ক্যানভাস স্টুডিও: প্রকৃতি ও স্থাপত্যের ছোঁয়ায় হ্যান্ডক্রাফটেড গয়নার নান্দনিক ঠিকানা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

গয়না কেনার প্রচলিত অভিজ্ঞতা বলতে সাধারণত ভিড়ভাট্টা আর ব্যস্ত শোরুমের কথাই মনে আসে। তবে সেই চেনা ধারণা থেকে একেবারে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করেছেন ডিজাইনার তন্বী কবির।

নিকেতন ২ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে ৭ নম্বর রোডের ব্লক সি, হাউজ ১৩-তে পৌঁছে লিফটে করে ২য় তলায় উঠলেই মিলবে ক্যানভাসের নতুন স্টুডিওর দেখা। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই গয়নাপ্রেমীদের মন ভালো হয়ে যাবে, এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

প্রবেশমুহূর্তেই চোখ আটকে যায় লাল দেয়ালের ওপর সোনালি কারুকাজে। সেখানে ফুটে উঠেছে ডিজাইনারের নাম, ব্র্যান্ডের লোগো এবং ক্যানভাসের সিগনেচার ব্রাস বা পিতলের তৈরি প্রকৃতি-অনুপ্রাণিত নানা মোটিফ। পুরো দেয়ালজুড়ে এই শিল্পসজ্জা স্টুডিওটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা ।

পুরো স্টুডিওটাই সাজানো হয়েছে এমনভাবে, যেন স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি গয়না কাছ থেকে দেখা যায়। কাঠের শেলফে যত্ন করে সাজিয়ে রাখা গয়নাগুলো থেকে চোখ সরানোই কঠিন।

বিজ্ঞাপন

কোথাও আলাদা ডিসপ্লেতে রাখা হয়েছে স্টেটমেন্ট নেকপিস, দুল, বালা, চুড়ি কিংবা হেডপিস। ক্যানভাসের আসল বিশেষত্ব তাদের পিতল বা ব্রাস মেটালের গয়নায়। কোন গয়নায় কোন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে কিংবা একটি ডিজাইনের পেছনের গল্প সবকিছুই এখানে জানতে পারবেন গ্রাহকেরা।

স্টুডিওর ভেতরে আরও একটু এগোলেই চোখে পড়বে ডিজাইনারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য নির্ধারিত একটি বিশেষ কর্নার। আরাম করে বসে নিজের পছন্দ, স্টাইল কিংবা কাস্টমাইজড ডিজাইন নিয়ে কথা বলার জন্যই রাখা হয়েছে এই ব্যবস্থা।

আর পুরো অভিজ্ঞতাকে আরও সুন্দর করে তুলবে  কাঁচের বড় জানালার ওপারে শান্ত লেকের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

বিজ্ঞাপন

নূপুরজোড়া থেকে শুরু

২০১৯ সাল থেকে পেশাদারভাবে কাজ শুরু করলেও, তন্বী কবিরের ডিজাইন করা প্রথম গয়নার গল্পটি শুরু হয়েছিল একদম ছোটবেলায়। স্কুলে ভর্তি হওয়ারও আগে মায়ের সঙ্গে রূপার নূপুর বানাতে গিয়ে কোনো ডিজাইনই তাঁর পছন্দ হচ্ছিল না। তখন তাঁর মা দোকানদারকে বলেছিলেন, আমার মেয়েকে একটা কাগজ-কলম দিন, ও এঁকে দেখাবে। ছোট্ট হাতে ফুলের মতো একটি মোটিফ এঁকে দিয়েছিলেন তন্বী। সেই আঁকা দেখেই তৈরি হয়েছিল নূপুরজোড়া। সেটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ডিজাইন করা গয়না, যা এখনো তিনি যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।

