মসলা বিনিময়ের কারণে তুরস্কের স্বাদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাদের মিল আছে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

পাঁচ তারকা হোটেল লো মেরিডিয়ানে শুরু হয়েছে তুর্কি ব্রাঞ্চ ‘টেস্ট অব তুর্কিয়ে’। তুরস্কের জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমাহারে সাজানো হয়েছে এই তুর্কি ব্রাঞ্চ। হোটেলের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ‘লেটেস্ট রেসিপি’তে এই ব্রাঞ্চের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন প্রখ্যাত তুর্কি শেফ এবুবেকির সিদ্দিক সিমসেক। তুরস্কের চেশমে অঞ্চলের রেগেস লাক্সারি কালেকশন রিসোর্ট অ্যান্ড স্পায় বর্তমানে আছেন তিনি। হাল ফ্যাশনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবুবেকির জানিয়েছেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা।

বিজ্ঞাপন

শেফ হওয়ার কথা কবে প্রথম ভেবেছিলেন?

আমি ১৪ বছর বয়স থেকেই শেফ হিসেবে কাজ করার কথা চিন্তা করি। আমার বাবা ও চাচা দুজনেই শেফ ছিলেন; সে কারণে ছোট থেকেই আমার আগ্রহ জন্মায়। আমার বয়স এখন ৩১, সেই হিসেবে বলা যায় ১৭ বছর ধরে রান্নাই আমার ভালোলাগার জায়গা।শেফ হিসেবে ১৭ বছরের যাত্রা কেমন ছিল?

তুর্কি শেফ এবুবেকির সিদ্দিক সিমসেক
তুর্কি শেফ এবুবেকির সিদ্দিক সিমসেক

শেফ হিসেবে ১৭ বছরের যাত্রা কেমন ছিল?

আমি কেবল এক জায়গায় থেকে রান্না শিখতে চাইনি। টার্কিশ কুজিন দারুণ বৈচিত্র্যময়। ইস্তাম্বুল, বুরসা, ইজমির, গাজিয়েনতেপ—তুরস্কের এসব অঞ্চলে অটোমানদের মতো করে হালকা মসলার ব্যবহারে বিভিন্ন ধরনের খাবার প্রস্তুত করা থাকে। তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে জলপাইগাছ জন্মায়, তাই এখানকার রান্নার প্রধান তেল হচ্ছে জলপাই তেল।
তাই আমি সব অঞ্চল ঘুরে রান্না শিখেছি। আমি মূলত দেখে এবং নিজ হাতে রান্না করে শিখেছি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিইনি। তুরস্কের শেফ হিসেবে স্বীকৃতি ও সনদ পেতে একটি পরীক্ষা দিতে হয়। ‘চেলেক মেহমেদ লিসেক’ নামের কুকিং স্কুল এই সনদ দিয়ে থাকে। এখান থেকেই আমি শেফের সনদ লাভ করেছি।

বিজ্ঞাপন

তুরস্কের কোন বিশেষ খাবার আপনি রান্না করতে পছন্দ করেন বা আপানর বিশেষত্ব?

টার্কিশ অথেনটিক ‘লাহকুন (Lahmacun)’। এটা বিশেষ এক ধরনের পিৎজা), আদানা ও উরফা কাবাব। যে অঞ্চলে আমার জন্ম, সেখানকার খাবার আরব অঞ্চলের দ্বারা প্রভাবিত; সে জন্য এগুলো বেশ ঝাল হয়ে থাকে। এতে প্রচুর পরিমাণে প্যাপরিকা ও চিলি ফ্লেক্স ব্যবহার করা হয়।

নিজের তৈরি করতে পছন্দ করি লাহকুন, আদানা ও উরফা কাবাব
নিজের তৈরি করতে পছন্দ করি লাহকুন, আদানা ও উরফা কাবাব

স্বাদের ভিন্নতায় টার্কিশ কুজিন বা অটোমান কুজিন সারা বিশ্বে খুবই জনপ্রিয়; এর মূল কারণ কী?

তুরস্ক সাতটি অঞ্চলে বিভক্ত। এক জায়গার খাবারের স্বাদ একেক রকম এবং সেখানকার কৃষিজমির ফলন ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। রান্নায় সেসব উপাদান ব্যবহার করা হয়। সব সবজি চাষে কোনো ধরনের রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। গরু, ভেড়া ইত্যাদি গবাদিপশু পালনের সময় তাদেরও কোনো কৃত্রিম খাদ্য খাওয়ানো হয় না। এসব পশুর মাংসে প্রাকৃতিক ফ্যাট থাকায় রান্না করলে স্বাদ অন্য সব মাংসের চেয়ে আলাদা হয়। এ ছাড়া যে মসলা ব্যবহার করা হয়, তা–ও প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত। অর্গানিক ও তাজা শাকসবজি, মাংস ও ডো মূল উপাদান বলা যায়। তুরস্কের একেবারে দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলে গাজিয়েনতেপে সবচেয়ে ভালো মানের কাঁচা সবজি, তাহিনি ও মাংস উৎপাদিত হয়। বিশ্বখ্যাত ‘বাকলাভা’র উৎপত্তি এই অঞ্চলে। এখানকার ‘বাকলাভা’ এত বিখ্যাত যে আমেরিকা, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সের তারকা অভিনেতা–অভিনেত্রীরা সেখান থেকে অর্ডার করেন। এরপর প্লেনে করে ডেলিভারি করা হয়।  

বাংলাদেশি খাবার খেয়েছেন? কেমন লেগেছে?

