২০৩০ এর বিশ্বকাপেও শোনা যাবে 'সিউউউ'? দেখুন পর্তুগিজ ফুটবলের রাজকুমারের আনরিয়েল ফিটনেস রুটিন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

যে বয়সে অধিকাংশ ফুটবলার অনেক আগেই অবসরে চলে যান, সেই বয়সেও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি। শুধু জনপ্রিয়তার কারণে নয়, নিজের শরীরকে অসাধারণভাবে ধরে রাখার কারণেও তিনি আজ ক্রীড়াবিজ্ঞানের এক জীবন্ত উদাহরণ।

ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি এসেছেন, অনেকেই সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন। কিন্তু খুব কম খেলোয়াড়ই দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সেরা পর্যায়ে নিজেদের ধরে রাখতে পেরেছেন। রোনালদো সেই বিরলদের একজন। তার এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারের রহস্য লুকিয়ে আছে প্রতিভার চেয়ে বেশি শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা এবং জীবনযাপনের প্রতিটি খুঁটিনাটিতে।

শরীরকে দেখেন একটি ‘পারফরম্যান্স মেশিন’ হিসেবে

রোনালদো বহুবার বলেছেন, একজন পেশাদার ফুটবলারের শরীর একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেশিনের মতো। একটি রেসিং কার যেমন সর্বোচ্চ গতিতে চলার জন্য সেরা জ্বালানি ও নিয়মিত যত্ন চায়, তেমনি শরীরেরও প্রয়োজন সঠিক খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ।

এই দর্শনই তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ভিত্তি।

অনেক ফুটবলার মাঠে অনুশীলনের সময় যতটা মনোযোগী, মাঠের বাইরে ততটা নন। রোনালদোর ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন অ্যাথলেটের সাফল্য শুধু অনুশীলনের ঘণ্টাগুলোতে নয়, বরং দিনের বাকি সময়গুলোতেও নির্ধারিত হয়।

তিন বেলার বদলে ছয় বেলা খাবার

রোনালদোর খাদ্যাভ্যাসের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো দিনে ছয়টি ছোট মিল গ্রহণ করা।

একসঙ্গে অনেক খাবার খাওয়ার বদলে তিনি প্রতি তিন থেকে চার ঘণ্টা পরপর ছোট পরিমাণে খাবার খান। এতে শরীর সারাক্ষণ প্রয়োজনীয় শক্তি পায়, রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে এবং পেশি পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ অব্যাহত থাকে।

তার খাদ্যতালিকায় নিয়মিত থাকে মাছ, মুরগির মাংস, ডিমের সাদা অংশ, তাজা ফল, শাকসবজি, ব্রাউন রাইস, কুইনোয়া এবং বিভিন্ন শস্যজাত খাবার।

প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত চিনি তিনি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলেন। কারণ তিনি জানেন, শরীরকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখতে হলে প্রতিটি খাবারেরই একটি উদ্দেশ্য থাকতে হবে।

বিজ্ঞাপন

মাছের প্রতি বিশেষ ঝোঁক

রোনালদোর খাদ্যতালিকায় মাছের গুরুত্ব অনেক।

টুনা, কড, সোর্ডফিশ এবং সি ব্রিমের মতো সামুদ্রিক মাছ নিয়মিত খান তিনি। এসব মাছ থেকে পাওয়া উচ্চমানের প্রোটিন এবং ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পেশি পুনর্গঠন, হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষা এবং শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

ফলে কঠিন অনুশীলন বা ম্যাচের পর তার শরীর তুলনামূলক দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে পারে। বয়স বাড়লেও এই অভ্যাস তার ফিটনেস ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সবচেয়ে প্রিয় পানীয়  

২০২১ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে এক সংবাদ সম্মেলনে টেবিলে রাখা কোমল পানীয় সরিয়ে দিয়ে শুধু একটি শব্দ বলেছিলেন রোনালদো, “পানি”।

মুহূর্তটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে এটি কোনো প্রচারণা ছিল না। বরং তার দীর্ঘদিনের জীবনদর্শনেরই প্রতিফলন।

রোনালদো নিয়মিত প্রচুর পানি পান করেন। অনুশীলনের আগে, অনুশীলনের সময় এবং অনুশীলনের পর শরীরকে হাইড্রেট রাখা তার দৈনন্দিন রুটিনের অপরিহার্য অংশ।

অ্যালকোহল এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় থেকে তিনি দূরে থাকেন। তার মতে, ভালো পারফরম্যান্সের জন্য শরীরকে সবসময় সঠিকভাবে হাইড্রেটেড রাখা জরুরি।

ফিটনেসের সবচেয়ে বড় রহস্য!  

