বেসরকারি খাতকে উদ্বুদ্ধ করার পরিকল্পনা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মসলিন উৎপাদনে বেসরকারি খাতকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে আগামী জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়ন। ইতিমধ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

ঢাকাই মসলিন
ঢাকাই মসলিন

তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে মসলিন উৎপাদন করতে দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরির ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি উৎপাদনে ভারসাম্য বজায় রাখা, বেসরকারি পর্যায়ের উৎপাদনে মান বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা এবং বেসরকারি খাতে ছাড়ার আগে তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা জরুরি।

এদিকে মসলিনকে সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে আনার জন্য গবেষণাকাজ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদি দ্বিতীয় পর্যায়ে থাকছে পুনরুদ্ধার করা ঢাকাই মসলিনের উৎপাদন কার্যক্রমকে টেকসই করতে নিবিড় গবেষণা অব্যাহত রাখা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন, মসলিনের বাজার তৈরি ও সম্প্রসারণ।

প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম বছরে (২০২৩-২৪ অর্থবছর) ৯ কোটি ৮৮ লাখ ১০ হাজার টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে১০ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে ১৪ জুন ২০২২ অনুষ্ঠিত স্টিয়ারিং কমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও রয়েছে নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে ফুটি কার্পাস তুলার জাত উন্নয়ন ও চাষ, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ ও মসলিন উৎপাদনে কারিগরি সহায়তা প্রদান, গবেষণার মাধ্যমে মসলিন উৎপাদনের উন্নত কৌশল উদ্ভাবন ও টেকসই করা, দেশ ও বিদেশে মসলিনের বাজার সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় প্রচার ও প্রদর্শনীর আয়োজন এবং এই হেরিটেজ টেক্সটাইলের হারিয়ে যাওয়া গৌরবকে সঠিকভাবে ফিরিয়ে আনা।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বাজেট হ্রাসের পাশাপাশি অনুমোদিত অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতই লক্ষ্য বলে অভিমত ব্যক্ত করেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুর রউফ ।

বিজ্ঞাপন

এ প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ আইয়ুব আলী জানান, প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রাথমিক প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী পরিমার্জন করে পুনরায় জমা দেওয়া হয়েছে।

ঢাকাই মসলিন হাউস
ঢাকাই মসলিন হাউস

এদিকে প্রকল্প পরিসমাপ্তি প্রতিবেদন বা প্রজেক্ট কমপ্লিশন রিপোর্ট (পিসিআর) জমা দেওয়ার মাধ্যমে শেষ হবে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়। তবে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয় নির্বাচিত একটি নিরপেক্ষ কমিটি প্রথম পর্যায়ের কাজের মূল্যায়ন করছেন। তিন সদস্যের এই কমিটির আহ্বায়ক টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আবুল কাশেম, তাঁর সঙ্গে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানির অধ্যাপক রাখহরি সরকার আর শিল্পী ও শিক্ষাবিদ বুলবন ওসমান।

দ্বিতীয় পর্যায় হবে প্রথম পর্যায়েরই সম্প্রসারণ। কারণ, প্রথম পর্যায়ে ফুটি কার্পাস শনাক্তকরণের পর তা থেকে বীজ উৎপাদন করে সেই বীজ থেকে তুলা চাষ করা হয়। এই তুলার বাণিজ্যিক আবাদের জন্য জেনেটিক মোডিফিকেশন জরুরি বিবেচনায় মোহাম্মদ আইয়ুব আলী বলেন, প্রাকৃতিকভাবে এই তুলাগাছ জমিতে চাষ করতে হলে এর উচ্চতা কমানো ছাড়াও ইউনিটপ্রতি তুলায় বীজের সংখ্যাও কমাতে হবে। তাহলে উৎপাদন লাভজনক হবে। এই জাত উন্নয়নপ্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি, তবে চলমান এ কার্যক্রম দ্বিতীয় পর্যায়েও অব্যাহত থাকবে। কাপাসিয়া, শ্রীপুর ও রাজশাহীতে ২০ বিঘা করে মোট ৬০ বিঘা জমিতে তুলা চাষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ জন্য বিঘাপ্রতি খরচ হবে ৪০ হাজার টাকা। কৃষককে আগ্রহী করতে তুলা চাষের জন্য পানি ও যন্ত্রপাতি সহায়তা দেওয়া হবে। পরবর্তীকালে এই তুলা বাজারমূল্যে কিনে নেবে তাঁত বোর্ড।

তুলা চাষের জন্য জমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি ইজারা নেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও সচিব মো. আবদুর রউফ মনে করেন, ফুটি কার্পাস চাষের জন্য জমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে ইজারা নেওয়াই বাস্তবসম্মত। একইভাবে তিনি বলেন, কেবল মসলিনের জন্য পৃথক নয়, বরং সবার জন্য অভিন্ন গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা ও প্রশিক্ষণের জন্য এখনই কোনো ভবন না করে মসলিন হাউসেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাটাই বাস্তবসম্মত।

