
ইতালির পাহাড়ি শহর সান্তারকাঞ্জেলো দি রোমানিয়ার আর্কেডের নিচে বসে কালো পোশাক পরা এক দরজি পেনসিল দিয়ে কাপড়ের ওপর আঁকছেন। কয়েকটি রেখায় তাঁর কাগজে ফুটে উঠছিল একটি লম্বা, ঢেউখেলানো ধর্মীয় পোশাক। এটি নিছক পোশাক নয়—বিশ্বাস, শিল্প আর শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক দৃশ্যমান ভাষা।
এই মানুষটির নাম ফিলিপ্পো সোরচিনেল্লি। ৫১ বছর বয়সী এই ইতালিয়ান ডিজাইনার ২৫ বছর ধরে তাঁর অ্যাটেলিয়ার ল্যাভস–এ তৈরি করছেন ক্যাথলিক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিক পোশাক। তাঁর তৈরি পোশাক পরেছেন পরপর তিন পোপ—ষোড়শ বেনেডিক্ট, ফ্রান্সিস এবং বর্তমান পোপ চতুর্দশ লিও।


সম্প্রতি রিমিনিতে আয়োজিত প্রার্থনায় পোপ চতুর্দশ লিও পরেছিলেন সোরচিনেল্লির তৈরি সবুজ ও সাদা একটি ভেস্টমেন্ট। পোশাকটি তৈরি করা হয়েছে গাঢ় সবুজ সিল্ক দিয়ে। জমিন অলংকৃত হয়েছে সোনালি ও রুপালি সুতা আর সবুজ অ্যাগেট পাথর দিয়ে। এই রঙের ব্যাখ্যাও সোরচিনেল্লির কাছে নিছক নান্দনিকতা নয়। তাঁর ভাষায়, এই গাঢ় সবুজ এমন এক পবিত্র সময়কে ধারণ করে, যা আশা ও সৃষ্টির সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত।
রিমিনির সমুদ্রতীরের প্রেক্ষাপটও নকশায় জায়গা করে নিয়েছে। পোশাকের অলংকরণে তিনি যেন বন্দরের নৌকার পোর্টহোলের প্রতিধ্বনি তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ ধর্মীয় পোশাকও তাঁর কাছে একটি নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও বিশ্বাসের গল্প বলার মাধ্যম।
ভোগ ম্যাগাজিন তাঁকে বলেছে ‘কতুরিয়ার অব দ্য স্যাক্রেড’। তবে ফ্যাশনের জগতের এই পরিচয়ের আড়ালে সোরচিনেল্লির সবচেয়ে বড় প্রেরণা তাঁর বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের শুরু শৈশবে, ইতালির পূর্বাঞ্চলীয় মার্শে অঞ্চলে অবস্থিত নিজের শহর মনদোলফোর অঞ্চলের ছোট্ট একটি গির্জায়। মায়ের সঙ্গে সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে যেতেন তিনি। ধূপের গন্ধ, স্যাক্রিস্টিতে যত্নে রাখা প্রাচীন কাপড় আর গির্জার নীরবতা তাঁর মনে গেঁথে যায়। সেখান থেকেই শুরু তাঁর শিল্পযাত্রা।


তবে সোরচিনেল্লির শিল্প এখন আর শুধু পবিত্র পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অ্যাটেলিয়ার ল্যাভস-এর পোশাক প্যাক করার সময় ধূপের সুগন্ধ ব্যবহারের দীর্ঘদিনের অভ্যাস থেকেই তাঁর সুগন্ধির জগতে প্রবেশ। প্রথম সুগন্ধি ল্যাভস আজও সেই পবিত্র পোশাকের স্মৃতিকে ধারণ করে; এটাই পরবর্তী সময়ে রূপ নেয় আরও বিস্তৃত এক সুগন্ধির জগতে।
সেই যাত্রা এখন পৌঁছে গেছে দৈনন্দিন সৌন্দর্যচর্চাতেও। তাঁর ব্র্যান্ডে রয়েছে বডি ক্রিম, শাওয়ার জেল, সাবানের পাশাপাশি ফেস সিরান ও ফেস ক্রিম। অর্থাৎ যে শিল্প একসময় পোপের শরীরে পরিধেয় পবিত্র পোশাক নির্মাণ করত, এখন তা মানুষের নিজের শরীর ও ব্যক্তিগত পরিসরের জন্যও তৈরি করছে সুগন্ধ ও সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা।


সোরচিনেল্লির নিজের ব্র্যান্ড-দর্শনও এই বিস্তারকে স্পষ্ট করে। এ জন্যই তো তিনি বলেন, ‘নিজের সৃষ্টিকে আমি শুধু বিশেষ সুগন্ধি হিসেবে দেখি না; বরং শিল্পের নানা মাধ্যমের সংমিশ্রণে তৈরি একটি লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবেই দেখতে চাই।’
পোপের পোশাক তৈরি করার প্রক্রিয়াও দীর্ঘ ও সূক্ষ্ম। ভ্যাটিকানের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সম্ভাব্য নকশা ও কাপড়ের নমুনা পাঠানো হয়। একটি পন্টিফিক্যাল ভেস্টমেন্ট তৈরি হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে তিন-চার মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। প্রতিটি নকশায় ধর্মীয় বিধি মেনে চলতে হয়। তবে সোরচিনেল্লির কাছে এসব বিধিনিষেধ নয়; বরং সৃষ্টিশীলতার নির্দিষ্ট পথনির্দেশ।

একসময় তরুণ সোরচিনেল্লির সঙ্গে দেখা হয়েছিল তৎকালীন অগাস্টিনিয়ান পুরোহিত রবার্ট প্রেভস্তের, যিনি আজ পোপ চতুর্দশ লিও। এরপর আর তাঁদের কথা হয়নি। কিন্তু শিল্পীর হাত ধরে তাঁর তৈরি পোশাক এখন পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় মঞ্চে।
সোরচিনেল্লি জানেন না সামনে তাঁর জন্য কী অপেক্ষা করছে। তবে থামার কথা ভাবছেন না। তাঁর বিশ্বাস, শিল্প প্রকাশের এক অফুরন্ত উৎস। আর যত দিন সেই উৎস ফুরিয়ে না যায়, তত দিন তাঁর পেনসিল, কাপড়, সুতা আর বিশ্বাস—সবই চলতে থাকবে।
সূত্র: ফ্যাশন ইউনাইটেড
ছবি: সোরচিনেল্লির ইন্সটাগ্রাম হ্যান্ডল