শুধু গয়নাই নয়, ছোটবেলা থেকেই নিজের জামাকাপড়ও নিজেই ডিজাইন করতেন তিনি। ক্লাস টেনে পড়ার সময় পুরো ক্লাসের ৫২ জনের ফেয়ারওয়েল পোশাকের ডিজাইন করেছিলেন। পরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) স্থাপত্য বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে রং, ফর্ম, কম্পোজিশন, টেক্সচার আর মেটেরিয়ালের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর।

স্থাপত্যবিদ্যা তাঁকে শিখিয়েছে শুধু ডিজাইন করলেই হয় না, সেটিকে বাস্তবেও ফুটিয়ে তুলতে হয়। মডেল তৈরির পর বেঁচে যাওয়া প্লাইউড দিয়েই তখন বানাতেন নেকপিস বা পেনডেন্ট। বন্ধুরা সেগুলো এতটাই পছন্দ করতেন যে আগেভাগেই বুক দিয়ে রাখতেন। পরে এক বন্ধুর উৎসাহে ফেসবুক পেজ খুলে শুরু হয় ‘ক্যানভাস’-এর যাত্রা। শুরুতে প্লাইউড দিয়ে কাজ হলেও এখন ক্যানভাসের গয়না মূলত ব্রাস দিয়ে তৈরি হয়।

প্রকৃতি, হেরিটেজ আর স্থাপত্যের মেলবন্ধন

তন্বীর কাজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা প্রকৃতি আর হেরিটেজ।  প্রতিটি কালেকশনেই থাকে আলাদা থিম। সুন্দরবন তাঁর অন্যতম বড় অনুপ্রেরণার জায়গা।

রয়েল বেঙ্গল টাইগার, গাছপালা, পানি আর প্রকৃতির সম্পর্ক- এসব উপাদান উঠে এসেছে তাঁর গয়নার নকশায়। নকশীকাঁথা, লোকজ মোটিফ, পানাম সিটির স্থাপত্য সবই তাঁর কাজের অংশ। “আমি যেহেতু স্থাপত্য নিয়ে পড়েছি, তাই নানা ধরনের স্থাপত্য, টেক্সচার আর রং আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে,” জানালেন তন্বী।

নকশীকাঁথা কালেকশনে ঐতিহ্যবাহী মোটিফকে গয়নায় ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে তিনি মিনাকারি নিয়েও কাজ শুরু করেন। পুরোনো দিনের গয়নাতে যেভাবে হাতে মিনাকারি করা হতো, সেই হারিয়ে যাওয়া কারুশিল্পকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন তিনি।

নিরীক্ষাধর্মী ডিজাইন

অন্যদের থেকে ক্যানভাসের গয়নাকে আলাদা করেছে এর নিরীক্ষাধর্মী ডিজাইন। বডি জুয়েলারি, ব্রেস্টপ্লেট থেকে শুরু করে নানা কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করেন তন্বী।

ভ্রমণ তাঁর ডিজাইনের বড় অনুপ্রেরণা। ওমরাহ করতে গিয়ে সেখানকার মসজিদের স্থাপত্য তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে সেটি নিয়েই এখন নতুন কালেকশন তৈরি করছেন। এই কালেকশনের কিছু এক্সক্লুসিভ পিস শুধু স্টুডিওতেই পাওয়া যাবে। তাঁর ভাষায়, “ক্যানভাসের একজোড়া ছোট দুলও যদি কেউ পরেন, তাহলে যেন তাঁকে সবার থেকে আলাদা লাগে- এই ভাবনাটাই সবসময় কাজ করে।” তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি গয়নাই হ্যান্ডক্রাফটেড। একটি গয়নার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কারিগরের হাতের কাজ, সময় আর গল্প।

স্টুডিও মানেই ব্যক্তিগত সংযোগ

ক্যানভাসের যাত্রা শুরু হয়েছিল অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকেই। তবে শুধু ছবির মাধ্যমে গয়নার আসল সৌন্দর্য বা অনুভূতি পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব নয় বলেই স্টুডিও করার সিদ্ধান্ত নেন তন্বী। তাঁর মতে, একটি গয়না পরলে কেমন লাগে, মুখের গড়নের সঙ্গে কতটা মানানসই হয় এসব অনলাইনে বোঝানো কিছুটা কঠিন। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছে ক্যানভাসের এই স্টুডিও।

এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ সময় নিয়ে গয়না দেখতে, পরে দেখতে কিংবা নিজের পছন্দ অনুযায়ী কাস্টমাইজ করে নিতে পারবেন। বিশেষ করে ব্রাইডাল ক্লায়েন্টদের জন্য এই স্টুডিও অভিজ্ঞতা আরও ব্যক্তিগত । জীবনের বিশেষ দিনের জন্য কেমন গয়না চাই, পোশাকের সঙ্গে কোন ডিজাইন সবচেয়ে ভালো মানাবে কিংবা কীভাবে স্টাইল করলে পুরো লুকটি সম্পূর্ণ হবে এসব নিয়ে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ থাকছে এখানে। আর সেই ব্যক্তিগত সংযোগের জায়গাটিই ক্যানভাসের স্টুডিওকে আলাদা করে তুলেছে।

বালা, হাঁসুলি আর স্টেটমেন্ট পিসের জগৎ

ডিজাইনার তন্বী কবির নিজে হাতের অলংকারের ভীষণ অনুরাগী। তাই ক্যানভাসের সংগ্রহে হাত সাজানোর গয়নার সংখ্যাও বেশি । বিশেষ করে বালা নিয়ে তিনি নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।

তাঁর নানুর একটি পুরোনো বালা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছিল ক্যানভাসের প্রথম দিককার একটি ডিজাইন। পরে সেই ভাবনাকেই আরও বড় ও বোল্ড স্টেটমেন্ট পিসে রূপ দেন তিনি।

স্টুডিও কালেকশনের অন্যতম আকর্ষণ মাছ মোটিফের বালা। রূপচাঁদা, ইলিশ কিংবা রুই বাংলাদেশের পরিচিত বিভিন্ন মাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে হাতে কেটে তৈরি করা হয়েছে এসব ডিজাইন। পিতলের ওপর হেমারিং করে তৈরি টেক্সচারযুক্ত চুড়েও রয়েছে আলাদা আবেদন, যেখানে যুক্ত করা হয়েছে টারকোয়াইজ স্টোন। এছাড়া আছে নকশীকাঁথা মোটিফের চুড়, সুন্দরবন সিরিজের চুড় এবং চুড় ও বালার মিশেলে তৈরি অভিনব ‘বালাচুড়’। প্রতিটি ডিজাইনই একটা থেকে অন্যটা আলাদা। আর এমনভাবেই এগুলো বানানো হয়েছে যেন অন্য গয়না না পরে শুধু হাতে একটা স্টেটমেন্ট পিস পরলেই হয়ে যায় ।

ডিজাইনারের ব্যক্তিগত পছন্দের অলংকারগুলোর মধ্যে আরেকটি পছন্দ হলো হাঁসুলি। তাই তিনি এই ঐতিহ্যবাহী গয়নাটিকেও নানা রূপ দিয়েছেন ।

কোথাও মুক্তা ও সাদা পাথরের কাজ, কোথাও পাখি বা বাঘের মোটিফ- প্রতিটি হাঁসুলিই যেন আলাদা এক শিল্পকর্ম। কিছু গয়না আবার পুরোপুরি হাতে কেটে তৈরি, যেগুলো ‘কাটাই গয়না’ নামে পরিচিত।

গয়নাগুলোতে কোথাও গোল্ড পলিশ, কোথাও পিতলের নিজস্ব আভা, কোথাও ব্ল্যাক পলিশ বা মিনাকারির কাজ- প্রতিটি পিসেই রয়েছে আলাদা আবেদন।

সুন্দরবন সিরিজ থেকে ‘অরুন্ধতী’

এই কালেকশনে টারকোয়েজ পাথর, মুক্তা, তাবিজের শেপ, পাতা আর পদ্মের মোটিফ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বিশেষ এক নেকপিস।

