
খুব খুঁজে খুঁজে কিনলেন বৈশাখের শাড়ি। কী সাজ হবে, তা–ও ভেবে নেওয়া শেষ। এবার পালা গয়নার। হঠাৎ মনে হলো গয়না তো আছে বহু, কিন্তু বৈশাখ সাজের উপযোগী কোনোটিই নয়। পয়লা বৈশাখের পোশাক, সাজের পাশাপাশি গয়না নিয়ে সমানতালে হয় নিরীক্ষা। আর গয়নাগুলো হয় বিশেষ। কারণ, দেশীয় উপকরণ দিয়েই বৈশাখের গয়নায় নিয়ে আসা হয় আলাদা একটি ধারা।

মাটি, বাঁশ, কাঠ, কড়ি, ঝিনুক, ফিতা, লতা, কাপড়, বিভিন্ন ফলের বীজ, তালপাতা, হোগলাপাতা, গামছা, পাট, সুতা, কচুরিপানা—এ সবই দেশি গয়না তৈরির উপকরণ। কিন্তু একসময় কিছুটা অবহেলা করা হতো দেশীয় উপকরণগুলো। সময়ের বদলে সাদামাটা জিনিসে সব নিরীক্ষাধর্মী গয়না তৈরি হচ্ছে।
গলায় ছোট একটি মাটির মালা, কানে দোল খাওয়া ঝিনুকের দুল আর হাতে হয়তো পাট বা কাপড়ের চুড়ি—এমন গয়নায় যে হতে পারে বৈশাখের পরিপূর্ণ সাজ, তা কয়েক বছর ধরে ভালোভাবেই প্রমাণিত।

কারণ দেশি গয়নার সঙ্গে আছে আবেগ আর শিকড়ের টান। এই উপকরণগুলো আমাদের নিজস্ব। সহজেই আমাদের নিয়ে যায় উৎসের কাছাকাছি। আর এই আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফ্যাশনের নতুন রূপ। এই গয়নায় দেশীয় টান ও ফ্যাশন—দুটিই খুঁজে পাওয়া যায়। তাই নেহাত সৌন্দর্যের কারণে দেশি এই গয়নার কদর বাড়েনি।
স্বদেশি এই গয়নার বুনন ও বাঁধনে পাওয়া যায় ফ্যাশনের নতুন সব ধারা। আবার কিছু কিছু গয়না পুরোটাই হাতের সেলাইয়ে তৈরি হয়। এ সময়ের বৈশাখের দেশি গয়নায় শুধু এক ধরনের উপকরণ ব্যবহার হয় না। প্যাচওয়ার্কের গয়নার সঙ্গে মিশেল হচ্ছে বাঁশ, কাঠ, কড়ি বা ঝিনুক। হয় সুতায় বোনা সাদামাটা গয়নার মাঝে ফলের বীজ বা তালপাতার টুকরো। আর তাতেই আসে নজকাড়া বৈচিত্র্য।

প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি বৈশাখের গয়নাগুলো পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্যও বটে। বছরের পর বছর ব্যবহারের পরও ভেঙে গড়া যায় নতুন গয়না। পুরোনো শাড়ি বা জামার কাপড় কেটে দিব্যি গয়না তৈরি করে ফেলেন অনলাইন পেজ তাহিতীর স্বত্বাধিকারী রাইবা তাজরীদ তাহিতি। দেশি গয়নার অন্যতম বৈশিষ্ট্য এটি বলে মনে করেন তিনি।
বৈশাখে যদি একেবারেই ঐতিহ্যপূর্ণ লাল-সাদা পোশাক পরার পরিকল্পনা থাকে, তবে খুব সাধারণভাবেই লালরঙা গয়নায় নজর আটকাবে। গলায় পরতে পারেন ঝুলানো কাপড় বা পাটের মালা। চাইলে ফলের বীজের ছিমছাম গয়নাও পরে নিতে পারেন। মাটি, কাঠ বা বাঁশের তৈরি চোকারও কিন্তু মন্দ নয়—বলেন তিনি।
রঙিন শাড়ি বা জামার ওপর রঙিন গয়না খুব বেশি ফুটে উঠবে না। তাই শুভ্রসাদা কড়ি বা ঝিনুকের মালা আর দুল বেছে নিলে খুব বেশি ভাবতে হবে না।

বেশ কয়েক বছর ধরে কাঠ কেটে নথ, আংটি, দুল, মালা ও চুড়ির বেশ কদর বেড়েছে। বিশেষ করে নাকজুড়ে কাঠের নথে চেহারায় ফুটে ওঠে শতভাগ বাঙালিয়ানা। বৈশাখের নানা মোটিফ, যেমন প্যাঁচা, ফুল, লতা, পাতা, ঢোল, পাখার আদলে নথগুলো সব ধরনের পোশাকের সঙ্গে ভালোভাবেই মানিয়ে যাবে। খুব চকচককে আংটি না পরে সুতি তাঁতের কাপড়ের সঙ্গে কাঠের বড় আংটিও পরে নিতে পারেন—বললেন গয়না নিয়ে কাজ করা বাঙালি পেজের স্বত্বাধিকারী ঊর্মি রহমান।
বৈশাখের বিশেষ অনুষঙ্গ হলো কাচের চুড়ি। বৈশাখের আগেই রাস্তার মোড়ে বসে চুড়ির পসরা। কাচের চুড়ি তো পরতেই হবে, কিন্তু একটু ভিন্নতা আনতে এর সঙ্গে কাপড়ে মোড়ানো দুই জোড়া বালা পরে নিন। চুড়ির সঙ্গে রঙে রাখতে পারেন বৈপরীত্য। এতে চুড়ির সৌন্দর্য ফুটে উঠবে।

বৈশাখের আছে নিজস্বতা। তাই বৈশাখের গয়নাতেও থাকা চাই এর প্রতিফলন। প্রাকৃতিক আর দেশীয় এই গয়নার সাদামাটা রূপে যা ফুটে ওঠে শতভাগ। বৈশাখ উদ্যাপনে বেশি গয়না পরলেও বাড়াবাড়ি মনে হবে না।