বনলতা সেন সিনেমায় মমর লাবণ্য হয়ে ওঠা, আলোচিত মেডুসা লুক আর নিজস্ব ফ্যাশন স্টেটমেন্টের গল্প
শেয়ার করুন
ফলো করুন

অভিনেত্রী মাইমুনা ফেরদৌসি মম। রেডিওতে কথাবন্ধু হিসেবে মিডিয়ায় কাজ শুরু এরপর এলেন অভিনয়ে। তার ব্যক্তিত্ব, জীবনবোধ এবং সহজ-সরল জীবনযাপন দর্শকদের কাছে তাকে আলাদা করে পরিচিত করেছে। ক্যারিয়ারের প্রথম চলচ্চিত্র বনলতা সেনে লাবণ্য প্রভা চরিত্রে প্রশংসা পাচ্ছেন দর্শকদের । শৈশবের ঈদ, নিজের ফ্যাশন ও সৌন্দর্যচর্চা,  লাবণ্য দাশগুপ্ত চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে।

ক্যারিয়ারের প্রথম চলচ্চিত্র বনলতা সেনে লাবণ্য প্রভা চরিত্রে প্রশংসা পাচ্ছেন দর্শকদের
ক্যারিয়ারের প্রথম চলচ্চিত্র বনলতা সেনে লাবণ্য প্রভা চরিত্রে প্রশংসা পাচ্ছেন দর্শকদের

বেশিদিন হয়নি কোরবানির ঈদ হয়েছে। একান্ত আলাপচারিতায় এসে পড়ল সে প্রসঙ্গও। এসব কথা বলতে গিয়ে মম নস্টালজিক হয়ে বলেন,  শৈশবের স্মৃতির ভাঁজে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে বাবার সঙ্গে গরুর হাটে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। চাঁদরাতে এলাকার বাড়িগুলো ঘুরে কার গরু সবচেয়ে বড় বা সুন্দর হয়েছে তা দেখার আনন্দ, আর বাবার কাঁধে বসে কোরবানির পশু দেখা। এসব স্মৃতি এখনও তাকে আবেগাপ্লুত করে।“যদি একটা দিনের জন্যও সেই সময়টায় ফিরে যেতে পারতাম, বাবার সঙ্গে আরেকটা ঈদ কাটাতে পারতাম, তাহলে হয়তো খুব ভালো লাগত,” বলেন তিনি। ঈদের সময় রান্না করার সুযোগ খুব একটা না হলেও সুযোগ পেলে পরিবারের জন্য নতুন নতুন পদ রান্না করতে ভালোবাসেন মম। তবে ঈদের খাবারের তালিকায় একটি জিনিস তার চাই-ই চাই মায়ের হাতে রান্না করা গরুর মাংসের বিরিয়ানি। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “এই বিরিয়ানি আমি মাসের তিরিশ দিনও খেতে পারব। এতে আমার কোনো সমস্যা হবে না।”

বিজ্ঞাপন

ট্রেন্ড নয়, স্বাচ্ছন্দ্যই প্রথম পছন্দ

ফ্যাশনের ক্ষেত্রে তিনি কখনোই চলতি ট্রেন্ডের পেছনে ছুটতে চান না। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। শাড়ি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পোশাক। পাশাপাশি কুর্তি, ফতুয়া ধাঁচের পোশাক এবং ওয়ান-পিসও পছন্দ করেন তিনি। তবে সবকিছুর ওপরে শাড়িই তার প্রথম ভালোবাসা।

 শাড়ি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পোশাক
শাড়ি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পোশাক

কাজল, কালো টিপ আর লিপস্টিকেই পূর্ণ সাজ

ক্যামেরার বাইরে মমর সাজগোজ অত্যন্ত সাধারণ। বিয়ে, দাওয়াত কিংবা ঈদ যেকোনো অনুষ্ঠানে তার পছন্দ চোখে কাজল, মাসকারা, কপালে একটি কালো টিপ এবং একটি লিপস্টিক। তার ভাষায়, “এটাই আমার কাছে পরিপূর্ণ মেকআপ।” তবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে চরিত্রের প্রয়োজনে পূর্ণাঙ্গ মেকআপ করতে হয়। যদিও সেই ভারী সাজে খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না তিনি।

রাইস ওয়াটারই তাঁর সৌন্দর্যচর্চার গোপন রহস্য

সৌন্দর্যচর্চার বিষয়ে নিজেকে বেশ অলস বলেই পরিচয় দেন মম। বাজারের নানা প্রসাধনীর চেয়ে ঘরোয়া উপায়েই বেশি আস্থা তার। প্রতিদিনের মেকআপ তোলার জন্য প্রথমে তেল দিয়ে ডিপ ক্লিনজিং করেন, এরপর ফেসওয়াশ ব্যবহার করেন। এর বাইরে তার সবচেয়ে প্রিয় স্কিনকেয়ার উপাদান হলো চাল ভেজানো পানি বা রাইস ওয়াটার। এই পানি তিনি ত্বক ও চুল দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহার করেন। তার বিশ্বাস, এটি ত্বকের জন্য বেশ উপকারী।

রাইস ওয়াটারই তাঁর সৌন্দর্যচর্চার গোপন রহস্য
রাইস ওয়াটারই তাঁর সৌন্দর্যচর্চার গোপন রহস্য

সুগন্ধির সংগ্রহে বিশেষ জায়গা দুই সুগন্ধির

মম নিজেকে ‘স্মেল ফ্রিক’ বলেই পরিচয় দেন। সুগন্ধির প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে। এমনকি কোনো পারফিউম শেষ হয়ে গেলেও বোতলটি স্মৃতি হিসেবে রেখে দেন। তার সংগ্রহে সবচেয়ে প্রিয় দুটি সুগন্ধি হলো গুচ্চি ফ্লোরা ও শ্যানেল কোকো।