অন্যদিকে সুন্দরবন সিরিজের হেডপিস বা ক্রাউনটি যেন একটি শিল্পকর্ম। তন্বী বলেন, “আমি জীবনের তিনটি সময়ে সুন্দরবনকে তিনভাবে দেখেছি। কিছু জায়গা দেখে মনে হয়েছে, আমরা খুব দ্রুত প্রকৃতিকে নষ্ট করছি। সেই অনুভূতিটাই এই সিরিজে তুলে ধরতে চেয়েছি।”

এই সিরিজের এই ক্রাউনে দেখা যায় রাতের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা বাঘের উপস্থিতি। সেই রাতের আবহ ফুটিয়ে তুলতে রাখা হয়েছে চাঁদের মোটিফ। রয়েল বেঙ্গল টাইগার থেকে অনুপ্রাণিত হ্যান্ডক্রাফটেড ব্রাস ক্রাউনটি শক্তি আর বুনো সৌন্দর্যের প্রতীক।

অন্যদিকে কালেকশনের বড় স্টেটমেন্ট নেকপিস ‘অরুন্ধতী’ অনুপ্রাণিত হয়েছে ইতিহাসের গডেস ও কুইনদের অলংকার থেকে।

আবার একেবারে মিনিমাল একটি নেকপিসে ফুটে উঠেছে বাগানবিলাসের রং, জ্যামিতিক ফর্ম আর মিনাকারির কাজ।

আছে ব্যাগও

শুধু কানের দুল, নেকপিস বা হেডপিসই নয়, ক্যানভাসের কালেকশনে রয়েছে ভিন্নধর্মী ডিজাইনের ব্যাগও। অরিজিনাল লেদার ও ব্রাসের তৈরি নানা মোটিফ মোটিফ দিয়ে তৈরি এই ব্যাগগুলোর প্রতিটিই আলাদা।

কোনো ব্যাগের অনুপ্রেরণা এসেছে পানের বাটা থেকে, আবার কোনো ক্লাচ ব্যাগে দেখা যায় নকশীকাঁথার নকশা । ঐতিহ্য, কারুশিল্প আর সমকালীন ডিজাইনের মিশেলে এই ব্যাগগুলো ডিজাইন করা হয়েছে।

তন্বী জানান, প্রতিটি গয়নার পেছনেই থাকে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। “প্রথমে আমি একটি কনসেপ্ট নিয়ে ভাবি। যদি কাস্টমাইজড কাজ হয়, তাহলে ক্লায়েন্টের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করি। এরপর স্কেচ করি। তারপর কারিগরদের সঙ্গে বসে পুরো ডিজাইন নিয়ে কাজ হয়।

সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পর ডিজিটাল স্কেচ তৈরি করা হয়। তারপর ধীরে ধীরে তৈরি হয় গয়নাটি।”

এক্সক্লুসিভ জোন আর কিউরেটেড পিস

স্টুডিওতে রয়েছে একটি বিশেষ কিউরেটেড জোন, যেখানে প্রদর্শিত কিছু গয়না শুধুমাত্র স্টুডিও ভিজিটরদের জন্যই রাখা হয়েছে। এগুলো ওয়েবসাইট বা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে না। নেকপিস, বালা, হেডপিস এসবই রাখা হয়েছে এই কিউরেটেড অংশে। প্রতিটি ডিজাইনের পেছনেই রয়েছে আলাদা গল্প। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি সব দিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে ক্যানভাস স্টুডিও। চাইলে সরাসরি গিয়ে ঘুরে দেখা যাবে, আবার অ্যাপয়েন্টমেন্টের ভিত্তিতেও ভিজিট করা সম্ভব। সময় নির্ধারণের জন্য যোগাযোগ করা যাবে ক্যানভাসের ফেসবুক পেজে দেওয়া নাম্বারে ।

ছবি: হাল ফ্যাশন

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৭: ৩৪
বিজ্ঞাপন