
আজকালকার কিশোরদেরকে নিয়ে বড়দের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছে, তারা মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম আর ভার্চুয়াল জগতে ডুবে থাকে। শহরের মাঠগুলো আজকাল কিশোরদের কোলাহলে নয়, বরং অনাকাঙ্ক্ষিত আড্ডা আর পণ্যের মেলায় যেন বেশি মুখর থাকে। নব্বইয়ের দশকে যে মাঠ, বাড়ির উঠান কিংবা ছাদ মুখর থাকত বৌ-চি, হাডুডু, টিলো-এক্সপ্রেস, ফুল টোক্কা কিংবা ক্রিকেট-ফুটবলের হৈচৈয়ে, সেখানে এখন আলো জ্বলে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে।

এই বাস্তবতার মাঝেই যেন অন্যরকম এক গল্প হয়ে সামনে এসেছে ঢাকার ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্র অরণ্য তৌফিক। বয়স মাত্র ১৬। কিন্তু এই বয়সেই সে অংশ নিয়েছে চট্টগ্রামের ১১৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলায়। শুধু অংশ নেওয়াই নয়, নিজের প্রথম ম্যাচেই হারিয়েছে নিজের চেয়ে ১২ বছরের বড় প্রতিপক্ষকে।
লালদিঘী ময়দানে শত শত দর্শকের সামনে এই কিশোরের আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি অবাক করেছে অনেককেই। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ১০৮ জন বলির ভিড়ে সবচেয়ে কম বয়সী প্রতিযোগী হয়েও অরণ্য হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
এই নিয়ে একান্ত আলাপচারিতায় কথা হলো অরণ্যর সঙ্গে। তার এই অসাধারণ জার্নির গল্পটা শুরু হয় বইয়ের পাতা থেকে। স্কুলের বইয়ে পড়েই প্রথম জানতে পারে জব্বারের বলী খেলার কথা। তারপর টেলিভিশনে রেসলিং দেখতে দেখতে তৈরি হয় আগ্রহ। গত তিন বছর ধরে নিজেই অনুশীলন করেছে রেসলিংয়ের নানা কৌশল।
অরণ্য বলছিল,“আমি সব সময় চেয়েছি শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী একজন মানুষ হতে। ভার্চুয়াল গেম খেলার চেয়ে আমার কাছে শরীরচর্চা আর ফাইটিং স্কিল শেখা বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।”

ঢাকা থেকে কোচ ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী সামিরকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামে আসে সে। লালদিঘী ময়দানে প্রথমবার প্রবেশের অভিজ্ঞতা এখনও তার চোখে বিস্ময় হয়ে আছে। চারপাশে হাজারো দর্শক, বলীদের হাঁকডাক, মাটির গন্ধ আর এক ধরনের লোকজ উন্মাদনা সব মিলিয়ে যেন রোমান গ্ল্যাডিয়েটরদের টান টান উত্তেজনার এক দেজাভু তৈরি করে।
প্রথম ম্যাচে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন হালিশহরের মোহাম্মদ মানিক। বয়সে ১২ বছরের বড়, অভিজ্ঞতাতেও অনেক এগিয়ে। ম্যাচের আগে অরণ্য ফেসবুকে প্রতিপক্ষের রেসলিং ভিডিও দেখেছিল। যদিও জানত না শেষ পর্যন্ত তাকেই প্রতিপক্ষ হিসেবে পাবে।
ম্যাচে নামার আগে তার মনে ছিল একটাই চিন্তা। হারলেও যেন ভালো একটা লড়াই দিতে পারে। কিন্তু সেই লড়াই শেষ পর্যন্ত বদলে যায় জয়ে। মাত্র এক মিনিটের কিছু বেশি সময়ের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে অরণ্য। জয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে দেখা যায় আবেগে কোচকে জড়িয়ে ধরতে।
অরণ্য বলছিল,“আমি জানতাম উনি অনেক বড় আর শক্তিশালী। প্রথমে একটু ভয় কাজ করছিল। কিন্তু আমি সাহস হারাইনি। জেতার পর আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে।”
এই অর্জনের পেছনে পরিবারও ছিল বড় শক্তি। অরণ্যের ভাষায়,“আমার আব্বু-আম্মু সব সময় আমাকে সাপোর্ট করেছে। আমি যা করতে চেয়েছি, তারা পাশে থেকেছে।”

