
শাড়ি বাঙালি নারীর সবচেয়ে প্রিয় পোশাকগুলোর একটি। শখ করে শাড়ি দিয়ে আলমারিভর্তি করেন অনেকেই। কখনো ভেবে দেখেছেন, এই শাড়ি তৈরি হয় কীভাবে? কিংবা এর তৈরির প্রক্রিয়াটি পরিবেশবান্ধব কি না? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গল্পটি এমন হয় যে প্রচুর পরিমাণ পানি, প্রায় চল্লিশ কেজি রাসায়নিক দ্রব্য এবং আরও অনেক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হলো যে শাড়িটি, অনেকেই নেহাৎ পুনরাবৃত্তি হবে বলে এক-দুবারের বেশি আর পরেন না। এতে একটা বিশালসংখ্যক মানুষের পানযোগ্য পানি শোষণ করে নেয় লাখ লাখ শাড়ি, হয় পরিবেশের দূষণও।


কেমন হয় যদি আলমারিতে জায়গা দখল করা শাড়ি রিসাইকেল করে অন্য কিছুতে পরিণত করা যায়? এমনই এক অভিনব উদ্যোগ নিয়ে এসেছে ‘শালবৃক্ষ’। তারা পুরনো শাড়ি দিয়ে তৈরি করছে রিসাইকেল্ড ব্যাগ, যা হবে প্লাস্টিক ব্যাগের বিকল্প, নান্দনিক, টেকসই ও পুনরায় ব্যবহারযোগ্য।
‘শালবৃক্ষ’ পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্র ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র তৈরি করে থাকে মূলত। হতে পারে এটি বাঁশের তৈরি ফুলদানি কিংবা পানির পট। তবে নতুন কিছু করার ভাবনা থেকে, রিসাইকেল্ড পণ্য হিসেবে তারা বানাচ্ছে প্লাস্টিকের ব্যাগের পরিপূরক হিসেবে শাড়ির কাপড়ের ব্যাগ। এ বিষয়ে শালবৃক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব সুমন জানান, ‘করোনার সময়ে প্রথম এ উদ্যোগটির কথা মাথায় আসে। উদ্যোগটির নাম আমরা দিই “ম্যাপ” বা মার্চ অ্যাগেইনস্ট প্লাস্টিক। শুরুতে এটি কেবল প্লাস্টিকের ব্যবহার রোধের একটি উদ্যোগ ছিল।’

ম্যাপ প্রথমে শুধু প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করে পরিবেশদূষণ রোধের উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে ডালপালা মেলে পরিণত হয় বৃক্ষে। সুমন আরও জানান, ম্যাপের উদ্যোগ হিসেবে ২৫টি পরিবারকে ৩ ধাপের এক অভিনব কার্যকলাপে অংশগ্রহণে অনুপ্রাণিত করে। এটি ছিল মূলত গৃহস্থালির সব প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলে বরং সেগুলো জমিয়ে পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেলের সুযোগ করে দেওয়া। সেই সঙ্গে প্লাস্টিকের বিকল্প খুঁজে বের করা। যেসব পরিবার এই উদ্যোগে অংশ নিয়েছে, সবাইকে আরও বেশি অনুপ্রেরণা জোগাতে তাদের জন্য উপহার হিসেবে ছিল বর্ষীয়সী গাছের চারা!
ইদানীং শাড়ি দিয়ে রিসাইকেল্ড ব্যাগের এই অসাধারণ উদ্যোগটিও ম্যাপ দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে।
এক বান্ধবীর আলমারভর্তি শাড়ি পড়ে থাকতে দেখে এই উদ্যোগটির কথা প্রথমে মাথায় আসে মাহবুব সুমনের। তখনই লেগে পড়েন কাজে। এই উদ্যোগে কোনো একজন দাতা তাঁর পুরোনো, ঘরে পড়ে থাকা শাড়ি দিতে পারবেন। সেই শাড়ি দিয়ে ব্যাগ বানানো হবে। শাড়ির বিনিময়ে দাতা দুটি করে ব্যাগ পাবেন।


সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপারটি হলো, চাইলে শাড়ির ডোনার বা দাতা তাঁর বাকি ব্যাগগুলো খোলা বাজারে নিয়ে গিয়ে মানুষের মধ্যে প্রচার করে তাঁদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিক্রি করে অর্থ উপার্জনও করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাগগুলোতে মধ্যবিত্ত মানুষের সাধ্যের মধ্যে একটি মূল্য নির্ধারণ করবে ‘শালবৃক্ষ’। তবে ব্যাগগুলোর প্রচারণা শুধু সেই বাজারগুলোতেই হবে যেখানে বেহিসাবিভাবে প্লাস্টিকের পলিথিন ব্যবহৃত হয়। এ ক্ষেত্রে ম্যাপের টিম দাতাকে এ কাজে সাহায্য করতে সব সময় প্রস্তুত বলেও জানান মাহবুব সুমন। তবে এখনো খোলাবাজারে ব্যাগ বিক্রির পরিকল্পনাটি বাস্তবে রূপ পায়নি। খুব শীঘ্রই এ ব্যাপারে কাজ শুরু হবে বলে আশাবাদী এই উদ্যোক্তা।

শালবৃক্ষের অঙ্গ সংগঠন ম্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত এই উদ্যোগটি একটি সেবামূলক উদ্যোগ। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণের কবল থেকে পরিবেশকে রক্ষা করা। তবে শাড়ি ডোনার বা দাতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সফল হতে পারে মাহবুব সুমন ও ইকরামুন্নেসা চম্পার অভিনব উদ্যোগটি।

আপনার আলমারির এক কোনায় পড়ে থাকা শাড়িটি, যেটি হয়তো আপনি আর কখনোই ব্যবহার করবেন না, কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠিয়ে এমন চমৎকার একটি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের অংশ হতে পারেন আপনিও। তবে শাড়িটি পুরনো হলেও হতে হবে অক্ষত। ছেঁড়া শাড়িতে ব্যাগ বানাতে বেশ বিড়ম্বনার মধ্যেই পড়তে হয় ম্যাপের উদ্যোক্তাদের।

শাড়ি পাঠাতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শালবৃক্ষের নিজস্ব পেইজটিতে। শালবৃক্ষের ঠিকানাও দেওয়া রইল। ঠিকানা- শালবৃক্ষ, কায়েমপুর, বটতলা, ফতুল্লা-১৪২০, নারায়ণগঞ্জ।