আমি প্রথমবার বাংলাদেশে এসেছি। খুবই ভালো লাগছে, আমি যেহেতু ঝাল খাবার পছন্দ করি তাই এখানকার মসলাযুক্ত খাবার ভালো লাগছে। আমি লো মেরিডিয়ানের বুফেতে মাছের ভুনা খেয়েছি, বেশ উপাদেয় মনে হয়েছে।

বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে অনেক মশলা বিনিময় হয়েছে
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে অনেক মশলা বিনিময় হয়েছে

অটোমানদের অনেক খাবার বাংলাদেশেও চলে এসেছে, স্বাদের মিলও আছে। এই বিষয়ে আপনার কী অভিমত?

মানবসভ্যতার শুরু থেকে বিশ্বায়নের ধাপে ধাপে উপনিবেশবাদের কারণে একেক দেশ একেক অঞ্চলকে শাসন করেছে। তুরস্ক থেকে ভারতে বিভিন্ন মসলা এসেছে, আবার উপমহাদেশ থেকে অনেক মসলা তুরস্কে গেছে। জিরা, আদা, ধনিয়া, কিশমিশ, তেজপাতা এ রকম অনেক মসলার ব্যবহার উভয় দেশেই আছে। এ জন্যই দুই অঞ্চলের স্বাদের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের খাবারের সঙ্গে টার্কিশ কুজিনের ফিউশনে কোনো রেসিপি উদ্ভাবনের চিন্তা করছেন কি না?

আমি প্রথমবার বাংলাদেশে এসেছি। এখনো সব খাবারের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠিনি। মাসখানেক আছি লো মেরিডিয়ানে। চেষ্টা থাকবে ফিউশন কিছু করার। টার্কিশ অথেনটিক খাবারের স্বাদ বাংলাদেশের ভোজনরসিকদের দিতে মেরিয়টের অন্তর্ভুক্ত লো মেরিডিয়ানে আসা। এখানকার টার্কিশ রেস্টুরেন্ট নিয়েই ভাবছি। এখান থেকে বের হয়ে ঢাকার অনন্য রেস্টুরেন্টে যাওয়ার সুযোগ হলে ফিউশন রেসিপি করার বা টার্কিশ রান্না শেখানোর ইচ্ছা থাকবে ভবিষ্যতে।

এখন ঢাকার রসনাবিলাসী উপভোগ করতে পারছেন এবুবেকিরের তৈরি নানা পদ
এখন ঢাকার রসনাবিলাসী উপভোগ করতে পারছেন এবুবেকিরের তৈরি নানা পদ

অটোমান সাম্রাজ্য ও খাবারের ইতিহাস সম্পর্কে একটু ধারণা দিতে পারেন?

অটোমানরা প্রায় পাঁচ শ বছর বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেছে,শাসন করেছে; ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারের প্রভাব আছে। তুরস্কের এমন সব রেস্টুরেন্ট আছে, যেখানে পাঁচ শ বছরের পুরোনো খাবারের রেসিপি পাওয়া যায়। প্রাচীনতম ডেজার্ট বা মিষ্টি খাবার হিসেবে যেটিকে মনে করা হয়, সেই ‘আশুর’ তুরস্কের গাজিয়েনতেপের কুরতুলুস পাড়ায় ‘গোরেমে’ নামে এক পুরোনো মিষ্টির দোকানে পাওয়া যায়। ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে, আশুরকে ‘নুহের পুডিং’ বলা হয়ে থাকে। মহাপ্লাবনে আজকের তুরস্কের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের প্রান্তে আরারাত পর্বতে ভেসে আসার পর নবী নুহ (আ.)–এর পরিবার বিভিন্ন উদ্‌যাপনে বিশেষ খাবার হিসেবে ‘আশুর’ প্রস্তুত করত বলে জনশ্রুতি আছে। তুরস্কে বিশেষ ধরনের ছানা প্রস্তুত করা হয়, যা থেকে খানিকটা বের করে নেওয়ার পর আবার তাতে দুধ দেওয়া হয়; সেটা গাজন হওয়ার পর আবার ছানা বের করে পুরোনো গাজনের ওপর আবার দুধ দেওয়া হয়। জার্মানিতে একই প্রক্রিয়ায় পনির ও ছানা তৈরি করা হয়। এটি ১০০ বছরের পুরোনো প্রস্তুত প্রণালি।

আপনার নিজের ইউনিক রেসিপি কোনটি?

