
‘চা তো শুধু একটি পানীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মাটি, মানুষ আর স্মৃতি।’ ছোটবেলায় সমরেশ মজুমদারের লেখা পড়েছেন—এমন পাঠকের সামনে চা-বাগানের ছবি ভেসে উঠলে হয়তো মনে পড়ে যাবে ডুয়ার্সের সবুজ চা-বাগান। অনিমেষের মতো চায়ের গন্ধে নিজের ভেতরটাকে আর প্রকৃতিকে উদযাপন করার অনুভূতি, চায়ের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্কটাও অনেকটা তেমন। কারও কাছে চা মানে ভালো একটি দিনের শুরু, কারও কাছে ব্যস্ত দিনের ফাঁকে নিজের জন্য একটু সময়, আবার কারও কাছে এক কাপ চা মানেই দিনের ক্লান্তি ভুলে প্রিয় মানুষের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করা। চায়ের এই আবেগকে সঙ্গে নিয়েই পথ চলছে টিংকার্স টি।

বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল। সবুজ পাহাড়, সারি সারি চা-গাছ, ভোরের শিশির আর ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’র চিরচেনা গল্প। সেই শ্রীমঙ্গলের মাটিতেই গড়ে উঠেছে টিংকার্স টি। এটি শুধু একটি চায়ের ব্র্যান্ড নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক অভিজ্ঞতা, একজন নারীর স্বপ্ন, চায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং একটি প্রশ্ন।আর তা হলো, যে দেশের মাটিতে এত যত্নে উন্নত মানের চা উৎপাদিত হয়, সেই দেশের মানুষই কেন সব সময় সেই সেরা চায়ের স্বাদ পাবেন না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই টিংকার জান্নাতের নতুন যাত্রা। দীর্ঘদিন ব্র্যান্ড ও বিপণন নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা, শ্রীমঙ্গলের চা ব্যবসার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক এবং শাশুড়ির পরামর্শ ও উৎসাহ—সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে শুরু হয় টিংকার্স টির পথচলা। আজ সেই পথচলা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে আরও বড় পরিসরে। শ্রীমঙ্গলের বাছাই করা সেরা বাগানের চা দেশের চা-প্রেমীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি খুব শিগগিরই স্বপ্ন, ইউনিমার্টের মতো বড় সুপারশপেও পাওয়া যাবে টিংকার্স টি। টিংকার জান্নাতের সঙ্গে একান্ত কথোপকথনে উঠে এল সেই স্বপ্নের গল্প।

শ্রীমঙ্গল আমার শ্বশুরবাড়ি। আমার শ্বশুরবাড়ির পরিবার কয়েক দশক ধরে চা রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ফলে পারিবারিকভাবেই চা ব্যবসা ও চা উৎপাদনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। একটা বিষয় আমাকে সব সময় ভাবাত। বাংলাদেশে যে চা এত যত্ন করে উৎপাদিত হয়, তার সেরা মানের অনেকটাই বিদেশে চলে যায়। অথচ আমাদের দেশের চা-প্রেমীদের হাতে সেই প্রিমিয়াম মানের চা কতটা পৌঁছায়? সেখান থেকেই ভাবলাম, বিদেশে রপ্তানি হবে, সেটা অবশ্যই ভালো। কিন্তু দেশের মানুষও তো আমাদের সেরা চায়ের স্বাদ পাওয়ার অধিকার রাখেন। সেই ভাবনা থেকেই টিংকার্স টি।

চায়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা খুব ব্যক্তিগত। চা মানে শুধু স্বাদ নয়। কারও কাছে সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম চুমুক, কারও কাছে অফিসের বিরতিতে একটু স্বস্তি, আবার কারও কাছে বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে গল্পের মুহূর্ত। আমরা সেই আবেগটাকে সম্মান করতে চাই। শ্রীমঙ্গলের বাছাই করা ভালো মানের চা যেন মানুষের হাতে পৌঁছায়, সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

আমি মার্কেটিং নিয়ে পড়াশোনা করেছি। ২০১৪ সালে আমার ক্যারিয়ার শুরু। দীর্ঘ সময় ব্র্যান্ড প্রমোশন নিয়ে কাজ করেছি। নিজের উদ্যোগ চালিয়েছি এবং অনেক উদ্যোক্তার খুব কাছ থেকে তাঁদের সাফল্য, ব্যর্থতা ও সংগ্রাম দেখেছি। প্রায় ১২ বছরের পথচলায় একটা বিষয় খুব গভীরভাবে বুঝেছি—ভালো একটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে টাকা লাগে, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস তৈরি করতে লাগে চরিত্র।
টাকা দিয়ে সুন্দর অফিস করা যায়, প্যাকেজিং করা যায়, বিজ্ঞাপন দেওয়া যায়। অনেক মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছানো যায়। কিন্তু টাকা দিয়ে একজন মানুষকে আপনার ওপর বিশ্বাস করানো যায় না। বিশ্বাস তৈরি হয় খুব ছোট ছোট জায়গা থেকে। আপনি কথা রাখছেন কি না, ভুল হলে স্বীকার করছেন কি না, একজন গ্রাহকের অভিযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন কি না, কেউ দেখছে না তবুও পণ্যের মান ঠিক রাখছেন কি না, সুযোগ পেয়েও কাউকে ঠকাচ্ছেন কি না—আমার কাছে একটি ব্র্যান্ডের আসল চরিত্র তৈরি হয় এসব জায়গাতেই।