এদিকে মোহাম্মদ আইয়ুব আলী বলেন, দ্বিতীয় পর্যায়ে জোর দিতে হবে উৎপাদনে। এ জন্য চাষিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে আগ্রহ করে তোলা, সুতা ও কাপড় তৈরির জন্য দক্ষ জনবল বৃদ্ধি, সরঞ্জামের উন্নতি সাধন ও বেসরকারি খাতকে উদ্বুদ্ধ করাটাই হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

এদিকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আগ্রহী করতে কর্মশালা আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে জানান সচিব।
তবে বেসরকারি খাতকে মসলিন উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে যথাযথ নীতিমালা।

এদিকে তুলা চাষ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বীজ সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। আইয়ুব আলী বলেন, বীজ অধিদপ্তরের অনুমতি সাপেক্ষে কটন ডেভেলপমেন্ট বোর্ডকে নিয়ে বীজ সরবরাহ করা হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন, তুলার ফলন বছরে দুবার হয়। ফেব্রুয়ারি-মার্চ-এপ্রিল এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর-অক্টোবর। প্রতিবার একটি গাছ থেকে ৫০০ গ্রাম তুলা পাওয়া যায়।

এরই মধ্যে ফুটি কার্পাস তুলার বীজের ভৌগোলিক নির্দেশকের জন্য আবেদনও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

১৭০ বছর পর ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মসলিনের পুনরুদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০১৮ সালের ১২ জুন এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নের অনুমোদন পায়। আর ১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মসলিন পুনরুদ্ধার কার্যক্রম। এ পর্যায়ের ব্যয় ধার্য করা হয় ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা। তবে প্রাথমিক গবেষণা, ফুটি কার্পাস উদ্ধার, তুলা চাষ, কাটুনি তৈরি, সুতা কাটা, কাপড় বোনা ইত্যাদি মিলিয়ে ব্যয় হয় ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বাকি অর্থে রূপগঞ্জে ৩ দশমিক ৪৯ একর জমিতে গড়ে তোলা হয় মসলিন হাউস। এর পাশেই হচ্ছে জামদানি ভিলেজ। সেখানেই গবেষণাগার তৈরি হবে।

মসলিন
মসলিন

মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো ফুটি কার্পাস খুঁজে পাওয়া, ডিএনএ অ্যানালাইসিস ও ফুটি কার্পাস তুলার সফল চাষ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগের রয়েছে বিশেষ অবদান।

মসলিন কাপড় তৈরিতে সুতা কাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। প্রথম পর্বে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৩৫০ জন দক্ষ স্পিনার বা কাটুনির মধ্যে ৩১৬ জন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এ জন্য কুমিল্লায় ৭টি ট্রেনিং সেন্টারে ১৮-৩০ বয়সী মেয়েকে কাটুনি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এই পর্ব শেষের আগে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে সূক্ষ্ম যে সুতা কাটা সম্ভব হয়েছে, সেটা ৭৩১ মেট্রিক কাউন্ট। তবে এই কাটুনিদের দক্ষতাকে টেকসই করতে প্রয়োজন তাদের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো। বিক্ষিপ্তভাবে হলেও নিয়মিত কোনো প্রয়াস এখনো লক্ষ করা যাচ্ছে না।

রূপগঞ্জে ঢাকাই সমলিন হাউসে সুতা কাটছেন কাটুনিরা
রূপগঞ্জে ঢাকাই সমলিন হাউসে সুতা কাটছেন কাটুনিরা

একটা তাঁত চালু রাখতে প্রয়োজনীয় সুতা সরবরাহের জন্য অন্তত ১৫ জন কাটুনির নিয়মিত কাজ অব্যাহত রাখতে হয়। এদিকে তাঁদের মজুরি নিয়েও আছে টানাপোড়েন। বর্তমানে একজন কাটুনি ও একজন বয়নশিল্পী প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে মজুরি পেয়ে থাকেন। আর শিক্ষানবিশেরা পান প্রতিদিন ২৫০ টাকা করে। তবে কাজের মান বজায় রাখার জন্য মজুরি বৃদ্ধির পক্ষে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, তাঁরা মনে করেন, কাটুনিদের প্রয়োজন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, গভীর মনোযোগ আর অসীম ধৈর্য।

আইয়ুব আলী জানান, ব্রিটিশ আমলে বোনা সবচেয়ে ভালো মসলিনে ব্যবহৃত সুতা ছিল সর্বোচ্চ ৫০০ কাউন্টের। তখন সানা ব্যবহার করা হতো ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৪০০। সেই তুলনায় এখন সুতা আরও সূক্ষ্ম যেমন হচ্ছে, তেমনি সানার সংখ্যাও বেড়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৮০০। ফলে আরও উন্নত মানের মসলিন এখন বিশ্ববাসীকে দেওয়া সম্ভব।

প্রথম পর্বের বিশেষ অর্জনের মধ্যে রয়েছে ২০২১ সালের ১৭ জুন ‘ঢাকাই মসলিন’ নামের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের সনদপ্রাপ্তি। এ ছাড়া এ প্রকল্পকে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ (প্রাতিষ্ঠানিক) ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনপ্রশাসন পদক ২০২১ প্রদান করা হয়েছে।

ছবি: বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৭: ৩৮
বিজ্ঞাপন