বিজ্ঞাপন

বনলতা সেন চলচ্চিত্রে লাবণ্য দাশগুপ্ত চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার গল্পটি বেশ নাটকীয় বলেই মনে করেন মাইমুনা ফেরদৌসি মম। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তিনি প্রথমে অন্য একটি চরিত্রের জন্য অডিশন দিতে গিয়েছিলেন। পরে তাকে লাবণ্য দাশগুপ্ত চরিত্রটির প্রস্তাব দেওয়া হয়। ছবিটির সঙ্গে তিনি একেবারে শেষ মুহূর্তে যুক্ত হন, ফলে চরিত্রটি নিয়ে দীর্ঘ প্রস্তুতির সুযোগও পাননি।

মম বলেন, এই চরিত্রটি তার অভিনয়জীবনের কতটা গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠবে, সেটি দর্শকরাই বিচার করবেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে এটি তার সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর একটি হয়ে থাকবে। কারণ লাবণ্য দাশগুপ্ত শুধুই একটি চরিত্র নন, তিনি একজন বাস্তব মানুষ, যাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা, বিতর্ক এবং ভুল ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে।

বনলতা সেন চলচ্চিত্রে লাবণ্য দাশগুপ্ত চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার গল্পটি বেশ নাটকীয়
বনলতা সেন চলচ্চিত্রে লাবণ্য দাশগুপ্ত চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার গল্পটি বেশ নাটকীয়

অনেকের ধারণা, কবি জীবনানন্দ দাশ-এর জীবনে এসে লাবণ্য হয়তো তার প্রাপ্য ভালোবাসা পাননি কিংবা দাম্পত্য জীবনে নানা দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়েছেন। মমের মতে, এমন টানাপোড়েন প্রায় সব দাম্পত্য জীবনেই কমবেশি থাকে। জীবনানন্দ দাশ এবং লাবণ্য দাশগুপ্তের জীবনও হয়তো তার ব্যতিক্রম ছিল না।

লাবণ্য দাশগুপ্ত চরিত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো অভিনেত্রী জয়া আহসান-এর সঙ্গে তুলনা। তবে মম মনে করেন, এই তুলনা না করাই শ্রেয়। তার ভাষায়, জয়া আহসান দীর্ঘদিন ধরে নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে একটি অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন। তিনি ঝরা পালক চলচ্চিত্রে লাবণ্য দাশগুপ্তকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন করেছেন, যা দর্শকদের ভালো লেগেছে।

লাবণ্য দাশগুপ্তকে নিজের উপলব্ধি, পাঠ এবং অনুভূতির আলোকে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মম
লাবণ্য দাশগুপ্তকে নিজের উপলব্ধি, পাঠ এবং অনুভূতির আলোকে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মম

মমর বিশ্বাস, বাস্তব চরিত্রকে ভিন্ন ভিন্ন শিল্পী ভিন্নভাবে ধারণ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। তিনি নিজেও লাবণ্য দাশগুপ্তকে নিজের উপলব্ধি, পাঠ এবং অনুভূতির আলোকে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাই কে ভালো করলেন, কে কম ভালো করলেন—এই তুলনার চেয়ে চরিত্রটিকে কতটা আন্তরিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। কারণ এটি কোনো প্রতিযোগিতা নয়; বরং একটি ঐতিহাসিক ও বাস্তব চরিত্রকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস।

অন্যদিকে, চলচ্চিত্রে মেডুসা রূপের দৃশ্য নিয়েও ছিল দর্শকদের কৌতূহল। মম জানান, শুটিংয়ের সময় তিনি নিজেও জানতেন না পর্দায় সেই দৃশ্যটি শেষ পর্যন্ত কেমন দেখাবে। দৃশ্যটি মূলত একটি স্বপ্নের সিকোয়েন্স হিসেবে ধারণ করা হয়েছিল। শুটিংয়ের সময় তার চুল কিছুটা কোঁকড়ানো করে সাজানো হয়েছিল। পরে ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস ও অ্যানিমেশনের মাধ্যমে মেডুসার রূপটি তৈরি করা হয়। চূড়ান্ত সম্পাদনার পর পর্দায় মেডুসাকে দেখে তিনিও দর্শকদের মতোই বিস্মিত হয়েছিলেন। 

মেডুসা রূপে লাবণ্যকে নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে
মেডুসা রূপে লাবণ্যকে নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে

অভিনয়ের বাইরেও  অবসরে গান শোনা, বই পড়া এবং রান্না করা মমের সবচেয়ে প্রিয় কাজ। তবে এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয়কে তিনি নিজের শখ বলে মনে করেন চিন্তা করা। তার ভাষায়, “আমি ভাবতে খুব পছন্দ করি। এজন্য কখনো খুব চুপচাপ থাকি, আবার কখনো অনেক কথা বলি। কেউ আমাকে ইন্ট্রোভার্ট মনে করেন, কেউ এক্সট্রোভার্ট।”

হাল ফ্যাশনের পাঠকদের উদ্দেধ্যে মম বলেন, বিনোদনকে শুধু সহজ আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাহিত্য, চিন্তা ও শিল্পবোধের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার চেষ্টা করা। তার বিশ্বাস, সুস্থ বিনোদন এবং সাহিত্যবোধ একসঙ্গে এগিয়ে গেলে দর্শকও সমৃদ্ধ হবে, শিল্পও আরও সমৃদ্ধ হবে।

ছবি: মাইমুনা ফেরদৌসি মম

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৩: ০০
বিজ্ঞাপন