
স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প (আরএমজি) বিশ্ববাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু দেশীয় ফ্যাশনশিল্প এখনো পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, গবেষণা ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। অন্যদিকে বৈশ্বিক ফ্যাশনের দ্রুত পরিবর্তন, প্রযুক্তির অগ্রগতি, ভোক্তার রুচির বদল এবং টেকসই উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে এই খাতের উদ্যোক্তা ও ডিজাইনারদের।

এসব বিষয় নিয়ে ৬ নভেম্বর রাজধানীর সোবহানবাগে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে (বিআইআইএম) অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ডিজাইনারের চোখে পণ্যের ভবিষ্যৎ চাহিদা ও উৎপাদন প্রস্তুতি’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। জাতীয় এসএমই নারী উদ্যোক্তা সামিট ২০২৬ ও পণ্যমেলার অংশ হিসেবে আয়োজিত এ আলোচনায় অংশ নেন ডিজাইন কনসালট্যান্ট চন্দ্র শেখর সাহা, ফ্যাশন এন্টারপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) সভাপতি ও ফ্যাশন হাউস সাদাকালোর প্রতিষ্ঠাতা আজহারুল হক আজাদ, ফ্যাশন হাউস বিবিয়ানার প্রধান ও ডিজাইনার লিপি খন্দকার এবং আজুরা বাই শান্তা কবীরের প্রধান শান্তা কবির। আলোচনা সঞ্চালনা করেন হাল ফ্যাশনের কনসালট্যান্ট ও হেরিটেজ টেক্সটাইল গবেষক শেখ সাইফুর রহমান।
আলোচনায় ডিজাইনের দর্শন ও ঐতিহ্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন ডিজাইন কনসালট্যান্ট চন্দ্র শেখর সাহা। তাঁর মতে, ডিজাইন মানে শুধু কোনো পণ্যের ওপর অলংকরণ বা সাজসজ্জা নয়; বরং যেকোনো পরিকল্পনার পেছনে একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি থাকা জরুরি। কী করা হবে, কেন করা হবে এবং কীভাবে করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর থাকতে হবে ডিজাইন প্রক্রিয়ায়।

ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১০০ বছর আগের বাঙালির উৎসব বা সামাজিক অনুষ্ঠানের পোশাকের রং কী ছিল, তা আজ স্পষ্টভাবে বলা কঠিন। অথচ চীনারা হাজার বছর ধরে সোনালি ও লাল রঙের প্রতি তাদের সাংস্কৃতিক অনুরাগ ধরে রেখেছে। একটি জাতির নিজস্বতার পরিচয় এভাবেই দীর্ঘ সময় ধরে চর্চা ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে।
চন্দ্র শেখর সাহা বলেন, নকশিকাঁথা, নকশি পিঠা কিংবা তাঁতশিল্পের নকশা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিজাইনারের হাতে তৈরি হয়নি। এগুলো গড়ে উঠেছে দক্ষ কারুশিল্পীদের সৃজনশীলতা, অভিজ্ঞতা ও জীবনযাপনের ধারাবাহিকতায়। তাঁরাই ছিলেন সেই সময়ের প্রকৃত ডিজাইনার ও পরিকল্পক। তাঁদের কাজের মধ্যে পূর্বপুরুষের অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার প্রতিফলিত হয়েছে।
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে নকশা দেখার সুযোগ বেড়েছে। তবে এর ফলে অন্ধ অনুকরণের প্রবণতাও বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, নিজস্ব নকশা ও ঐতিহ্যের চর্চা অব্যাহত না থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাঙালির নিজস্ব নকশার পরিচয় তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়বে।
ঐতিহ্যকে আধুনিক ডিজাইনে রূপান্তরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজন সাধারণ পর্যটক ময়নামতি বা পাহাড়পুরে যান ইতিহাস দেখতে। কিন্তু একজন ডিজাইনার সেখানে যেতে পারেন নতুন নকশার অনুপ্রেরণা খুঁজতে। পাহাড়পুরের টেরাকোটার নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আধুনিক শাড়ির প্রিন্ট তৈরি করা গেলে সেটি শুধু একটি পোশাক থাকবে না, এর সঙ্গে যুক্ত হবে ১ হাজার ৩০০ বছরের ঐতিহাসিক সম্পর্ক। এই সাংস্কৃতিক সংযোগই পণ্যকে আলাদা পরিচয় দিতে পারে।
তাঁর মতে, উদ্যোক্তাদের নিজেদের সৃজনশীলতার সঙ্গে পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে যুক্ত করতে হবে। এ জন্য দেশের জাদুঘর, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনা ও গবেষণার প্রয়োজন। ঐতিহ্য সম্পর্কে যত বেশি জানা যাবে, ডিজাইনে তত বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মবিশ্বাস আসবে।
দেশীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে ভোক্তার সচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে দেশীয় পণ্যের প্রতি আস্থা তৈরি করতে হবে। ভোক্তারা সচেতন হলে দেশীয় উদ্যোক্তারাও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
দেশের ফ্যাশনশিল্পের কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরেন ফ্যাশন এন্টারপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) সভাপতি ও ফ্যাশন হাউস সাদাকালোর প্রতিষ্ঠাতা আজহারুল হক আজাদ। তিনি বলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে ‘নিপুণ’-এর হাত ধরে ফ্যাশন হাউসের যাত্রা শুরু হয়। সেই হিসাবে এই খাতের বয়স ৫৩ বছর। অথচ এত দীর্ঘ সময়েও ফ্যাশনশিল্পে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা, নিজস্ব জরিপ কিংবা তথ্যভান্ডার গড়ে ওঠেনি।

