
বিশ্বকাপ এলেই বদলে যায় তৌসিফ মাহবুব এর জীবনযাত্রার ছন্দ। বাংলাদেশের জনপ্রিয় এই অভিনেতার কাছে বিশ্বকাপ কেবল একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি, উন্মাদনা আর জীবনের এক বিশেষ মাইলফলক। নিজেকে একজন আর্জেন্টিনা সমর্থক বললেও তাঁর ফুটবল-ভালোবাসার মূল শিকড় জার্মানির প্রতি গভীর টানে। বিশ্বকাপ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তৌসিফের কণ্ঠে বারবার ধরা পড়েছে এক নির্মল উচ্ছ্বাস যেন চার বছর পর পর ফিরে আসে জীবনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত উৎসব।

চার বছর পর পর ঈদের আনন্দ
তৌসিফের কাছে ফিফা বিশ্বকাপের অনুভূতি অনেকটা ঈদের মতো। চার বছর অপেক্ষার পর যখন এই মহাযজ্ঞ শুরু হয়, তখন তিনি আগেভাগেই নিজের কাজের সূচি গুছিয়ে ফেলেন। চেষ্টা করেন এই এক মাসে যত কম সম্ভব শুটিং রাখতে, যাতে খেলা দেখার একটি মুহূর্তও মিস না হয়। তাঁর ভাষায়, বিশ্বকাপ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উৎসবগুলোর একটি। তবে এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও গভীর এক অনুভূতি সময়কে ছুঁয়ে দেখার অনুভব। চার বছর পর বিশ্বকাপ ফিরে এলে তাঁর মনে হয়, “গত বিশ্বকাপেও আমি ছিলাম, এবারও আছি।” বেঁচে থাকা এবং আবারও বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ পাওয়া এটাকেই তিনি জীবনের এক ধরনের আশীর্বাদ হিসেবে দেখেন। তাঁর কাছে প্রতিটি বিশ্বকাপ যেন জীবনের আরেকটি অধ্যায় সম্পূর্ণ করার মতো।
শৈশবের উন্মাদনা আজও অমলিন
শৈশবের বিশ্বকাপ আর বর্তমানের বিশ্বকাপ এই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য খুঁজে পান না তৌসিফ। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আবেগ আরও বেড়েছে। ছোটবেলায় ফুটবল খেলতেন, মাঠের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ছিল। এখন অভিনয়, শুটিং আর ব্যস্ত জীবনের কারণে আর খেলতে পারেন না। তাই খেলা দেখার মধ্য দিয়েই যেন ফিরে পান নিজের শৈশবকে। তাঁর কাছে ফুটবল দেখা মানে কয়েক ঘণ্টার জন্য বাস্তবতা থেকে অন্য এক জগতে চলে যাওয়া। অভিনেতা হিসেবে শুটিংয়ে তাঁকে একটি চরিত্রের মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু পর্দায় ফুটবল ম্যাচ দেখামাত্র সেই চরিত্রের সব আবরণ ভেঙে যায়। তাঁর অনুভূতি, তিনি যেন সরাসরি মাঠে ঢুকে পড়েন খেলোয়াড়দের সঙ্গে দৌড়ান, গোলের সঙ্গে লাফিয়ে ওঠেন, উত্তেজনার সঙ্গে নিশ্বাস ফেলেন।

একসঙ্গে খেলার আনন্দ, তবু একান্ত নিজের জায়গা
তৌসিফ বিশ্বাস করেন, ফুটবল একসঙ্গে দেখার আনন্দ আলাদা। অনেকটা সিনেমা হলে বসে সিনেমা দেখার মতো যত বেশি মানুষ, তত বেশি উত্তেজনা, তত বেশি শেয়ার করা অনুভূতি। তবে এখন তিনি সবার সঙ্গে খেলা দেখা এড়িয়ে চলেন। কারণ, ম্যাচ চলাকালে তাঁর ভেতরের শিশুসুলভ রূপটি বেরিয়ে আসে। গোল হলে অতি উচ্ছ্বাস, হতাশায় মুখ ফসকে কথা বলে ফেলা, অপ্রতিরোধ্য আবেগ সব মিলিয়ে তিনি নিজেকে সামলাতে পারেন না। এই রূপটি তিনি খুব কাছের মানুষ ছাড়া আর কাউকে দেখাতে চান না। তাই এখন বিশ্বকাপের বড় ম্যাচগুলো সাধারণত পরিবারের সঙ্গে দেখেন, অথবা নিরিবিলিতে একা উপভোগ করেন।
সেই ৭–১ ম্যাচ: ভুলতে না পারা রাত
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচগুলোর একটি ২০১৪ ফিফা বিশ্বকাপের জার্মানি বনাম ব্রাজিল সেমিফাইনাল তৌসিফের জীবনেও এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে আছে। জার্মানির একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় বসে ম্যাচটি দেখছিলেন। তারপর যা হলো, তা যেন অবিশ্বাস্য। একের পর এক গোল, আর প্রতিটি গোলের সঙ্গে বাড়তে থাকা উন্মাদনা। তাঁর মনে আছে সাতটি গোলের প্রতিটি মুহূর্ত। তিনি স্বীকার করেন, খেলোয়াড়দের চেয়েও হয়তো বেশি উচ্ছ্বাস তিনি নিজেই দেখিয়েছিলেন। সেই ম্যাচের পরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন সবাইয়ের সঙ্গে বসে আর খেলা দেখা যাবে না। কারণ তাঁর আবেগ তখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

বাংলাদেশে ফুটবল মানেই ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা
বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতি নিয়ে তৌসিফের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত ইতিবাচক। তাঁর মতে, বাংলাদেশ এ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের যে উন্মাদনা দেখা যায়, তা আসলে এক ধরনের স্বাস্থ্যকর পাগলামি। একই পরিবারের মধ্যে একজন আর্জেন্টিনা, আরেকজন ব্রাজিল সমর্থক এ দৃশ্য খুবই সাধারণ। বন্ধুদের মধ্যেও এমন বিভাজন থাকে। তর্ক হয়, খোঁচাখুঁচি হয়, ঠাট্টা হয়, কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট হয় না। বরং এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

তৌসিফের মতে, মতের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখা যায়—বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকেরা তার সুন্দর উদাহরণ। মজার ছলে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও যদি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারত তাহলে হয়তো পরিবেশ আরও সুন্দর হতো।
বিশ্বকাপ তাই তৌসিফ মাহবুবের কাছে শুধু গোল, ট্রফি কিংবা ম্যাচের ফল নয়। এটি স্মৃতি, আবেগ, শৈশব, পরিবার, বন্ধুত্ব এবং জীবনের উদযাপন। চার বছর পর পর ফিরে আসা এই ফুটবল উৎসব তাঁকে মনে করিয়ে দেয় জীবন এখনও চলছে, আবেগ এখনও জীবন্ত, আর ভেতরের সেই ফুটবলপাগল শিশুটিও এখনও হারিয়ে যায়নি।
ছবি: তৌসিফ মাহবুব