আমি ওয়েস্টার মাশরুম দিয়ে একটা রেসিপি করে থাকি। মাশরুমকে সতে করে, একটা বিশেষ সস তৈরি করা হয়, এরপর মাংস গ্রিল করা হয়, যা টার্কিশ মাংস। সেটা দিয়েই পরিবেশন করা হয়। এই সসটা হচ্ছে রেসিপির বিশেষত্ব। লো মেরিডিয়ানের ‘টেস্ট অব তুর্কিয়ে’ ব্রাঞ্চ হচ্ছে সেখানে এই সস ব্যবহার করে রান্না হচ্ছে। যাঁরা এখানে আসবেন, এই খাবারের স্বাদ নিতে তাঁরা খেতে পারবেন এই বিশেষ সসের রান্না। এ ছাড়া আমি একটা ডেজার্ট করেছিলাম ফল দিয়ে, যেটা ভিন্ন রকম ছিল।


টার্কিশ খাবার ছাড়াও আর কোন মহাদেশের খাবার আপনার পছন্দ?

নরওয়েজিয়ান স্যামন, ইতালিয়ান কুজিন, মেক্সিকান কুজিন আমার পছন্দ। সামনে আমি আরও অন্যান্য মহাদেশের খাবারের স্বাদ নিতে চাই। আমি নিজে রিসোতো পছন্দ করি এবং ভালো রান্না করি। এ ছাড়া টার্কিশ খাবারের মধ্যে আমার এস্কান্দার কাবাব দারুণ ভালো লাগে, যা অনেকটা ডোনার কাবাবের মতো খুব পাতলা স্তরের হয়ে থাকে। তবে সেটা মিট বল দিয়ে তৈরি করা হয়। টার্কিশ পিটা ব্রেডের ওপরে, ফ্রেশ কাট টমেটো, তার ওপরে ঘি ও টক দই দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

মায়ের হাতের কোন রেসিপি আপনার পছন্দ?

‘আদিয়ামান কাতমা গোজলেমি’ যা এক বিশেষ ধরনের প্যান কেক। এতে ভেড়ার কিমা ও চিজের স্টাফিং থাকে। মায়ের হাতের এই রেসিপি আমার সবচেয়ে প্রিয়।

শেফ এবুবেকিরের সঙ্গে লো মেরিডিয়ানের ডিরেক্টর, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কেভিন ম্যাকইনটায়ার (ডানে), লেখক (ডান থেকে দ্বিতীয়) ও লো মেরিডিয়ানের অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার, মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন তাসলিমা অদিতা
শেফ এবুবেকিরের সঙ্গে লো মেরিডিয়ানের ডিরেক্টর, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কেভিন ম্যাকইনটায়ার (ডানে), লেখক (ডান থেকে দ্বিতীয়) ও লো মেরিডিয়ানের অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার, মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন তাসলিমা অদিতা

বাংলাদেশের মিষ্টি কি খেয়ে দেখেছেন? কেমন লেগেছে?

এখানকার লেটেস্ট রেসিপি রেস্টুরেন্টের বুফেতে, বাংলাদেশের বেকারি শেফদের তৈরি ফিরনি, গোলাপজাম, লাড্ডু ও সন্দেশ আমার খুবই পছন্দ হয়েছে।
রান্না করতে গিয়ে কি কখনো এমন হয়েছে, কেউ আপনার রান্না পছন্দ করেনি? আপনি তখন কী করেছেন?
এক হাজার লোক খেতে এলে কারও না কারও অপছন্দ হতে পারে। তবে এমন খুব কম হয়েছে যে কারও পছন্দ হয়নি। অবশ্য এমন হলে আমি নিজে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলি, দুঃখ প্রকাশ করি। কীভাবে তাঁর স্বাদ অনুযায়ী পরিবেশন করা যায়, সেটা চিন্তা করি।

শেফ হিসেবে মনে রাখার মতো স্মৃতি কী?

সার্বিয়ায় আমি একটা রেস্টুরেন্টে টার্কিশ খাবার রান্না করছিলাম, সবার সামনে। আমার রান্নার কৌশল দেখে উপস্থিত সবাই হাততালি দিচ্ছিল, প্রশংসা করছিল। খুব ভালো লেগেছিল।


একজন ভালো শেফের কী কী গুণ থাকা উচিত?

তুরস্কে যাঁরা শেফ হন, তাঁরা ধাপে ধাপে একেবারে ছোট থেকে বড় পর্যায়ে আসেন। আমি ডিশ ওয়াশার হিসেবে শুরু করেছিলাম, এরপর কসাই, তারপর গ্রিল শেফ এখন এই পর্যায়ে আছি। খাবারের গুণগত মান ভালো হলে আপনার খাবারের সুনাম ছড়িয়ে পড়বেই। এখানকার দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক বড় ভূমিকা রাখে প্রচারে। নিজের সংস্কৃতির কুজিন ছড়িয়ে দিতে হবে আপনাকেই। আর প্রতিনিয়ত শেখার মানসিকতা থাকতে হবে। আর কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। এই প্রসঙ্গে বলি, তুরস্কে অনেক বিখ্যাত শেফ আছেন। এদের মধ্যে মাহমুদ আক্তার আমার অনেক প্রিয়।

কৃতজ্ঞতা: কেভিন ম্যাকইনটায়ার, তিনি দোভাষীর দায়িত্ব পালন করেন।
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৮: ১৮
বিজ্ঞাপন