সন্তানের নাম মেসি রাখতে চাচ্ছেন? দেখুন আর্জেন্টিনার আইন কী বলে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ফুটবলারের নামে সন্তানের নাম রাখা নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর নানা দেশে নবজাতকের নাম রাখা হয়েছে পেলে, দিয়েগো, রোনালদো কিংবা লিওনেল। ধরুন, এমন এক দেশে জন্মেছেন আপনি, যেখানে সবচেয়ে বড় ফুটবল নায়কের নাম সবাই জানে, সবাই ভালোবাসে, কিন্তু সেই নামেই সন্তানের নাম রাখতে চাইলে বাধা দেয় আইন! সেই দেশের নাম আর্জেন্টিনা, আর সেই কিংবদন্তি ফুটবলার লিওনেল মেসি।

মেসির দেশ আর্জেন্টিনায় সন্তানের নাম মেসি রাখা আইনত সঠিক নয়
মেসির দেশ আর্জেন্টিনায় সন্তানের নাম মেসি রাখা আইনত সঠিক নয়

শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তবতা। লিওনেল মেসির দেশ আর্জেন্টিনায় সন্তানের নাম মেসি রাখা আইনত সঠিক নয়। ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনার রিও নেগ্রো প্রদেশের এক দম্পতি হেক্টর ভারেলা ও লোরেনা সানচেজ তাঁদের সদ্যোজাত ছেলের নাম রাখতে চাইলেন মেসি। অনেকেই হয়তো ভাববেন, তাঁরা ছেলের নাম লিওনেল রাখবেন। কিন্তু তাঁদের যুক্তি ছিল অন্যরকম। দেশে তখন অসংখ্য লিওনেল আর লিও জন্ম নিচ্ছে। তাঁরা চেয়েছিলেন, তাঁদের সন্তানের নামেই ফুটে উঠুক সেই মানুষটির পরিচয়, যিনি কোটি মানুষের আবেগের নাম।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু জন্মনিবন্ধনের সময় জানা গেল, আর্জেন্টিনার ১৯৬৯ সালের একটি আইন অনুযায়ী পারিবারিক নাম (পদবি) প্রথম নাম হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। কারণ এতে প্রশাসনিক জটিলতা ও পরিচয় বিভ্রান্তির আশঙ্কা থাকে। অনেকেই হয়তো সেখানেই থেমে যেতেন। কিন্তু হেক্টর ও লোরেনা থামেননি। বিশেষ অনুমতির আবেদন করেন। শেষ পর্যন্ত ব্যতিক্রম হিসেবে অনুমতি মেলে।

কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় আইন সবার জন্য সমান। মেসি পদবি দিয়ে প্রথম নাম রাখা যাবে না।
কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় আইন সবার জন্য সমান। মেসি পদবি দিয়ে প্রথম নাম রাখা যাবে না।

শিশুর নাম রাখা হয় মেসি ডেভিড ভারেলা। ভারেলা পরিবারের ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর আর্জেন্টিনার আরও অনেক বাবা-মা একই আবেদন করতে শুরু করেন। বিশেষ করে মেসির জন্মপ্রদেশ সান্তা ফেতে। কিন্তু সেখানকার নাগরিক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় আইন সবার জন্য সমান। পদবি দিয়ে প্রথম নাম রাখা যাবে না। আজও সেই আইন বহাল আছে।

বিজ্ঞাপন

তাহলে আর্জেন্টিনায় ‘মেসি’ নামের মানুষ কতজন?

২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সরকারি তথ্য বলছে, পুরো আর্জেন্টিনায় মাত্র ১১ জনের প্রথম নাম মেসি। তাঁদের সবার বয়স ১৯ বছরের নিচে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ২০৫ জন, ফ্রান্সে প্রায় ২৬৫ জন, ব্রাজিলে ৩ শ৬৩ জন এবং পেরুতে ৩৪০২ জনের প্রথম নাম মেসি। যে দেশে মেসির জন্ম, সেই দেশেই এই নাম সবচেয়ে বিরল। মজার বিষয় হলো, আইন হয়তো মেসি নামটি আটকে দিয়েছে, কিন্তু লিওনেল নামকে নয়। আর্জেন্টিনায় এখন এক লাখেরও বেশি মানুষের নাম লিওনেল। তাঁদের প্রায় ৮৭ শতাংশের বয়স ১৯ বছরের কম। অর্থাৎ, তাঁরা জন্মেছে মেসির বার্সেলোনায় উত্থান কিংবা বিশ্বজয়ের পর।

