
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে আবারও নির্বাচিত হয়েছেন সোমালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন ইলহান ওমর। মিনেসোটার মিনিয়াপলিসের মিনেসোটা ৫ নম্বর সংসদীয় আসন থেকে তিনি কংগ্রেসে দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ী হলেন।ইলহান মার্কিন কংগ্রেসের প্রথম সোমালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন সদস্য। ২০১৮ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম নারীর একজন তিনি।

ইলহান ওমরের জন্ম ১৯৮২ সালের ৪ অক্টোবর সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুতে। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলাতেই জীবনে নেমে আসে বড় বিপর্যয়। ইলহানের মা, যিনি ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত ছিলেন, তাঁর শৈশবেই মারা যান। এরপর মূলত বাবা নুর ওমর মোহামেদ ও দাদা আবুকার ওমরের কাছে বড় হন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন শিক্ষক প্রশিক্ষক। আর দাদা দায়িত্ব পালন করেছেন সোমালিয়ার ন্যাশনাল মেরিন ট্রান্সপোর্টের পরিচালক হিসেবে।
১৯৯১ সালে সোমালিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে পরিবার নিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন ইলহান। কেনিয়ার উটাঙ্গে শরণার্থীশিবিরে কাটে তাঁদের জীবনের চারটি কঠিন বছর। ১৯৯৫ সালে শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্বাসনের সুযোগ পান তাঁরা। প্রথমে ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনে কিছুদিন থাকলেও পরে স্থায়ীভাবে চলে যান মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে।

শহরটি তখন সোমালি-আমেরিকানদের অন্যতম বড় বসতি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছিল। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর মাত্র তিন মাসে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন ইলহান। এ জন্য তাঁকে সাহায্য করেছিল আমেরিকান টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখা।
পরিবার ও ব্যক্তিজীবন
ইলহান ওমরের ব্যক্তিজীবনও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় এসেছে। প্রথম স্বামী আহমেদ আবদিসালান হিরসির সঙ্গে তাঁর তিন সন্তান রয়েছে। তাঁদের বড় মেয়ে ইসরা হিরসি নিজেও এখন পরিচিত জলবায়ু ও সামাজিক অধিকারকর্মী। মায়ের সঙ্গে টিন ভোগ সাময়িকীর প্রচ্ছদেও জায়গা পেয়েছে সে।


প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ২০২০ সালে রাজনৈতিক পরামর্শক টিম মাইনেটকে বিয়ে করেন ইলহান। বর্তমানে তাঁরা মিনিয়াপোলিসে বসবাস করছেন।
লাইফস্টাইল
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য হিসেবে ইলহান ওমরের ব্যস্ত জীবন। কাজের চাপে অবসর সময় খুব একটা পান না। তবে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনে গুরুত্ব দেন। তাঁর পছন্দের শখগুলোর একটি হলো পুরোনো ও ব্যবহৃত পোশাক কেনা, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘থ্রিফটিং’।

অবসর সময়ে, বিশেষ করে সপ্তাহান্তে, মেয়ে ইসরাকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় ভিনটেজ পোশাকের দোকানে ঘুরে বেড়ান তিনি। খোঁজ করেন ব্যতিক্রমী পোশাক ও ব্যবহৃত গয়নার। নতুন পোশাকের পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় না করে পুরোনো পোশাকের মধ্যেই নিজের পছন্দ ও রুচির প্রকাশ ঘটাতে ভালোবাসেন।
ফ্যাশন ও নিজস্ব স্টাইল
রাজনীতির জগতে ইলহান ওমর একজন স্বতন্ত্র ফ্যাশন আইকন হিসেবেও পরিচিত। ওয়াশিংটনের প্রচলিত পোশাকরীতির মধ্যে থেকেও নিজের ব্যক্তিত্ব ও রুচির প্রকাশ ঘটাতে জানেন তিনি।

তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ১৮১ বছরের পুরোনো একটি নিয়ম পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা। ওই নিয়মে কংগ্রেসের অধিবেশনকক্ষে টুপি বা মাথা ঢেকে রাখার পোশাক পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ইলহানের উদ্যোগে নিয়মটি পরিবর্তিত হয়। এর ফলে কংগ্রেসের অধিবেশনকক্ষে ধর্মীয় কারণে হিজাব পরা প্রথম সদস্য হওয়ার সুযোগ পান তিনি।

তাঁর ফ্যাশন স্টাইলের কয়েকটি বিশেষ দিক রয়েছে। হিজাবকে শুধু ধর্মীয় পোশাক হিসেবে নয়, ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবেও উপস্থাপন করেন ইলহান। উজ্জ্বল রং, আকর্ষণীয় বুনন ও বৈচিত্র্যময় নকশার হিজাব পরতে পছন্দ করেন। নিজের নির্বাচনী এলাকার সোমালি মালিকানাধীন স্থানীয় দোকান থেকেই অনেক সময় এসব হিজাব সংগ্রহ করেন।
৫০ ডলারের আউটফিট চ্যালেঞ্জ
সীমিত বাজেটেও আকর্ষণীয় ও পরিপাটি পোশাক পরার ব্যাপারে আগ্রহী তিনি। পুরোনো পোশাকের সঙ্গে কম দামের নতুন পোশাক মিলিয়ে ৫০ ডলারের কম খরচে ফ্যাশনেবল লুক তৈরি করেন। এভাবে পোশাকের মাধ্যমে সাশ্রয়ী জীবনযাপনের বার্তাও দেন।

রাজনীতিতে ফ্যাশনের মজার মুহূর্ত
সমসাময়িক ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুসরণ করেন ইলহান। একবার কংগ্রেসের নবনির্বাচিত সদস্যদের পরিচিতিমূলক অনুষ্ঠানে গিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন তিনি। কারণ, তাঁর সঙ্গে একই পোশাক পরে হাজির হয়েছিলেন আরেক কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। দুজনের একই রকম পোশাক পরার ঘটনা তখন বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সূত্র: প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া, ফার্স্ট পোস্ট
ছবি: ইন্সটাগ্রাম