
পাউরুটি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারগুলোর একটি। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে পথের ধারের খাবার—সবখানেই এর উপস্থিতি। কিন্তু একে পোশাকের উপকরণ হিসেবে কে ভেবেছে আগে! এদিকে বিভিন্ন সময় ফল, ফুল কিংবা নানা অদ্ভুত উপকরণ দিয়ে তৈরি পোশাক দেখা গেছে ফ্যাশন শো কিংবা চলচ্চিত্রে।

তবে এবার আফ্রিকার এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ডিজাইনার টয়িন লাওয়ানির তৈরি ৫০০টিরও বেশি পাউরুটি দিয়ে তৈরি গাউন পরে সবাইকে চমকে দিয়েছেন রিয়েলিটি শো তারকা কুইন মার্সি অ্যাটাং।
পাউরুটির এই গাউনের নেপথ্যের গল্প জানার আগে জেনে নেওয়া যাক কে এই টয়িন লাওয়ানি। নাইজেরিয়ার এই সেলিব্রিটি ফ্যাশন ডিজাইনারের পরিচয় শুধু পোশাক নির্মাতায় সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে তিনি উদ্যোক্তা, লেখিকা ও সমাজসেবী। তিনি “তিয়ানা'স প্লেস এম্পায়ার” প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, যাঁর অধীনে পরিচালিত হয় ৩৩টিরও বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।


সাহসী, নাটকীয় এবং ব্যতিক্রমী ফ্যাশন ভাবনার জন্য তিনি আফ্রিকাজুড়ে পরিচিত। জনপ্রিয় ধারাবাহিকে পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। এছাড়া তাঁর জীবন ও কর্মজীবন নিয়ে নির্মিত হয়েছে বাস্তবধর্মী অনুষ্ঠান।
আমরা অনেকেই জানি, আফ্রিকার সবচেয়ে জমকালো বিনোদন আয়োজনগুলোর একটি হলো “আফ্রিকা ম্যাজিক ভিউয়ার্স চয়েস অ্যাওয়ার্ডস”। প্রতি বছর নাইজেরিয়ার লাগোস শহরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান শুধু চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের সেরাদের স্বীকৃতি দেয় না, বরং এটি পরিণত হয় আফ্রিকান ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় মঞ্চেও। লাল গালিচায় কে কতটা সাহসী, ব্যতিক্রমী কিংবা নাটকীয় সাজে হাজির হবেন, তা নিয়েই চলে আলোচনা। আফ্রিকান মেটে গালাও বলা যায় এটিকে। এবারের দ্বাদশ আসরটি অনুষ্ঠিত হয় ৯ মে শনিবার রাতে, লাগোসের বিলাসবহুল একো হোটেলে।

আর এখানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম হয়ে উঠেছেন নাইজেরীয় রিয়েলিটি শো তারকা কুইন মার্সি অ্যাটাং। তিনি লাল গালিচায় হাজির হয়েছিলেন ৫০০টিরও বেশি পাউরুটি দিয়ে তৈরি বিশাল এক গাউন পরে। পোশাকটির চারপাশে ছিল রুটিভর্তি ট্রে বহনকারী সহকারীরা। পুরো উপস্থিতিটিই যেন এক চলমান শিল্পকর্ম। তবে গাউনটির আকার এতটাই বড় ছিল যে, অ্যাটাংয়ের চলাফেরাও সীমিত হয়ে পড়ে।
প্রথম দেখায় এটি নিছক চমক তৈরির ফ্যাশন মনে হলেও, এর পেছনে ছিল ব্যবসায়িক কৌশলও। কুইন মার্সি অ্যাটাং জানান, এই পোশাকটি তিনি তার বেকিং ব্যবসার প্রচারের জন্য বেছে নিয়েছেন। তার মতে, এমন একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে সৃজনশীলভাবে নিজের ব্র্যান্ডকে তুলে ধরাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে টয়িন লাওয়ানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, এই ধারণা এসেছে নতুন এক ফ্যাশন প্রবণতা থেকে নিজের ব্যবসাকেই পরিধান করা। অর্থাৎ নিজের পেশা বা ব্যবসাকে ফ্যাশনের অংশে পরিণত করা। ফ্যাশনকে শুধু সৌন্দর্যের জায়গা থেকে সরিয়ে ব্যক্তিগত পরিচয় ও ব্র্যান্ডিংয়ের শক্তিশালী মাধ্যমে রূপ দেওয়ার চেষ্টা।
তবে এই পোশাক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনার ঝড়ও তুলেছে। অনেকে এর সৃজনশীলতা ও সাহসী ভাবনার প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, ফ্যাশন মানেই নতুন চিন্তা, নতুন ভাষা এবং প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দেওয়া। আফ্রিকান ফ্যাশন এখন বিশ্বমঞ্চে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করছে, আর এই ধরনের পরীক্ষামূলক কাজ সেই পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করছে।
আবার অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন খাদ্যের অপচয় নিয়ে। এমন এক সময়ে, যখন যুধপরবর্তী অর্থনৈতিক সমীকরণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো আফ্রিকায়ও খাদ্য সংকট ও দারিদ্র্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন শত শত পাউরুটি ব্যবহার করে পোশাক তৈরি করাকে কেউ কেউ অসংবেদনশীল বলেও মন্তব্য করেছেন।
তবে বিতর্ক যাই থাকুক, একটি বিষয় স্পষ্ট; এই পোশাক আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে আধুনিক ফ্যাশন এখন শুধু কাপড় বা সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন হয়ে উঠেছে বক্তব্য, বিপণন, শিল্পচর্চা এবং সামাজিক আলোচনার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।


বিশ্ব ফ্যাশনে লেডি গাগার 'মিট ড্রেস' যেমন একসময় তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি আফ্রিকান পপ সংস্কৃতিতে কুইন মার্সি অ্যাটাংয়ের এই পাউরুটির গাউন নিয়েও দীর্ঘদিন আলোচনা চলবে ফ্যাশন দুনিয়ায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাচ্ছে ফ্যাশনের ভাষা। তবে সেই পরিবর্তন যেন শুধু চমকেই সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য নতুন ভাবনার দরজা খুলে দেয়—এই প্রত্যাশা ফ্যাশনপ্রেমীদের।
সূত্র: বিবিসি, চ্যানেলস টেলিভিশন
ছবি: ইন্সটাগ্রাম