 শুধু ২০২৩ সালেই আর্জেন্টিনায় ৯ হাজার ৫০৫টি ছেলে শিশুর নাম রাখা হয় লিওনেল, আর ৪৪৬ জন কন্যাশিশুর নাম রাখা হয় লিওনেলা
শুধু ২০২৩ সালেই আর্জেন্টিনায় ৯ হাজার ৫০৫টি ছেলে শিশুর নাম রাখা হয় লিওনেল, আর ৪৪৬ জন কন্যাশিশুর নাম রাখা হয় লিওনেলা

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর যেন সেই ভালোবাসা আরও বেড়ে যায়। শুধু ২০২৩ সালেই আর্জেন্টিনায় ৯ হাজার ৫০৫টি ছেলে শিশুর নাম রাখা হয় লিওনেল, আর ৪৪৬ জন কন্যাশিশুর নাম রাখা হয় লিওনেলা। অর্থাৎ, ২০২৩ সালে জন্ম নেওয়া প্রতি ৪৭টি শিশুর মধ্যে একজনের নাম ছিল লিওনেল অথবা লিওনেলা।

ভালোবাসার কোনো সীমানা নেই

মেসির প্রভাব শুধু আর্জেন্টিনায় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে। আর্জেন্টিনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো মাউরো আহুমাদা ছোটবেলা থেকেই মেসির অন্ধ ভক্ত। যখন জানতে পারলেন, তিনি বাবা হতে চলেছেন, তখনই ঠিক করে ফেললেন, ছেলের নাম হবে লিওনেল। স্ত্রী রাজি হলেও মেসির মধ্যনাম আন্দ্রেসও রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই প্রস্তাব আর টেকেনি। কারণ সেটি ছিল তাঁর স্ত্রীর সাবেক প্রেমিকের নাম! শেষ পর্যন্ত ছেলের নাম রাখা হয় লিওনেল আগুস্তিন আহুমাদা। আজ সাত বছরের সেই শিশু বাবার সঙ্গে বাড়ির উঠোনে ফুটবল খেলে। বাবা মজা করে বলেন, "আমি আর্জেন্টিনা। তুমি কোন দল?" ছেলের উত্তর, "আমি টেক্সাস!"। বাবা তখন শুধু হেসে ওঠেন।

মেসির প্রভাব শুধু আর্জেন্টিনায় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে
মেসির প্রভাব শুধু আর্জেন্টিনায় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে

আর্জেন্টিনার ছোট্ট মেসি ডেভিড ভারেলা এখন স্কুলে পড়ে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলে। বার্সেলোনায় মেসির অভিষেকের জার্সি নম্বর ৩০-ই পরে মাঠে নামে। তার স্বপ্ন, একদিন নিজের নামের মানুষটির সঙ্গে দেখা করা। তার মা বলেন, আজও রাস্তায় বের হলে মানুষ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "ওর নাম সত্যিই মেসি?"
তিনি গর্ব করে উত্তর দেন, "হ্যাঁ, সত্যিই।"

একজন মানুষ কতটা ভালোবাসা অর্জন করলে তার নামে সন্তানদের নাম রাখতে মানুষ আইনের সঙ্গেও লড়াই করতে রাজি হয়? হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরই লিওনেল মেসি।তার নাম শুধু একটি নাম নয়; এটি একটি স্বপ্ন, একটি প্রজন্মের শৈশব, কোটি মানুষের আবেগ এবং এমন এক ভালোবাসার প্রতীক, যা কোনো আইন দিয়ে আটকে রাখা যায় না।

সমর্থকদের কাছে তাই মেসি কেবল একজন ফুটবলার নন
সমর্থকদের কাছে তাই মেসি কেবল একজন ফুটবলার নন

সমর্থকদের কাছে তাই মেসি কেবল একজন ফুটবলার নন। তিনি অনুপ্রেরণা, আবেগ, ভালোবাসা আর অসংখ্য মানুষের জীবনের অংশ। অনেকের চোখে তিনি সর্বকালের সেরাদের একজন, আর অগণিত ভক্তের কাছে এক ও অদ্বিতীয় লিওনেল মেসি।

তথ্য: ইয়াহু স্পোর্টস

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭: ৪৮
বিজ্ঞাপন