নাটকীয়তাই প্রেরণা পোশাক নকশার
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সাগুফতা ওসমান বর্তমানে বাংলাদেশের ফ্যাশনের জগতে জনিপ্রয় নাম। তার তারকাদের কাছে তাঁর কদর কতটা সেটা বেশ বোঝা যায় কোন উৎসব বা ইভেন্ট হলে। যে কোন উপলক্ষে সাফা কবির, নুসরাত ফারিয়া, হৃদি শেখ, লুইপার মতো তারকারা বেছে নেন সাগুফতা ওসমানের ডিজাইন করা ফরমায়েশি সব এক্সক্লুসিভ আউটফিট।

সাগুফতা ওসমানের সিগনেচার স্টাইল হচ্ছে ক্ল্যাসিক গাউনে শাড়ির মতো ড্রেপিং। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাগুফতা স্মৃতি হাতড়ে জানান, ২০১৭-১৮ সালের দিকে যখন নতুন কী কাজ করা যায়, তা নিয়ে ভাবছিলেন। তখনই হঠাৎ এ শাড়ি-প্রাণিত গাউন নিয়ে কাজ করার কথা তাঁর মাথায় আসে। সাগুফতা নিজে শাড়ি আর গাউন—এই দুটি পোশাক পরতে খুবই ভালোবাসেন। তাই ফিউশন ঘটিয়ে এই দুই ঘরানার পোশাকের আমেজ এক জায়গায় আনেন তিনি। নিজের পছন্দের সঙ্গে তাল-লয় না মিললে তিনি ডিজাইন করে স্বাচ্ছন্দ্য পান না, জানালেন সাগুফতা।

বিজ্ঞাপন

এই সৃজনশীল পেশার অনুপ্রেরণাটি এল কীভাবে, এ প্রশ্নের জবাবে সাগুফতা ফিরে যান শৈশবের দিনগুলোতে। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায়ও চিত্রাঙ্কনে পুরস্কার পেয়েছেন। এরপর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আঁকআঁকির পাশাপাশি নিজের পোশাক নিজেই ডিজাইন করা শুরু করেন। ব্যতিক্রমধর্মী ডিজাইনের কারণে এ পোশাকগুলো তাঁর আত্মীয় ও বন্ধুমহলে বেশ প্রশংসা পেত। আর সেখান থেকেই ডিজাইনার হওয়ার অনুপ্রেরণা এসেছে বলে জানান সাগুফতা।

কথোপকথনের একপর্যায়ে সাগুফতা জানালেন একটি মজার তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিছক মজাচ্ছলেই নিজের কাজ প্রথম সবার সামনে আনেন তিনি। ২০১১ সালে ঈদ সালামির ২০ হাজার টাকা জমিয়ে তা দিয়ে ৫টি টপ বানান তিনি। বাসার ছাদে সে টপ পরিয়ে বন্ধুদের ছবি তুলে ফেসবুকে একটা গ্রুপ খুলে সেগুলো আপলোড করলেন। অবাক হয়ে দেখলেন, অনেকেই সেই টপগুলো অর্ডার করছেন। তিনিও উৎসাহ নিয়ে বানাতে থাকলেন। একসময় ফেব্রিক ও ম্যাটেরিয়াল ফুরিয়ে গেল। তখনই তিনি বুঝতে পারলেন, কাজ করতে হবে সঠিকভাবে। এরপরই একজন প্রফেশনাল ডিজাইনার হিসেবে ম্যাটেরিয়াল ও ফেব্রিক সোর্সিং শুরু করেন। সে সময় ফেসবুক গ্রুপে পাঁচ হাজারের মতো সদস্য ছিল তাঁর, যা বেশ একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিল তখন। এরপর ২০১৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কাজ নিয়মিত প্রদর্শন করতে শুরু করেন এবং একেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর ধীরে ধীরে নিজস্ব দরজি, নিজের ফ্যাক্টরি গড়ে তোলেন সাগুফতা।

বিজ্ঞাপন

সাগুফতার পোশাকে ফ্রিঞ্জ, ফেদার, সিকুইনসের প্রাধান্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি অকপটে উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই জানান তাঁর অনুপ্রেরণা মনীষ মালহোত্রার কথা। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে তিনি তাঁর আইডল ডিজাইনার মনীষ মালহোত্রার কাছেই এক বছর প্রশিক্ষণ নেন। ভারতের বন্ধুদের সহায়তায় তাঁর কোর্সে ভর্তি হয়ে দ্রুতই শিখে নেন ডিজাইনিংয়ের খুঁটিনাটি। অদম্য উৎসাহ ও কাজের পূর্বাভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করেছিল। ছোটবেলা থেকে বলিউড তারকাদের পোশাক-আশাকের ব্যাপারগুলো সাগুফতাকে খুব টানত। তিনি বলেন, ‘মনীষ মালহোত্রার ডিজাইন করা পোশাক দেখে বড় হয়েছি, যা আমাকে অনুপ্রেরণা দিত। বলিউডের পোশাক দেখলে ভাবতাম, আমি এ রকম কিছুই বানাতে চাই।’