রোনালদোর ঘনিষ্ঠরা প্রায়ই বলেন, তার সবচেয়ে বড় শক্তি প্রতিভা নয়, বরং শৃঙ্খলা।
বছরের প্রায় প্রতিটি দিন তিনি নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করেন। কখন ঘুমাবেন, কখন খাবেন, কখন অনুশীলন করবেন সবকিছুরই একটি নির্দিষ্ট সময় আছে।

অসংখ্য প্রতিভাবান ফুটবলার নিয়মের অভাবে নিজেদের সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারেননি। রোনালদো ঠিক উল্টো পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি নিজের শৃঙ্খলাকেই সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

জিমে শুধু পেশি নয়, কার্যকারিতার ওপর জোর

Michele Di Fede

রোনালদোর ট্রেনিং শুধু বড় পেশি তৈরির জন্য নয়। তার অনুশীলনের বড় অংশজুড়ে থাকে কোর ট্রেনিং, হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং (HIIT), স্ট্যাবিলিটি ও ব্যালান্স এক্সারসাইজ, অ্যাজিলিটি ড্রিল, ফ্লেক্সিবিলিটি ট্রেনিং এবং জাম্প ট্রেনিং।

তিনি জানেন, ফুটবলে শুধু শক্তিশালী হলেই হয় না। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তন করা এবং শরীরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণেই তার অনুশীলন পরিকল্পনা এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে শক্তি, গতি, ভারসাম্য এবং নমনীয়তা একসঙ্গে উন্নত হয়।

বিজ্ঞাপন

ঘুমকে মনে করেন ওষুধ

আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞানে ঘুমকে ‘প্রাকৃতিক রিকভারি টুল’ বলা হয়। রোনালদো এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। তার মতে, অনুশীলন শরীরকে ভাঙে, আর ঘুম সেই শরীরকে আবার গড়ে তোলে। পেশি পুনর্গঠন, হরমোনের ভারসাম্য এবং মানসিক সতেজতা ধরে রাখতে তিনি নিয়মিত পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করেন। ব্যস্ত মৌসুমেও ঘুমের সঙ্গে কোনো আপস করেন না তিনি।

আধুনিক রিকভারি প্রযুক্তিরও ভক্ত

শুধু জিম বা খাদ্যাভ্যাস নয়, রিকভারির ক্ষেত্রেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন রোনালদো। আইস বাথ, ক্রায়োথেরাপি, ম্যাসাজ থেরাপি এবং বিভিন্ন রিকভারি পদ্ধতি তার নিয়মিত রুটিনের অংশ। ম্যাচের পর শরীর দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে এসব প্রযুক্তি তাকে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ ক্যারিয়ার ধরে রাখার ক্ষেত্রে রিকভারির গুরুত্ব অনেক সময় অনুশীলনের সমান হয়ে যায়। রোনালদো সেই বিষয়টি বহু আগেই বুঝেছিলেন।

মাঝেমধ্যে খান প্রিয় খাবারও

কঠোর নিয়মের মধ্যেও ছোটখাটো আনন্দের জায়গা রাখেন রোনালদো। তার প্রিয় ‘চিট মিল’ হিসেবে প্রায়ই পিৎজার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে সেটিও খুব সীমিত পরিমাণে। তিনি বিশ্বাস করেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মানে নিজেকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করা নয়; বরং ভারসাম্য বজায় রাখা।

২০২৬ সালেও নতুন লক্ষ্য নিয়ে ছুটছেন

চার দশক পেরিয়ে গেলেও রোনালদোর প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। ২০২৬ সালে তিনি এখনও গোল করছেন, জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছেন এবং নিজের ফিটনেস নিয়ে তরুণ ফুটবলারদের জন্য মানদণ্ড তৈরি করছেন।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, তার সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো শুধু গোলসংখ্যা বা ট্রফি নয়। বরং এমন একটি শরীর ও জীবনযাপন গড়ে তোলা, যা বয়সের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতাকেও অনেকাংশে অতিক্রম করতে সক্ষম।

বয়সকে হারানোর গল্প

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গল্প আসলে বয়সকে হারানোর গল্প নয়; বরং বয়সের সঙ্গে লড়াই করার সঠিক উপায় খুঁজে পাওয়ার গল্প।

সঠিক খাবার, পর্যাপ্ত পানি, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক রিকভারি পদ্ধতি, ভালো ঘুম এবং অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলার সমন্বয়ই তাকে ৪১ বছর বয়সেও বিশ্বের অন্যতম ফিট অ্যাথলেট হিসেবে ধরে রেখেছে।

ফুটবলের ভাষায় তিনি একজন কিংবদন্তি। আর ফিটনেসের ভাষায়, তিনি এমন এক জীবন্ত উদাহরণ, যা প্রমাণ করে প্রতিভা আপনাকে শুরুটা এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে প্রয়োজন শৃঙ্খলা, ধারাবাহিকতা এবং নিজের শরীরের প্রতি দায়িত্বশীলতা।

হয়তো এ কারণেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি আধুনিক ক্রীড়াজগতের সবচেয়ে বড় ফিটনেস আইকনদের একজন।

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১৩: ৫৮
বিজ্ঞাপন