গুণমান। শুরু থেকেই আমি পরিষ্কার ছিলাম, মানের সঙ্গে কোনো আপস করব না। আমাদের শর্ত হচ্ছে, উন্নত মানের চা চা-প্রেমীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। চা সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, প্যাকেজিং এবং মান নিয়ন্ত্রণের প্রতিটি ধাপ আমরা যতটা সম্ভব নিজেরা দেখে, বুঝে ও শিখে এগিয়ে যাচ্ছি। কারণ একজন মানুষ যখন নিজের টাকা দিয়ে এক প্যাকেট চা কেনেন, তখন তিনি শুধু একটি পণ্য কেনেন না। তিনি তাঁর বিশ্বাসটাও আমাদের হাতে তুলে দেন।

আমার জানামতে, বাংলাদেশে চা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করা নারীদের মধ্যে আমি একটি ব্যতিক্রমী জায়গায় আছি। টিংকার্স টির আরেকটি বিশেষ দিক হলো, কর্মী পর্যায় থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত এখানে নারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে।আমি দীর্ঘদিন ধরে নারীদের নিয়ে কাজ করছি। আমি বিশ্বাস করি, নারীরা অনেক সময় সমস্যাকে অন্যভাবে দেখতে পারেন। তাঁদের সৃজনশীল চিন্তা, ধৈর্য এবং সূক্ষ্ম বিষয় খেয়াল করার ক্ষমতা একটি ব্র্যান্ডকে এগিয়ে নিতে পারে। নারীরা এগিয়ে গেলে দেশও এগিয়ে যাবে। তাই নারীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করাটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক বেশি। একজন মানুষ যখন দোকান থেকে একটি প্যাকেট হাতে নেন, তখন হয়তো তাঁর কাছে সেটা শুধু এক প্যাকেট চা। কিন্তু আমার কাছে সেই প্যাকেটের পেছনে রয়েছে অনেক রাত জাগা, অনেক সিদ্ধান্ত, অনেক অপেক্ষা এবং অনেক শেখার গল্প। ভুল প্রিন্টারের কাছে গিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষা করা, নতুন মেশিনের জন্য অগ্রিম দিয়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করা, নিজের কারখানা দাঁড় করানো, নতুন উৎপাদন লাইন চালু করা, খাদ্যোপযোগী প্যাকেজিংয়ে যাওয়া, লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিনিয়ত শেখা—সবকিছুই এই পথচলার অংশ। অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, এত কষ্ট করে কী লাভ? আমি বলি, যদি সহজ পথটাই খুঁজতাম, তাহলে হয়তো টিংকার্স টি শুরুই করতাম না।

একজন অপরিচিত মানুষ যখন আমাদের চা খেয়ে আরেকজনকে বলেন, ‘আপনি এটা খেয়ে দেখুন’, তখন আমার খুব ভালো লাগে। কেউ নিজের টাকা দিয়ে আবার চা কিনছেন। কেউ বিদেশে থাকা আত্মীয়কে পাঠাচ্ছেন। কেউ আমাদের চায়ের মান নিয়ে অন্য কারও সঙ্গে আলোচনা করছেন। এগুলোই আমার কাছে বড় পাওয়া। একজন মানুষকে একবার পণ্য কেনানো হয়তো বিপণনের দক্ষতা। কিন্তু সেই মানুষটি যখন নিজের ইচ্ছায় আবার ফিরে আসেন এবং ভালোবেসে অন্য একজনকে আপনার কথা বলেন, সেটাই বিশ্বাস।
বর্তমানে কী কী চা নিয়ে কাজ করছেন?

বর্তমানে আমাদের তিনটি প্রধান চা রয়েছে—প্রিমিয়াম গোল্ড টি, স্পেশাল ব্ল্যাক টি এবং স্পেশাল গ্রিন টি। ১০০, ২০০ ও ৪০০ গ্রামের প্যাক রয়েছে। দাম শুরু হচ্ছে ৮৫ টাকা থেকে। আমরা চাই, ভালো মানের চা যেন শুধু বড় বাজেটের মানুষের জন্য না হয়। সাধ্যের মধ্যে থেকেও যেন মানুষ নিজের জন্য কিংবা প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার জন্য ভালো একটি চা বেছে নিতে পারেন।
আমরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কথাও ভাবি। অনেক উদ্যোক্তা আমাদের বলেন, তাঁরা করপোরেট ক্রেতা বা বিশেষ কাউকে উপহার দিতে চান, কিন্তু বাজেট সীমিত। সেই ভাবনা থেকেই ৪০ টাকার একটি উপহারের বাক্স যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে তুলনামূলক কম খরচেও সুন্দর একটি উপহার তৈরি করা যায়। আমাদের কাছে এটা শুধু বিক্রির বিষয় নয়। মানুষের প্রয়োজনটা বোঝার চেষ্টা করছি আমরা।

