
বন্ধুত্ব। ইংরেজিতে ফ্রেন্ডশিপ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই শব্দের ব্যঞ্জনা আর প্রভাব উভয় আরও একটু বেশি। এমন চিন্তা থেকেই রুনা খান তাঁর ‘জাহাজ হাসপাতাল’-এর এমন নামকরণ করেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন, মানবিক সম্পর্কের সেতুবন্ধ রচনার তাগিদ আর মানুষের কল্যাণে আরেক মানুষের কর্মযজ্ঞের এর চেয়ে ভালো নাম আর হতেই পারে না। অন্তত সেটাই মনে করেন ‘ফ্রেন্ডশিপ’ সেবামূলক উদ্যোগের প্রাণভোমরা রুনা খান। তাঁর অফিসে সম্প্রতি কথা হয় তাঁর সঙ্গে। দীর্ঘ আলাপচারিতায় ঘুরেফিরে আসে নানা প্রসঙ্গ।
তাঁর এই বন্ধুপ্রতিম প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাটফর্মে তিনি ২০ বছর ধরে একেবারে আক্ষরিক অর্থেই তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের চরাঞ্চলের অধিবাসীদের নিয়ে। কারণ, এই জনগোষ্ঠীই আমাদের দেশে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত। স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পুষ্টি, শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতি যে নিরিখেই বিচার করা হোক৷ তবে নামকরণ নিয়ে সহাস্যে রুনা খান জানান নানা তথ্য। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী সাবেক স্বামী ইভস মার যখন ফ্রান্স থেকে জাহাজটি দেশে নিয়ে এলেন, তখন বাবার কথাতেই স্বাস্থ্য খাতে সেবামূলক কিছু করার কথা ভাবলেন তিনি। ফ্রান্স থেকে জাহাজটি আনতে কাগজপত্রে দেখানোর উদ্দেশ্যে ফ্রেন্ডশিপ নামে ইভস মার এক সেবামূলক সংস্থার নাম ব্যবহার করেছিলেন, যা আসলে কখনোই সেভাবে কোনো কার্যক্রমে অংশ নেয়নি।
নামটি খুব মনে ধরে যাওয়ায় রুনা খান এ নামের ব্যানারেই কাজ শুরু করেন জাহাজটি নিয়ে। অকপটেই বললেন, চরাঞ্চলে গিয়ে সেখানকার মানুষের জীবনযুদ্ধ আর মানবেতর যাপনের দৃশ্য দেখে তিনি চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। দারিদ্র্যের এই নিদারুণ রূপটি আসলে একেবারেই অদেখা ছিল রুনা খানের কাছে, বললেন তিনি। ঠিক তখনই তিনি ভেবেছিলেন, ঢাকায় বসে নয় বরং সরেজমিনে চরের মানুষের কল্যাণে সবকিছু করবেন। শামিয়ানা টানিয়ে, মাদুর বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা করেই শুরু করে দিলেন তিনি। আর পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, সততা ও আন্তরিকতাই এ ক্ষেত্রে তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে, অকপটে বললেন রুনা খান।

এই সততা প্রসঙ্গে এসে রুনা খান বললেন, এটাই তাঁদের ফ্রেন্ডশিপের মূলমন্ত্র। এ ক্ষেত্রে সততা ব্যাপারটিকে দুই দিক থেকেই খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি। তাঁর সংস্থার পক্ষ হতে কোনো রকম অলীক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় না, তা সে স্কুল তৈরি করে দেওয়া, ত্রাণ দেওয়া বা গুরুতর দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভোগা শিশুর স্বাস্থ্যের প্রকৃত অবস্থা মাকে জানানো যে ব্যাপারেই হোক না কেন। আবার মজার ব্যাপার হলো, কোনোরকম শক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই ফ্রেন্ডশিপের জাহাজে, জানালেন রুনা খান।
অথচ আজ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে কোনো চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। এ প্রসঙ্গে জানালেন মজার এক ঘটনা। একবার একদল আহতের চিকিৎসা চলছিল তাঁর জাহাজ হাসপাতালে। কিন্তু তাঁরা আহত হওয়ার প্রকৃত কারণ বলেননি। চিকিৎসা শেষে উপস্থিত লোকজনের কানাঘুষায় জানা যায়, এরা আসলে দুর্ধর্ষ ডাকাত দল। চিকিৎসা পেয়ে কৃতজ্ঞ ডাকাত দল উল্টো তাঁকে বলেন, এ জাহাজের কোনো ক্ষতি করার কেউ চেষ্টা করলে তারাই শিক্ষা দেবে, হাসতে হাসতে জানান রুনা খান। প্রকৃতপক্ষে মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে মানুষের ভালোবাসা পেয়েই ফ্রেন্ডশিপ এগিয়ে যাচ্ছে বলে তাঁর বিশ্বাস। এ জন্যই তিনি মনে করেন, সাধারণত নতুন কিছু করতে গেলেই যে সামাজিক বাধাগুলো আসে, সেগুলো তাঁর কাছে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

