাদামাটা, হালকা রঙের পোশাকেই থেকেছেন। মায়ের সেই সাদাকেই একটু অন্যভাবে উদ্যাপন করতে চেয়েছিলেন নাসিব। তাই তৈরি করেন এই বিশেষ পোশাক।

কোনো প্রচারণা, ফ্যাশন শো কিংবা বাণিজ্যিক আয়োজনের জন্য নয়; মাকে উপহার দেওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছিল পোশাকটি। নাসিবের কাছে এটি মায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং মাতৃত্বের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য।

নাসিবের কাছে এটি মায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং মাতৃত্বের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য
নাসিবের কাছে এটি মায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং মাতৃত্বের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য


নাসিবের কাছে এই পোশাকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশবের গভীর স্মৃতিও। তাঁর ভাষায়, পৃথিবীতে তাঁর অস্তিত্বের শুরুই মাকে দিয়ে। ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে ঘরের ফেলে দেওয়া নানা উপকরণ দিয়ে নানা রকম জিনিস বানাতেন তাঁরা। তখন হয়তো জানতেন না, সেই ছোট ছোট সৃষ্টিই একদিন এমন পোশাক তৈরির অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে, যা মানুষের প্রশংসা কুড়াবে।

মায়ের কাছ থেকেই সংবেদনশীলতা, ভালোবাসা ও সৃজনশীলতার বড় অংশ পেয়েছেন বলেও মনে করেন নাসিব। ফলে পোশাকটি তাঁর কাছে শুধু একটি নকশা নয়, মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া শৈশবের স্মৃতিরও এক ধরনের পুনর্নির্মাণ।

বিগুলোর একটিতে দেখা যায় একটি আলমারি, যা নাসিবের মা তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন
বিগুলোর একটিতে দেখা যায় একটি আলমারি, যা নাসিবের মা তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন

এই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি আবেগময় স্মৃতি। ছবিগুলোর একটিতে দেখা যায় একটি আলমারি, যা নাসিবের মা তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। যেদিন তাঁর নানা মারা যান, সেদিনই ছবিটি তোলা হয়েছিল। নাসিবের বিশ্বাস, প্রিয় মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও ওপর থেকে আপনজনদের দেখে যান। তাই হয়তো তাঁর নানাও সেদিন দেখছিলেন তাঁর মেয়েকে—যিনি জীবনের নানা কঠিনতার মধ্যেও নিজের অস্তিত্বকে নতুন অর্থে সাজিয়ে চলেছেন।

নাসিবের মতে, পুরো আয়োজনটি আসলে ফ্যাশনকে ঘিরে নয়; বরং তাঁর মা সুনীতা সিহাগকে ঘিরে। তাঁকে অন্য কারও মতো করে সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়নি। বরং একজন মা, একজন বিধবা, একজন নারী এবং ভালোবাসায় ভরা একটি পরিবারের কেন্দ্র হিসেবে তাঁকে তাঁর নিজের রূপেই তুলে ধরা হয়েছে।

ছবিগুলোও তোলা হয়েছে তাঁর নিজের বাড়িতে, সেই পরিচিত পরিবেশে, যেখানে প্রতিদিনের জীবন কাটে
ছবিগুলোও তোলা হয়েছে তাঁর নিজের বাড়িতে, সেই পরিচিত পরিবেশে, যেখানে প্রতিদিনের জীবন কাটে

ছবিগুলোও তোলা হয়েছে তাঁর নিজের বাড়িতে, সেই পরিচিত পরিবেশে, যেখানে প্রতিদিনের জীবন কাটে। অর্থাৎ এখানে জাঁকজমকপূর্ণ কোনো স্টুডিও সেটের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে স্মৃতি ও আপন পরিবেশ।

সেই আবেগময় গল্পের পোশাকটিই এবার নতুন এক অধ্যায় পেল কালকি কোয়েচলিনের লুকে। পোশাকটি প্রথমে স্টুডিওতে ফ্যাশন ফটোশুটের জন্য পরেছিলেন কালকি। পরে মেকআপ তুলে প্রকৃতির মধ্যে, বৃষ্টির আবহে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি।

পোশাকটি প্রথমে স্টুডিওতে ফ্যাশন ফটোশুটের জন্য পরেছিলেন কালকি
পোশাকটি প্রথমে স্টুডিওতে ফ্যাশন ফটোশুটের জন্য পরেছিলেন কালকি
ছবিগুলোতে তৈরি হয়েছে এক কোমল অথচ স্ট্রং ভাইব
ছবিগুলোতে তৈরি হয়েছে এক কোমল অথচ স্ট্রং ভাইব

ভেজা প্রকৃতি, বাতাসে উড়তে থাকা চুল আর শরীরজুড়ে সাদা পলিথিনের বোনা পোশাক; সব মিলিয়ে ছবিগুলোতে তৈরি হয়েছে এক কোমল অথচ স্ট্রং ভাইব।

পোশাকটির নকশাতেও রয়েছে বেশ কিছু অভিনবত্ব। শরীরের ওপরের অংশে চওড়া, ভাঁজ করা কলারের মতো কাঠামো, যা কাঁধ ও গলার চারপাশে তৈরি করেছে নাটকীয় আবহ। নিচের অংশে বিস্তৃত স্কার্টের মতো কাঠামো পোশাকটিকে দিয়েছে ভাস্কর্যের মতো অবয়ব। কোথাও ঘন বুনন, কোথাও ফাঁকা জালের মতো নকশা—উপাদানটি যে সাধারণ পলিথিন, তা যেন বিশ্বাসই করতে ইচ্ছে করে না।

কালকি শুধু পোশাকটি পরেননি, ধারণ করেছেন এর গল্পটিকেও
কালকি শুধু পোশাকটি পরেননি, ধারণ করেছেন এর গল্পটিকেও

এই লুকের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই। কালকি শুধু পোশাকটি পরেননি, ধারণ করেছেন এর গল্পটিকেও। একজন মায়ের জন্য তৈরি পোশাক, শৈশবের সৃজনশীল স্মৃতি, ফেলে দেওয়া উপকরণের নতুন ব্যবহার, একজন ডিজাইনারের মায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং একজন অভিনেত্রীর স্বাধীন ফ্যাশনদৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছু একসঙ্গে মিশেছে এই সাদা পোশাকে।

সবকিছু একসঙ্গে মিশেছে এই সাদা পোশাকে
সবকিছু একসঙ্গে মিশেছে এই সাদা পোশাকে
কালকি কোয়েচলিন বরাবরই দেখিয়েছেন, ফ্যাশন মানেই নিয়ম মেনে চলা নয়
কালকি কোয়েচলিন বরাবরই দেখিয়েছেন, ফ্যাশন মানেই নিয়ম মেনে চলা নয়

কালকি কোয়েচলিন বরাবরই দেখিয়েছেন, ফ্যাশন মানেই নিয়ম মেনে চলা নয়। নিজের মতো করে ভাবা, প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা এবং পোশাকের মধ্য দিয়েও গল্প বলা—সেটিই হতে পারে সত্যিকারের স্টাইল। পলিথিনের এই সাদা পোশাকে তাই শুধু নজর কাড়েননি কালকি; বরং ফ্যাশনকে আরও সৃজনশীল, মানবিক ও অর্থবহভাবে দেখার একটি বার্তাও দিয়েছেন।

সূত্র: তেলেঙ্গানা টুডে, ইন্ডিয়া টিভি নিউজ

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ০০
বিজ্ঞাপন