টিংকার জান্নাত হেসে বললেন, ‘শুধু চা নয়।’ এটা আমার কাছে একটা স্বপ্ন। অনেক রাত জাগা, অনেক ভুল, অনেক শেখা, অনেক মানুষের ভালোবাসা এবং অনেক দোয়ার মিশেল। আমি যখন কারখানায় দাঁড়িয়ে একটি টিংকার্স টির প্যাকেট হাতে নিই, তখন শুধু একটি পণ্য দেখি না। দেখি পুরো পথচলাটা। কতটা পথ পেরিয়ে এই প্যাকেটটি মানুষের হাতে পৌঁছাচ্ছে, সেই গল্পটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হয়তো একদিন টিংকার্স টি অনেক বড় হবে। হয়তো পথটা আরও দীর্ঘ হবে। কিন্তু আমি চাই, যত বড়ই হই না কেন, একজন মানুষ যখন আমাদের চায়ের কাপ হাতে নেবেন, তখন যেন মনে হয়, এই চায়ের সঙ্গে শুধু চা নয়, আমাদের সততা, পরিশ্রম আর ভালোবাসাটাও পৌঁছে গেছে।
চায়ের গল্প শুরু হয় শ্রীমঙ্গলের সবুজ বাগানে। পাতার গায়ে জমে থাকে শিশির, বাতাসে মিশে থাকে চায়ের সুবাস। সেই গল্পই এখন বাংলাদেশের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চান টিংকার জান্নাত মীম। কারও কাছে সেই চা হবে সকালের সুন্দর শুরুর সঙ্গী, কারও কাছে বিকেলের অবসরের সঙ্গী, আবার কারও কাছে প্রিয় মানুষের সঙ্গে গল্প করার অজুহাত। আর টিংকার্স টির কাছে প্রতিটি কাপ হয়ে উঠবে একটি প্রতিশ্রুতি—ভালো মানের চা মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। শ্রীমঙ্গলের মাটি থেকে উঠে আসা সেই স্বপ্নের পথচলা তাই থেমে নেই। চা-বাগান থেকে কারখানা, কারখানা থেকে প্যাকেট, আর প্যাকেট থেকে মানুষের কাপ—প্রতিটি ধাপে টিংকার্স টি ধরে রাখতে চায় তার শিকড়ের গল্প এবং মানুষের বিশ্বাস।
ছবি: হাল ফ্যাশন ও টিংকার জান্নাত

হ্যাঁ। আমরা চাই টিংকার্স টি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাক। খুব শিগগিরই স্বপ্ন, ইউনিমার্টের মতো বড় সুপারশপে আমাদের চা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় আরও সহজে যেন মানুষ টিংকার্স টি কিনতে পারেন, সেই পরিকল্পনাও রয়েছে। আমরা ধীরে এগোতে চাই, কিন্তু সুন্দরভাবে এগোতে চাই।

স্বপ্ন তো অনেক বড়। আমি চাই, টিংকার্স টি একদিন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছাক। তবে খুব দ্রুত বড় হওয়ার চেয়ে আমি শক্ত একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে চাই। আমি চাই, মানুষ যখন টিংকার্স টি নামটি শুনবেন, তখন তাঁদের মনে প্রথমেই আসবে গুণমান ও বিশ্বাস। ব্র্যান্ড কত বড় হলো, কত বিক্রি হলো, কত অনুসারী হলো—এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষ যেন নিশ্চিন্তে বলতে পারেন, ‘এই ব্র্যান্ডের ওপর ভরসা করা যায়।’
আমাদের শ্রীমঙ্গলে নিজস্ব জমি কেনা হয়েছে। সেখানে একটি রিসোর্ট করার পরিকল্পনা আছে। আমরা চাই, মানুষ শুধু চায়ের স্বাদই নেবেন না, চায়ের মাটির সঙ্গে নিজেদেরও যুক্ত করতে পারবেন। প্রকৃতির আবহে সময় কাটানোর পাশাপাশি সেখানে থাকবে আমাদের চা কারখানাও। দর্শনার্থীরা চাইলে কাছ থেকে দেখতে পারবেন চা তৈরির পুরো প্রক্রিয়া—কীভাবে চা সংগ্রহ করা হয়, কীভাবে তা প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত হয়। অর্থাৎ টিংকার্স টি শুধু একটি ব্র্যান্ড হিসেবে নয়, চায়ের অভিজ্ঞতা হিসেবেও মানুষের কাছে পৌঁছাবে। ঢাকার পান্থপথে আমাদের নিজস্ব গুদামও রয়েছে, যেখানে টিংকার্স টির প্যাকেজিংয়ের কাজ হয়। ধীরে ধীরে আমরা পুরো ব্যবস্থাটাকে আরও বিস্তৃত করতে চাই।