রুনা খান বলেন, শুধু সততাই নয় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া বন্ধুত্ব হয় না। ঠিক তেমনি তাঁরা যাঁদের নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের একবারও এমন বোঝানো হয় না যে কেউ শহর থেকে তাঁদের জন্য কিছু নিয়ে গেছে, দান করছে। যেকোনো আইডিয়া সবার সঙ্গে মিলে বাস্তবায়ন করা হয়। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলেই ফ্রেন্ডশিপের বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রকল্প সফল হয়।
তিনি তৃপ্তি নিয়ে জানান, যখনই কোনো একটি পরিকল্পনা নিয়ে তিনি চরাঞ্চলে যান, সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে তা সফল করার জন্য। ফ্রেন্ডশিপ সবাইকে নিয়েই কাজ করে সবার জন্য। চরাঞ্চলে ফ্রেন্ডশিপ কাজ করছে ২০ বছর ধরে। রুনা খান জানান, সেখানে আর আগের মতো সংক্রামক ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের দরুন হওয়া চর্মরোগের প্রকোপ নেই। সচেতনতা বেড়েছে, হচ্ছে প্রভূত উন্নতি।

একটা সময় ছিল, যখন দেশের চরাঞ্চলের জীবন ছিল চরম মানবেতর। কোনোক্রমে দুমুঠো খেতে পাওয়ার ব্যবস্থা হলেও শিক্ষা আর স্বাস্থ্য ছিল সোনার হরিণ। ফ্রেন্ডশিপ এই সত্যিকারের দুস্থ মানুষের জীবনমান আগের তুলনায় অনেকটা উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশের কয়টি চরে তাঁদের কার্যক্রম রয়েছে, এমন প্রশ্নে রুনা খানের জবাব, ব্যাপারটি আসলে এককথায় বোঝানো মুশকিল।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, দেশের বড় বড় চর যেমন হাতিয়া, ভাসানচর এই স্থানগুলোর অবস্থা অনেকটাই স্থিতিশীল। অথচ উপকূলবর্তী অন্যান্য বহু চরে চলে ভাঙাগড়ার খেলা। আবার মেঘনার তুলনায় যমুনা নদীতে চরের সংখ্যা অনেক বেশি৷ ৬০০-৮০০ চর রয়েছে সেখানে, যার অনেকগুলো আবার এমন ভাঙাগড়ার মধ্যে থাকে। এর ৫০-৬০ শতাংশেই ফ্রেন্ডশিপ কাজ করছে এবং ৮০-৮৫ শতাংশ চরের মানুষ তাদের কাজের সুফল পাচ্ছে বলেই তাঁর অভিমত। কারণ, একটি চরে সোলার প্যানেল বসিয়ে সেখানে বাজার স্থাপন করলে তার সুফল আশপাশের চরের মানুষও পেয়ে থাকে।
ওয়ান সাসটেইনেবল হেলথ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আওতায় কাজ করছে বিশ্বজুড়ে। এর মূলনীতিটি হচ্ছে সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা। অর্থাৎ জীবনযাপনের সব দিক নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। এর শুরুটা ফ্রেন্ডশিপের হাত ধরেই জানালেন রুনা খান। ফ্রেন্ডশিপেরই এক ফরাসি বোর্ড সদস্য ও খুব কাছের মানুষ বেনহোয়া মিরিবেল ফ্রান্সের বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে এই উদ্যোগের সূচনা ঘটান। তিনি সব সময়ই বলেন ফ্রেন্ডশিপ এর রোল মডেল ও প্রেরণা।
২০০২ সাল থেকেই রুনা খান এই সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূলমন্ত্র নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন ফ্রেন্ডশিপের মাধ্যমে। তিনি বলেন, তাঁর মনে হয়েছিল, পুরো জীবনব্যবস্থা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা নিয়ে কাজ করতেই হবে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। তিনি খুব সোজাসাপটা যুক্তি দিয়ে বলেন, একটি শিশুকে অপারেশন করে সুস্থ করে তোলার পর সে অপুষ্টি আর অনাহারে মৃত্যুবরণ করলে সেই স্বাস্থ্যসেবার কোনো তাৎপর্য নেই। তার শিক্ষা ও জীবিকার ব্যবস্থাও একই সঙ্গে জড়িত। সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এই সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই। এই মূলনীতি নিয়ে ফ্রেন্ডশিপ সংস্থাকে রোল মডেল ধরে সারা বিশ্বের এনজিওগুলো এখন স্বাস্থ্য নিয়ে এভাবেই কাজ করছে বলে জানান রুনা খান। তিনি বর্তমানে ওয়ান সাসটেইনেবল হেলথ ফোরামের অনারারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
