
আফ্রিকার প্রাচীন সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সমকালীন ফ্যাশনের ভাষায় একটি সংগ্রহ তৈরি করেছেন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) শিক্ষার্থী ডিজাইনার আশিকা সুলতানা মীলি। তাঁর সংগ্রহের নাম ‘ইঙ্ক অব অ্যানসেস্টর’, যার সাব–থিম ‘সোল অব আফ্রিকা’। সংগ্রহটির মূল ভাবনায় আছে আফ্রিকান ফেস পেইন্ট, বডি আর্ট, ট্রাইবাল আর্ট ও ঐতিহ্যবাহী মোটিফের প্রভাব। তবে এসব উপাদান সরাসরি অনুকরণ না করে আধুনিক পোশাকের নকশা ও সিলুয়েটের মাধ্যমে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

‘ইঙ্ক অব অ্যানসেস্টর’ নামটির মধ্যেও রয়েছে বিশেষ অর্থ। এখানে ‘ইঙ্ক’ শুধু কালি বা আঁকার চিহ্ন নয়; এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় ও ঐতিহ্যের প্রতীক। আর ‘অ্যানসেস্টর’ শব্দটি সেই পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে, যাঁদের জীবনযাপন, বিশ্বাস ও শিল্পচর্চার ছাপ আজও আফ্রিকার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। সে উত্তরাধিকারকে সমকালীন ফ্যাশনের মাধ্যমে তুলে ধরাই এ সংগ্রহের মূল উদ্দেশ্য।
‘সোল অব আফ্রিকা’ ভাবনাটির কেন্দ্রে রয়েছে আফ্রিকার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা কিছু । ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান শিল্পে প্রতীক, মোটিফ, ছন্দময় নকশা ও আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তির মাধ্যমে ফুটে ওঠে শক্তি, সংগ্রাম ও পরিচয়ের নানা গল্প। আশিকার সংগ্রহে সেই সাংস্কৃতিক ভাষার প্রভাব দেখা যায় পোশাকের নকশায়, বিশেষ করে জ্যামিতিক মোটিফের ব্যবহারে।

সংগ্রহটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মানবসভ্যতার প্রাচীন ইতিহাসও। আফ্রিকাকে মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে আফ্রিকা, ভারত, অ্যান্টার্কটিকাসহ বিভিন্ন ভূখণ্ড একসময় ‘গন্ডোয়ানা’ নামের মহাভূখণ্ডের অংশ ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের এ প্রাচীন সংযোগ সংগ্রহটির ভাবনায় যোগ করেছে আরও একটি মাত্রা।
এ সংগ্রহে সিলুয়েট রাখা হয়েছে মূলত ভাস্কর্যধর্মী ও ট্রেন্ডি কাটের পোশাকে। কোথাও ওয়াইড-লেগ ট্রাউজারের সঙ্গে স্ট্রাকচার্ড ক্রপ টপ, আবার কোথাও লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে পোশাকের স্বতন্ত্র কাঠামো।

একটি লুকে ভেতরে রাখা হয়েছে ফিটেড স্ট্র্যাপলেস মিডি ড্রেস, কোমরে টেক্সচার্ড অফ হোয়াইট বেল্ট এবং তার ওপর হাফ-স্লিভ শ্রাগ-স্টাইল কেপ। কেপটিতে হাই কলার ও সামনের দিকে কাট আউট নেকলাইন রয়েছে। তবে এর প্রধান আকর্ষণ পেছনের অংশে—কাঁধ থেকে নেমে আসা লম্বা মসলিনের প্যানেল ট্রেন পেছনে ছড়িয়ে পড়েছে। স্বচ্ছ এ প্যানেলের ওপর সারি সারি জ্যামিতিক মোটিফ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কেপের পিঠের ওপরের অংশে বসানো হয়েছে আফ্রিকান ট্রাইবাল শিল্ডের আদলে তৈরি একটি আলাদা জ্যামিতিক প্যাঁচ।
আরেকটি সিলুয়েটে দেখা যাচ্ছে মিনি কাফতান স্টাইল শিয়ার টপ, যেখানে জ্যামিতিক নকশা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এর সঙ্গে ভেতরে রাখা হয়েছে স্ট্র্যাপলেস ক্রপ টপ ও হাই-ওয়েস্টেড ফ্লেয়ার্ড ট্রাউজার।


অন্যদিকে, ফিট-অ্যান্ড-ফ্লেয়ার ঘরানার একটি ড্রেসে স্প্যাগেটি স্ট্র্যাপের সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে ফিটেড বডিস। বডিসের সামনের অংশে বসানো হয়েছে বড় একটি সান-বার্স্ট আকৃতির জ্যামিতিক মোটিফ। নিচের অংশে শিয়ার ফেব্রিক মিড-ক্যাফ লেংথ পর্যন্ত নেমে হালকা প্লিটেড ভলিউম তৈরি করেছে। স্কার্টের নিচের অংশেও রয়েছে ঘন জ্যামিতিক প্যাটার্নের কাজ।
পুরুষদের পোশাকেও একইভাবে রিল্যাক্সড ও স্ট্রাকচারড কাটের সমন্বয় রাখা হয়েছে। একটি আউটফিট তৈরি হয়েছে কলার শার্ট ও স্ট্রেট-কাট বটমের সমন্বয়ে।