এর কারণ ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের চেষ্টাতেই আজ এ পর্যন্ত এসেছে। তারা সেভাবে কোন সহযোগিতা পায়নি। এমন কি তাদের প্রদেয় ট্যাক্স বা ভ্যাটের সুফলও দেশিয় ব্র্যান্ড পায় না। উপরন্তু আছে বিদেশী পোশাকের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার চাপ। আমাদের পণ্য মানসম্মত হওয়া সত্ত্বেও ভোক্তাদের বিদেশী পণ্য প্রীতি ব্র্যান্ডগুলোর কাজকে কঠিন করে তুলছে।
কোভিড-পরবর্তী সংকট এবং বিদেশি পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতাকে এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন। উদ্যোক্তা ও ডিজাইনারদের যুথবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে এসএমই ফাউন্ডেশনকে শুধু প্রদর্শনী আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশীয় পণ্যের বিপণন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায়ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
ফ্যাশন হাউস বিবিয়ানার প্রধান ও ডিজাইনার লিপি খন্দকার উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, উদ্যোক্তা হওয়া এখন অনেকের কাছে আকর্ষণীয় একটি প্রবণতা। তবে অন্যকে দেখে বা সাময়িক আগ্রহ থেকে এ পেশায় আসা উচিত নয়। নিজের শিকড়, দেশীয় উপাদান এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের ইতিহাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে।

তিনি বলেন, বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা, গবেষণা ও কাঁচামাল সংগ্রহের উৎস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে তারপর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। জামদানি বা খাদির মতো ঐতিহ্যবাহী উপকরণ নিয়ে ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তি ছড়ানো যাবে না। এসব পণ্যের আদি বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখেই নতুন নকশা ও বাজার তৈরি করতে হবে।
পাশাপাশি যেকোন বিষয় অনুপ্রাণিত হওয়া এবং সেটাকে ডিজাইনে রূপান্তরের মানসিকতাও থাকতে হবে। আর গুরুমুখী বিদ্যার কোন বিকল্পও এক্ষেত্রে নেই বলেও তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দক্ষ কারিগরের অভাবের কথা তুলে ধরেন আজুরা বাই শান্তা কবীরের প্রধান শান্তা কবির। মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ডিজাইনারের কল্পনা ও উৎপাদনপর্যায়ের কারিগরের দক্ষতার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে একটি ভালো নকশাও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত রূপ পায় না।

তাই প্রান্তিক কারিগরদের যথাযথ মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক স্বীকৃতি দিতে হবে। তাঁদের শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এতে তাঁদের কাজের প্রতি আগ্রহ ও দায়বদ্ধতা বাড়বে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি পরিবেশবান্ধব ও অর্গানিক টেক্সটাইলকে আধুনিক কাট ও প্যাটার্নের মাধ্যমে নতুনভাবে উপস্থাপনের ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, ঐতিহ্যবাহী উপকরণকে সমসাময়িক ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও তা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে সঞ্চালক শেখ সাইফুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বাজেট প্রণয়নের আগে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্প খাতের দাবি ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলেও ফ্যাশনশিল্পের বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায় না। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি।
তিনি বিদেশি পোশাক আমদানির ক্ষেত্রে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কাস্টমসের সঙ্গে আলোচনা এবং অবৈধভাবে বিদেশি পোশাক প্রবেশ বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি এসএমই ফাউন্ডেশন ও এফইএবির সমন্বয়ে দেশীয় ফ্যাশনশিল্পকে পূর্ণাঙ্গ শিল্পের মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এই খাতের প্রকৃত আকার, উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাধ্যমে একটি বিস্তৃত শুমারি পরিচালনার প্রস্তাবও দেন তিনি।
বৈশ্বিক ফ্যাশনশিল্পে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে পরিবেশগত সংকট ও টেকসই উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে নির্ধারণ করছে শিল্পের ভবিষ্যৎ। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্পকেও প্রস্তুত হতে হবে। তবে সেই প্রস্তুতি যেন নিজস্ব ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিসর্জন দিয়ে না হয়।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশীয় ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন নকশা বা পণ্য তৈরির ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্যের যথাযথ সংরক্ষণ, কারিগরদের দক্ষতা ও মর্যাদা, গবেষণা, কাঁচামালের প্রাপ্যতা, ভোক্তার সচেতনতা এবং নীতিগত সহায়তা। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্প শুধু দেশের বাজারেই শক্ত অবস্থান তৈরি করবে না, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজস্ব পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণকারী ও সঞ্চালককে মঞ্চে আহ্বান জানান এএমই ফাউন্ডেশনের উপমহাব্যবস্থাপক (নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ক্লাস্টার উন্নয়ন) মুহাম্মদ মাসুদুর রহমান।

এরপর সূচনা বক্তব্য রাখেন এএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ক্লাস্টার উন্নয়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, প্রযুক্তি উন্নয়ন) ফারজানা খান। তিনি এই আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি আলোচকদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপান করেন। আলোচনা শেষে সঞ্চালক ও আলোচকদের উপহার প্রদান করেন।
ছবি: হাল ফ্যাশন