একটা সময় যখন প্রথম কাজ করতে শুরু করেন রুনা খান, বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাঁকে এই মোটা মোটা বই আর দলিল-দস্তাবেজ দেওয়া হয়। কারণ, কীভাবে সেবা খাতে কাজ করতে হয়, তার বিশদ বিবরণ জানার জন্য। এই প্রসঙ্গে হাসতে হাসতেই তিনি বললেন, কীভাবে দারিদ্র্য অ্যাসেস করতে হয়, গরিব মানুষের জন্য কাজ করতে হয়, তা এই পুঁথিগত বিদ্যা থেকে সম্ভব নয়। তাই সেসব ছুঁয়েও দেখেননি তিনি। তারপর বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করার মাধ্যমে হাঁটি হাঁটি পা পা করে একেবারে নিজের অন্তর থেকে, নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে, নিজের মতো করে গড়ে তুলেছেন তিনি ফ্রেন্ডশিপ। এ জন্যই আসলে তিনি ও তাঁর বন্ধুত্বের জাহাজ সবার চেয়ে আলাদা।
ইউরোপের লুক্সেমবার্গের হাই স্ট্রিট ফ্যাশনপাড়া। সেখানেই একটি দোকানে মিলছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের নারীদের তৈরি করা পরিবেশবান্ধব, স্বচ্ছ সাপ্লাই চেইনের সব স্তরে মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া ও অত্যন্ত মানসম্পন্ন এক্সক্লুসিভ পোশাক। এখন থেকে অনলাইনে মিলবে ইউরোপ জুড়ে। আর হল্যান্ডে হচ্ছে আউটলেট। স্বপ্ন নয়, বরং স্বাপ্নিক রুনা খানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় রূপ পাওয়া বাস্তবচিত্রটি এখন এমনই।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে রুনা খানের। আর তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ ছাপ ফেলেছে। বললেন, সেভিং রিভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড নামে বিশ্বের নদী বাঁচানোর একটি বড় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত তিনি। সামনে তাঁদের একটি বড় ডেলিগেশন টিম আসতে চলেছে এ দেশে। নদীশাসন আর নদী ঘিরে বা নদীর ওপর উন্নয়নমূলক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষতিকর প্রভাবের মতো বিষয়গুলো সামনে আনতে চান রুনা খান। ‘নদীর জলজ জীবন এতে কতটা ব্যাহত হয়, তা আসলে আমরা কেউই ভেবে দেখি না। শুধু নদী নয়, পরিবেশ না বাঁচলে মানুষই বাঁচবে না’, বলেন তিনি। বুঝিয়ে বললেন, ‘আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের তরিকা বদলে ফেলতে হবে একেবারে।’ কেবল মানুষ অমৌসুমের ফল খাওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারে না বলে এগুলো দুনিয়াজুড়ে আমদানি-রপ্তানি হয়। পৃথিবীর কত জ্বালানি নষ্ট হচ্ছে, পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে এর ফলে, তা ভেবে দেখার বিষয় বলে মত দেন রুনা খান।
উপকূলীয় অঞ্চলে তাঁর উদ্যোগে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন গড়ে তোলা হচ্ছে কৃত্রিমভাবে। এ ছাড়া এ অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবিলার আর কোনোই উপায় নেই, অভিমত রুনা খানের। তবে তিনি আবার বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে আমাদের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া, দৈনন্দিন জীবনে এ লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া।’ আর রুনা খানের অনন্য ফ্যাশন উদ্যোগ, ফ্রেন্ডশিপ কালারস অব দ্য চরস এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা রেখে চলেছে স্লো ফ্যাশনের বার্তা নিয়ে।