অরণ্যর ফিটনেস রুটিন
রেসলিং এমন একটি খেলা যেখানে শুধু কৌশল নয়, প্রয়োজন অসাধারণ শারীরিক শক্তি, সহনশীলতা এবং মানসিক দৃঢ়তা। আর সেই কারণেই নিজের ফিটনেস রুটিন নিয়ে বেশ সিরিয়াস তরুণ রেসলার অরণ্য তৌফিক। নিয়মিত স্ট্রেংথ ট্রেনিং, পাওয়ার লিফটিং, রেসলিং ড্রিল থেকে শুরু করে পর্যাপ্ত ঘুম—সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দেন তিনি।
ফিটনেস রুটিন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অরণ্য জানান, রেসলিংয়ে মাসল বিল্ডআপ এবং শরীরের শক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই সপ্তাহে দুইদিন তিনি স্ট্রেংথ ট্রেনিং ও পাওয়ার লিফটিং করেন। পাশাপাশি নিয়মিত রেসলিং গ্র্যাপলিংও করা হয়। এছাড়াও সপ্তাহে দুইদিন বাসায় শ্যাডো রেসলিং ও বক্সিং প্র্যাকটিস করেন।
তার ট্রেনিং রুটিন বেশ কঠিন এবং পরিকল্পিত। রবি ও মঙ্গলবারের ওয়ার্কআউট আলাদা ভাগ করা থাকে।
রবিবারের রুটিনে থাকে ডেডলিফট, ব্যাটল রোপ, স্কোয়াটসহ বিভিন্ন পুলিং ওয়ার্কআউট। অন্যদিকে মঙ্গলবার থাকে পুশিং ওয়ার্কআউট—যেখানে বেঞ্চ প্রেস, বডিওয়েট পুশআপ এবং পুলআপের মতো এক্সারসাইজ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
অরণ্য জানান, তার কোচ ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরী সবসময় তাকে আরও ভালো করার জন্য উৎসাহ দেন এবং কঠিন ট্রেনিংয়ে পুশ করেন। যেহেতু অরণ্য হেভিওয়েট ক্যাটাগরিতে খেলেন, তাই তার ট্রেনিং রুটিনও তুলনামূলক বেশি কঠিন।
নিজের শারীরিক গঠন নিয়ে আত্মবিশ্বাসী অরণ্যবলেন, “আমার বডিফ্রেম অন্যদের তুলনায় বR। স্ট্রেংথও বেশি। এজন্য জিমে সবাই আমাকে অনেক অ্যাপ্রিশিয়েট করে এবং উৎসাহ দেয়।”
কী ডায়েট অনুসরণ করে অরণ্য
ডায়েট প্রসঙ্গে অরণ্য জানান, বর্তমানে তিনি খুব কঠিন কোনো ডায়েট অনুসরণ করছেন না। তবে ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের দিকে বেশি গুরুত্ব দেন, যাতে মাসল স্ট্রেংথ বজায় থাকে।
ঘুমের বিষয়টিকেও তিনি রেসলিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন। তার ভাষায়, “রেসলিংয়ের জন্য মাসল রিকভারি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমি চেষ্টা করি অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করতে।”

অরণ্য সাধারণত রাত ১২টার দিকে ঘুমান এবং সকাল ৯টা বা ১০টার দিকে ঘুম থেকে ওঠেন, যাতে শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়।
যারা ছোট বয়সে রেসলিং শুরু করতে চায়, তাদের জন্যও পরামর্শ দিয়েছেন অরণ্য। তিনি বলেন, “ভালো কোনো রেসলিং জিমে ভর্তি হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি বাংলাদেশের রেসলিং টিমের সঙ্গে ক্যাম্পিং করার সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে সেটা অনেক সাহায্য করে। আমি নিজেও এভাবেই শিখেছি।”
সবশেষে তরুণদের উদ্দেশে তার বার্তা, “আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নিয়মিত ট্রেনিং চালিয়ে যেতে হবে।”
জব্বারের বলীখেলা শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়, এটি চট্টগ্রামের লোকঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় মানুষের শারীরিক সক্ষমতা ও সাহস বাড়ানোর উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছিল এই খেলা। সেই শতবর্ষী মঞ্চে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মের একজন কিশোর যখন নিজের জায়গা তৈরি করে নেয়, তখন সেটি নিছক ব্যক্তিগত জয় থাকে না, এটি হয়ে ওঠে সময়ের বিপরীতে এক আশার গল্প।
অরণ্য এখন আরও বড় স্বপ্ন দেখে। ভবিষ্যতে পেশাদার রেসলার হতে চায় সে। তার বিশ্বাস, সাহস আর নিয়মিত অনুশীলন থাকলে বয়স কোনো বাধা নয়।
অরণ্যের গল্প আমাদের আশাবাদী করে। যখন আমরা আমাদের কিশোরদের নিয়ে হতাশায় ভুগি, তখন অরণ্য যেন এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে সামনে আসে। কৃত্রিমতার ভার্চুয়াল জগত নয়, আমাদের শিশু-কিশোররা শেকড়কে আঁকড়ে ধরে বেড়ে উঠুক এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
ছবি: অরণ্য ও ইন্সটাগ্রাম