তবে পোশাকে এত ফ্রিঞ্জ ও ফেদার ব্যবহার করা আসলে খুবই ব্যয়সাপেক্ষ। তবু নিজস্ব স্টাইলকে প্রাধান্য দিয়ে কোনো ছাড় না দিয়েই তিনি পোশাক ডিজাইন করেন। তাই মানুষ বেশি দাম দিয়ে হলেও কিনছে তাঁর কাপড়, বেশ সন্তুষ্টি নিয়ে জানালেন সাগুফতা।

সাগুফতা বলেন, তাঁর প্রতিটি ডিজাইনেই ড্রামা থাকে, গল্পও থাকে। ডিটেইলিংয়ের ব্যাপারে তিনি অনেক বেশি সচেতন। তাঁর পছন্দের ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে শ্যানেল, গুচি ও বুলগারি।

বাটারফ্লাই বাই সাগুফতার একটি বিশেষত্ব হলো থিমভিত্তিক কালেকশন। ২০১৩ থেকে এ পর্যন্ত এমন অনেক কালেকশন এসেছে। এর মধ্যে বেশ স্মরণীয় একটি কালেকশন হলো ডিজনি প্রিন্সেস কালেকশন, যা ২০১৬ সালে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে লঞ্চ করা হয়। এ নিয়ে সাগুফতা ওসমান বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আমার ইচ্ছা ছিল, ডিজনির রাজকন্যাদের মতো পোশাক বানাব। বড় হয়ে সেই শখ পূরণ করেছি দেশি ডিজনি প্রিন্সেস কালেকশন তৈরির মধ্য দিয়ে।’

২০১৪ সালে ‘গডেস আনলিশড’ নামের কালেকশন করার পর সাগুফতা একটি ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। তখনো নিজস্ব কোনো দোকান না থাকায় ছোট পরিসরে আয়োজিত এ প্রদর্শনী লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল। এরপরই বাটারফ্লাই বাই সাগুফতা সবার মধ্যে এতটা পরিচিত হয়ে ওঠে, বলেন সাগুফতা।

সম্প্রতি নিজের করা সবচেয়ে পছন্দের কালেকশনের কথা বলতে গিয়ে ‘সিলভার স্ক্রিন’ লাইনের প্রসঙ্গ টানেন তিনি। ২০১৮ সালে লঞ্চ করা এ কালেকশনের থিম ছিল ড্রামা। পোশাকগুলো রেড কার্পেটে পরা যায় এমনভাবে তৈরি। পোশাকের নামগুলোও সিনেমাটিক থিমে রাখা। যেমন পেজ থ্রি, প্রিমিয়ার, থিয়েটার। প্রসঙ্গক্রমে সাগুফতা জানান, এটি তাঁর অন্তরের খুব কাছের একটি কালেকশন।

বিভিন্ন বড় ইভেন্টে সেলিব্রিটিরা তাঁর ডিজাইন করা পোশাক পরে রেড কার্পেটে হাঁটছেন, টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পারফরম্যান্সের পোশাক তৈরির জন্যও সেলিব্রিটিরা তাঁর দ্বারস্থ হয়ে থাকেন। যেমন এ বছর মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের আয়োজনে বিদ্যা সিনহা মীম সাগুফতার ডিজাইন করা কালো জামদানি শর্ট লেহেঙ্গা পরে ‘নাসেক নাসেক’ গানে পারফর্ম করেন। কিছুদিন আগে মুক্তি পেল এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত গান ‘বেণি খুলে’।

এখানে মডেল হিসেবে নৃত্য পরিবেশন করেন হৃদি শেখ। তাঁর পরনে ছিল ‘এক্সোটিক সাইড স্লিট বডি হাগিং ড্রেস’, যার ডিজাইনার সাগুফতা। এ ছাড়া কোক স্টুডিওতেও তাঁর ডিজাইন করা পোশাক পরে সংগীতশিল্পীরা পারফর্ম করেন। সেলিব্রিটিদের আস্থা অর্জন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই সবকিছুই হয়েছে নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে। দেখা গেছে, আমার ডিজাইন একজন পরেছেন। তাঁর মাধ্যমে অন্য অনেকে আমার ডিজাইন সম্পর্কে জেনেছেন।

তাঁরা কোনো ইভেন্টের আগে আমার সাথে দেখা করেন। কেউ চাইলে আমার কালেকশনে থাকা পোশাকও বেছে নেন। অথবা নিজের পছন্দ সম্পর্কে আমাকে বলেন, আমি সে অনুযায়ী একটি ড্রেস ডিজাইন করে দিই। সত্যি বলতে, এখন বাংলাদেশের সেলিব্রিটিরা নিজেদের ফ্যাশন নিয়ে বেশ সচেতন। তাঁরা জানেন, ভক্তরা তাঁদের পোশাক-আশাক অনুসরণ করেন। কে কী পরল, তা নিয়ে আলোচনা হয়। তাই তাঁরাও সেই অনুযায়ী নিজেকে সাজাতে চান। আর আমি যে ধরনের ইউনিক ডিজাইন করার চেষ্টা করি, তা অনেক সেলিব্রিটিই পছন্দ করেন।’

ভবিষ্যতে নিজের ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেখতে চান বলেও জানান সাগুফতা ওসমান।

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২২, ০৮: ০০
বিজ্ঞাপন