কৈশোর পেরোতেই বর্ধিত পরিবারের মধ্যেই তাঁর বিয়ে—গল্প বলে চলেছেন রুনা খান। সন্তান তখন ছোট। রক্ষণশীলতাও বাধা ছিল চাকরির ক্ষেত্রে। বাড়ির আঙিনায় সুবিধাবঞ্চিত বিহারি কারিগরদের নিয়ে কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯৯৪ সালের দিকে ইস্কাটন এলাকায় আত্মপ্রকাশ করে রুনা খানের মেয়ারি। বললেন, খুব মন দিয়ে কাজ করেছেন এই ফ্যাশন হাউসের জন্য। ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে হঠাৎই রুনা খানের মনে হলো, সারা জীবন ধনী পরিবারের জন্য বিলাসী পোশাক আর তিনি বানাতে চান না। জানালেন, হুট করেই বন্ধ করে দিলেন মেয়ারি। হেসে বললেন, সে সময়ের অনেক ক্রেতা এখনো মেয়ারির কাপড় রেখে দিয়েছেন ভালোবেসে, এমনই ছিল তাঁর সুনাম। এই মেয়ারির এক যোগসূত্র বহু বছর পর আবার ফ্যাশন দুনিয়ায় তাঁর পদচারণে ভূমিকা রেখেছে। সে গল্পে পরে আসা যাক।
পোশাকের প্রাণভোমরা দুটি। তন্তু আর রং। রুনা খান জানালেন, ২০১৯ সালে পূর্ণাঙ্গ ফ্যাশন হাউস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা কালারস অব দ্য চরসে শুধু অর্গানিক তুলাটুকু সব সময় সংগ্রহ করা যায় না। তবু সব সময় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকে বঞ্চনামুক্ত উৎস থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কাঁচামাল দিয়ে কাজ করার, জানালেন রুনা খান। আর রঙের ক্ষেত্রে অ্যাজোমুক্ত অথবা প্রাকৃতিক রঞ্জক ব্যবহারের ক্ষেত্রে একেবারেই আপসহীন তাঁর কালারস অব দ্য চরস, বললেন তিনি। সত্যিকারের স্লো ফ্যাশনের মূলনীতি মেনেই এগোতে চান রুনা খান। বললেন, হাতে সুতা কাটা থেকে শুরু করে সব কাজ হাতে করা হয়। এর শুরুর গল্পটিও খুব চমকপ্রদ।
রুনা খান বললেন, চরের মেয়েদের হিসাব কষা আর লিখতে শেখানোর তাগিদে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম নিয়েছিলেন। তারপর তাঁদের প্রশিক্ষিত করলেন বয়নে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এলেন সেই মেয়ারির পুরোনো কারিগরেরা। তবে বিপণনের ক্ষেত্রে রুনা খান নিলেন এক অন্য রকম পরিকল্পনা। গড়পড়তা কিছু না করে উচ্চমানসম্পন্ন, এক্সক্লুসিভ কাপড় ও পোশাক উৎপাদনের কথা ভাবলেন তিনি। বয়নশিল্প ও গয়না তৈরির ক্ষেত্রে তিনি ধামরাই, টাঙ্গাইল ঘুরে আদি ও অকৃত্রিম সেই শিল্পগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিছু পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করলেন। জানালেন, তারা শুধু কালারস অব দ্য চরসকেই দেয় তাদের উৎপাদিত পণ্য।

এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে এবং বাংলাদেশের পোশাককে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবস্থানে উন্নীত করার অভিপ্রায়ে কাজ করছেন বলেই জানালেন রুনা খান। তিনি আশা করছেন যে ভবিষ্যতে কালারস অব দ্য চরস আন্তর্জাতিক ফ্যাশন উইকে যাবে। আর সেই প্রক্রিয়া বলতে গেলে শুরুও করেছেন। এখন অনেক বিদেশি ডিজাইনার তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বর্তমানে স্প্যানিশ ফ্যাশন লেবেল ডেসিগুয়ালের একজন ডিজাইনার তাঁদের সঙ্গে কাজ করছেন।
রুনা খান বেশ জোর দিয়েই বললেন, ইউরোপে এখন সবাই স্লো ফ্যাশন ব্র্যান্ড হিসেবে কালারস অব দ্য চরসকে জানে।
পাশাপাশি যোগ করলেন, ৯৫ শতাংশ নারী কর্মী দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। তাই শুধু লিঙ্গসমতার কথা মুখে বলার চেয়ে সার্বিক অর্থে একটি পরিবার ও একটি কমিউনিটি বাঁচানোর উদ্যোগ নিলে আপনা থেকেই নারীর ক্ষমতায়ন ও কল্যাণ হয়, এই বিশ্বাস নিয়েই কাজ করেন রুনা খান।