শার্টের সামনের অংশে ব্লক-শেপে বসানো হয়েছে উইভড বা প্লেটেড লেদার-কাট প্যানেল। ছোট ছোট লেদার স্ট্রিপ একে অপরের ওপর গেঁথে তৈরি হয়েছে বাস্কেট-উইভের মতো টেক্সচার। শার্টের হাতায়ও রয়েছে আলাদা নকশার আকর্ষণ। তবে লুকটির আসল চমক পেছনের অংশে, যেখানে ব্যাক প্যানেলজুড়ে ফ্ল্যাট লেদার-কাট স্ট্রিপ বুনে তৈরি করা হয়েছে ঝুড়ির মতো একটি জ্যামিতিক প্যাটার্ন।
পুরুষদের আরেকটি আউটফিটে রাখা হয়েছে রিল্যাক্সড-ফিট, শর্ট-স্লিভ বাটন-ডাউন শার্ট। সম্পূর্ণ শিয়ার ফেব্রিকে তৈরি এ শার্টজুড়ে ফুটে উঠেছে নানা ধরনের জ্যামিতিক ও ট্রাইবাল মোটিফ।

স্পাইরাল স্কয়ার, ওয়েভি লাইন, ছোট ত্রিভুজ ও প্যাটার্নড বর্ডার—সবকিছু একের পর এক সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি ছন্দময় ভিজ্যুয়াল ভাষা। ফলে পুরো সংগ্রহে সিলুয়েট, টেক্সচার ও মোটিফ একসঙ্গে মিলে আফ্রিকান শিল্পভাবনাকে সমকালীন পোশাকের নকশায় নতুনভাবে প্রকাশ করেছে।

নকশা তৈরির প্রক্রিয়ায় আফ্রিকান ট্রাইবাল আর্ট, বডি পেইন্টিং ও ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রের নানা উপাদানকে সমকালীন ফ্যাশনের ভাষায় নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পোশাকের নকশায় জ্যামিতিক ও প্রতীকধর্মী মোটিফ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে লেদার কাটের কৌশল। হাতে করা এ কাটিংয়ের মাধ্যমে পোশাকে যোগ হয়েছে নিরীক্ষাধর্মী ছোঁয়া। একই সঙ্গে নকশাগুলো শুধু অলংকরণের উপাদান হয়ে না থেকে আফ্রিকান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গল্প বলেছে।

পোশাকে বৈচিত্র্য আনতে ব্যবহার করা হয়েছে কর্ড। পোশাকের বিভিন্ন অংশে কর্ডের সংযোজন নকশায় তৈরি করেছে ভাস্কর্যধর্মী আবহ। কর্ডের রেখা ও বিন্যাস আলাদাভাবে নজর কাড়ছে এ সংগ্রহে। এর মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের সঙ্গে সমকালীন ফ্যাশনের একটি সুন্দর সমন্বয়ও তৈরি হয়েছে। সেলাই, কাটিং ও রেখার বিন্যাসেও তাই নান্দনিকতার পাশাপাশি আফ্রিকান ঐতিহ্যের ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ সংগ্রহে ফেব্রিক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব পেয়েছে প্রাকৃতিক ও দেশজ আবহ। ব্যবহার করা হয়েছে মসলিন ও খাদি। মসলিনের হালকা, কোমল ও প্রবহমান আবহ পোশাকে এনেছে স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও নমনীয়তা। অন্যদিকে খাদির হাতে তৈরি প্রাকৃতিক টেক্সচার নকশায় যোগ করেছে মাটির কাছাকাছি একধরনের শিকড়ের অনুভব। দুটি কাপড়ের বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে আলাদা আবেদন, যা আফ্রিকান মোটিফের সঙ্গে মিলে এক হয়েছে।
আফ্রিকান সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বৈচিত্র্যময় রঙের সম্ভাবনা থাকলেও পুরো সংগ্রহে সাদাকে রাখা হয়েছে প্রধান রং হিসেবে। আফ্রিকান ফেস আর্টে সাদা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীকী রং, যা পবিত্রতা, আধ্যাত্মিক শক্তি, আত্মপরিচয় ও পূর্বপুরুষদের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। সে ভাবনাকে কেন্দ্র করেই সংগ্রহের রঙের ভাষায় সাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাদার সরলতা ও স্বচ্ছতার ওপর জ্যামিতিক নকশা তৈরি করেছে পোশাকগুলোর মূল ভিজ্যুয়াল ভাষা।

সব মিলিয়ে, ‘ইঙ্ক অব অ্যানসেস্টর’ শুধু পোশাক তৈরির প্রয়াস নয়; এটি আফ্রিকার ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প ও পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকারকে সমকালীন ফ্যাশনের মাধ্যমে প্রকাশের সৃজনশীল প্রচেষ্টা। মসলিন, খাদি, লেদার কাট, কর্ড, প্রতীকী মোটিফ ও সাদার ব্যবহারে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ তৈরি করেছেন আশিকা সুলতানা মীলি। আফ্রিকার ঐতিহ্যকে সরাসরি অনুকরণ না করে আধুনিক নকশার ভাষায় নতুনভাবে উপস্থাপন করাই এ সংগ্রহের বিশেষত্ব। সে ভাবনার মধ্য দিয়েই ‘সোল অব আফ্রিকা’ হয়ে উঠেছে ইতিহাস, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক সমকালীন প্রকাশ।