‘আমরা এই কাপড় বাজারজাতকরণে নদী এন্টারপ্রাইজ করি’, বললেন রুনা খান। শুরু থেকেই কালারস অব দ্য চরস প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করছে। তবে ভালো মানের ইন্ডিগো বা প্রাকৃতিক নীল রঙে অপ্রতুলতা থাকায় তাঁরা নীল চাষের উদ্যোগ নেন। সেখান থেকে উৎপাদিত হচ্ছে, যা নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করছেন। কারণ, দেশ-বিদেশে এই মানসম্পন্ন ইন্ডিগোর রয়েছে দারুণ চাহিদা। তা ছাড়া বাংলাদেশের ইন্ডিগো গুণে ও মানে শ্রেয়।
রুনা খান বলছিলেন, তাঁর চতুর্মাত্রিক সমন্বিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসার পরেই তিনি গুরুত্ব দিলেন শিক্ষার ব্যাপারে। তাঁর সেবামূলক সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ তাই প্রতিটি প্রত্যন্ত চরে স্কুল খুলেছে। রুনা খান জানালেন, চরের মেয়েদের শিক্ষাদান করে শিক্ষক হওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়ে তবেই তিনি স্কুল চালু করেছেন। জাতীয় পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি সফট স্কিলস বা সুকুমার বৃত্তি বিকাশে এই বিদ্যালয়গুলোতে এথিকস বা নীতিবোধের পাঠ দেওয়া হয় গুরুত্বসহকারে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, জীবনমুখী শিক্ষা, পরিবেশ রক্ষায় করণীয় বিষয়সহ সব দিকে দক্ষতা গড়ে তোলার সব প্রয়াস থাকে তাঁদের, জানালেন রুনা খান।
দেশের স্বনামধন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রেকর্ড করা লেকচার চরের বাচ্চাদের পাঠদানে ব্যবহৃত হতো আগে থেকেই, বলেন তিনি। তবে অতিমারিকালে অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণ ও যোগাযোগ বহু বেড়ে যায় বিশ্বব্যাপী। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁরা সরাসরি চরের শিক্ষার্থীর সংযুক্ত করেন আন্তর্জাতিক শিক্ষাভিত্তিক নেটওয়ার্কে।
চরের মেয়েরা এখন এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়ছেন। অন্যান্য ইউনিভার্সিটিতেও যাচ্ছেন। তাঁরা ভবিষ্যতে বিশ্বের বড় বড় ইউনিভার্সিটিতে পড়বেন বলে রুনা মনে করেন।

রুনা খানের কাজ আর স্বপ্ন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। একপর্যায়ে বলছিলেন, কোনো স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগে তা নিয়ে তিনি কথাই বলতে পছন্দ করেন না। চরের মানুষের কাছে মেসিয়াহ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি। রুনা খানের কাফেলায় নিজের সম্মান ও অধিকারটুকু অক্ষুণ্ন রেখেই সঙ্গী হয়েছেন বহু চরবাসী। স্লো আর টেকসই ফ্যাশনে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় রুনা খান নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে প্রাণপণে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন পৃথিবী ও মানুষকে।
ঘণ্টাধিক দীর্ঘ কথোপকথন শেষ হয়ে আসে। এতক্ষণ শোনা হয় রুনা খানের কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো। সেখানে পুরোটাই তাঁর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। সেই ফ্যাশন ডিজাইনার থেকে ছোটদের লেখক, কিংবা গল্পকার; মাঝের বিস্তীর্ণ জীবনে নানা অভিজ্ঞতা থেকে বাবার উৎসাহে ভাসমান হাসপাতাল তৈরি থেকে চরের সুহৃদ; সেই বৃত্তে ফেরার মতো ফ্যাশনে ফেরা। তবে এবার ফাস্ট ফ্যাশন নয়, বরং স্লো ফ্যাশন প্রকৃতি ও মানুষের কল্যাণে। এভাবে দেশের ও দশের একজন হয়ে যেমন কাজ করে চলেছেন, তেমনি বিশ্বের বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করার পাশাপাশি সমুন্নত রাখছেন বাংলাদেশের স্বার্থ ও সম্মান।
এমন আলাপচারিতা আসলে শেষ হওয়ার নয়। তবু ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে আসতে হয়।
নোট: আলাপচারিতাটি হাল ফ্যাশনে প্রথম প্রকাশ করা হয় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে
ছবি: সাইফুল ইসলাম